—Fred Rogers
প্রায় দুই দশক ধরে আমার অন্যতম একটি শখ হল চাইল্ডহুড ফটোগ্রাফি। দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের সান্নিধ্য যাপনের এতটাই আপনে পৌঁছেছি, এখন আমার নায়ক তারাই যারা সর্বদা শিশুদের বেড়ে ওঠার সহায়ক হতে চান, তাদের নিয়ে ভাবেন, সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। যেমন এই কশেরুকের শিশু সংখ্যা, যার সুরে এই তো ফের উঠছি গেয়ে—
I want to become a gentle breeze to fan children's tender dreams.
একটি ইন্টারভিউ
শুরুটা করি শীতলগ্রাম প্রাথমিক স্কুলে পাওয়া চাকরির ইন্টারভিউ থেকে। এটি ছিল ২০০৯ সালের পর থেকে এযাবৎ প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যের চতুর্থতম ইন্টারভিউ, যার স্মৃতি হুবহু আজীবন মনে থেকে যাবে, এতই প্রখর...। ইন্টারভিউয়ের দিন যাবতীয় সার্টিফিকেটের সঙ্গে নিয়েছিলাম নিজের দু'টি কবিতার বই, যদি এক্সট্রা কারিকুলার হিসাবে গ্রহণযোগ্য হয়, এই ভেবে। ইন্টারভিউতে ঢোকার আগে কাগজপত্রের পরীক্ষা যে ঘরে হচ্ছিল, তাদের বই দু'টো দেখাতেই বলেছিল, 'ইন্টারভিউ বোর্ডে নিয়ে যাও কাজে দেবে, ফেরার পথে আমাকে দিয়ে যেও।' সেইমতো নির্ধারিত ৯ নম্বর রুমের বাইরের লাইনের এক্কেবারে শেষে দাঁড়ালাম, যে আগে আসে ছেড়ে দিই। আসলে একেবারে শেষ পরীক্ষার্থী হিসাবে ঢুকতে চাইছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল, হয় খানিক বেশি সময় দেবে আমাকে; নয়তো একদমই দেবে না। ওই রুমের শেষ ইন্টারভিউদাতা হিসাবে দুরুদুরু মন নিয়ে প্রবেশ করলাম। দেখি, বসে আছেন বছর পঞ্চাশের একজন স্যার আর বছর চল্লিশের একজন ম্যাডাম। ম্যাডামই আমাকে প্রথম বসতে বললেন। বসেই বললাম, 'ধন্যবাদ, দুজনেই আমার প্রণাম নেবেন।' স্যার প্রথম আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। বললাম। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন আমি কী করি। খুব শর্টকাটে আমার এডুকেশন লাইফ সম্পর্কে জানানোর পরে পড়াশুনায় আগ্রহের কথা জানালাম, টুকটাক লেখালেখি করি সে কথাও জানালাম। অনুমতি নিয়ে বই দুটি টেবিলে রাখতেই স্যার হাতে তুলে নিলেন। মিনিট খানেক বাদে তিনি বললেন,
—আপনার তো হায়ার এডুকেশানে যাওয়া উচিত, হঠাৎ প্রাইমারি স্কুলে চাকরির ইচ্ছা হল কেন?
এই প্রশ্নটাই এক অপার খুলে করে দিল। বললাম,
— প্রথমেই একটা অনুরোধ করবো স্যার, শৈশবখানা (shoishobkhana) লিখে গুগুলে একটু সার্চ করবেন?
— কেন?
—ওই নামে একটা ফেসবুক, ইনিস্টাগ্রাম প্রোফাইল পাবেন, সেখানে প্রায় হাজারের কাছাকাছি নির্বাচিত ফটোগ্রাফিতে চাইল্ডহুড অ্যাক্টিভিটির উপর দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে এসেছি।
এটা শোনার পর স্যার অ্যাকসেস করলেন, পেয়েও গেলেন। বই দুটি হাতে নেওয়ার পর থেকেই কিঞ্চিত মুখ-চোখের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলাম, এবার সেখানে আরও সমীহ দেখতে পেলাম। কী একটা এনার্জি কাজ করলো ভেতরে আমার! বললাম,
— মনোবিদ রুশোর মতে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সাপেক্ষে শিশু জীবনের প্রথমের ১ থেকে ১০ বছরের মধ্য ৫০ শতাংশ ব্রেন তৈরি হয়ে যায় আর বাকি ৫০ শতাশং ব্রেন তৈরি হয় পূর্বের অর্জিত ৫০ শতাংশ ও বাকি জীবনের অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে। স্যার, আপনার সময়কার প্রাইমারি জীবনের কোনও কবিতা বা ছড়া মুখস্থ আছে এখনও?
স্যার সহাস্যে মাথা ঝাঁকালেন, বললেন,
—একাধিক।
ফের জিজ্ঞাসা করলাম,
—কিন্তু আপনার সময়ের ক্লাস এইট-নাইন বা গ্রাজুয়েশন লেভেলের কোনও কবিতা নিশ্চয়ই মনে নেই এখন?
স্যার বললেন,
—একদমই তাই।
বললাম,
— মহামান্য রুশো একটা ৯ বছরের বাচ্চার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যে সাঁতার, দাবাখেলা, রান্নাবান্না, বড় বড় ক্যালকুলাস, পোলো খেলাসহ আরও গাদাগুচ্ছের অ্যাক্টিভিটিতে সক্রিয় ছিল, তার বাবার দৌলতেই। কিন্তু বাচ্চাদের শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলায় গান লেখা হয়, 'স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারি, আমরা কী আর বইতে পারি'। অর্থাৎ রবিঠাকুরের তোতাকাহিনীর মতো শিক্ষাকে এখানে পুশ করা হয়, যেখানে খেলাচ্ছলে শিক্ষা আগ্রহ তৈরি করা কোনও জরুরি বিষয়ই নয়। যেখানে বাড়ির ভিতই দুর্বল সেখানে আমরা দিনের পর দিন কামনা বা চেষ্টা করে যাই বহুতল ইমারত খাঁড়া করার। অথচ ভিত অর্থাৎ শৈশব শিক্ষাটা যদি পোক্ত হত, কতই না সহজ ছিল ব্যপারাটা।
থামলাম একটু। স্যার কিছু বললেন না। মনে হল শুনতে চাইছেন। ভাবলাম, যা হয় হবে, চাকরি যদি খেয়ে লেয় লিক, বলারা যখন ঠেলে বেরোতে চাইছে বলি৷ বললাম,
—আমাদের এ রাজ্যে, এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কেন একটা শিশুকে মনোবৈজ্ঞানিক উপায়ে পাঠ দান করা হয় না? কেন একজন পিএইচডি স্কলার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হবেন না? প্রতিদিনই আমাদের শিশুরা হয় পরিবারের থেকে, না হয় প্রতিবেশী বড়দের কাছে সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজড হয়, ওরা তো পরিবারের কাছে সে কথা স্বীকার করতেও ভয় পায়, কেন স্কুলে ওদের প্রপার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে না? প্রপার কাউন্সেলিংহীন এইসব শিশুরা বড় হয়ে বিকৃত সমাজব্যবস্থা ছাড়া কীইবা উপহার দিতে পারে আমাদের! মাঝেমাঝে মনে হয় স্যার, আমি যদি প্রধানমন্ত্রী বা ওই গোত্রীয় ক্ষমতার মানুষটি হতে পারতাম, যার হাতে থাকবে প্রাইমারী এডুকেশান সিস্টেমটাকে বদলে দিতে পারার ক্ষমতা, অদূর ভবিষ্যতে হাজারও দোষারোপ করার এই সমাজ ব্যবস্থাটি হয়ত থাকত না, সত্যিকারের শিক্ষিত সমাজ আসলে কী, বোঝা সহজ হত।
একটানা এতটা বলতে বলতে সেদিন খুব উত্তেজনা কাজ করছিল। টের পাচ্ছিলাম, কান গরমে লাল হয়ে উঠেছিল।
স্যার বললেন,
—এইভাবে যে কেউ ভাবে বা ভাবা যায়, ভাবতেই ভাল লাগছে, চেতনাকে নাড়িয়ে দিলেন, মনে থাকবে আপনাকে। আপনার বই দু'টো কী আমি রাখতে পারি?
আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালে তিনি আমার ফোন নাম্বার চাইলেন, বলতেই টুকে নিলেন আমার একটি বইতে।
এতক্ষণের কথাবার্তার ভেতরে ম্যাম একটুও কথা বলেননি, এবার জিজ্ঞাসা করলেন,
—রিপা আপনার কে হয়?
বলতে ভুলেছি আমার আর বোন রিপার (রিপা) একই রুমে ইন্টারভিউ পড়েছিল। পরপর দু'জনে গেলে যদি একজনের চাকরি মিস হয় এই ভেবে বোনই আমার ছয়-সাতজন আগে ইন্টারভিউ অ্যাটেন্ড করে গেছে। ম্যামকে খুব সরলভাবেই বললাম সে কথা। তিনি জানালেন, রিপার সাথেও কথা বলে ওঁদের ভাল লেগেছে। ম্যাম এবার আবদার জুড়লেন, আমাকে একটা কবিতা শোনানোর জন্য। আমি বাড়ি থেকে আগাম একটা ছড়া মুখস্ত করে গেছিলাম। বললাম,
—একটা ছড়া শোনাই তাহলে?
স্যারটি পাশের ৮ নম্বর রুমের স্যারের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, ’স্যার; একটা নতুন ছড়া শোনেন’, বলেই আমাকে জোরে জোরে পাঠ করতে বললেন, ছড়াটির নাম ছিল, 'বিচ্ছু'
'চৌখুপি-চঁদিয়ালে মন নেই
মাথা ভেঙে পড়ে আছে লাট্টু
আটকে রাখে না তার রাস্তা
স্বপ্নের ঘুমভাঙা টাট্টু।
কেউ তাকে সারাদিন খুঁজছে
কেউ তাকে ছায়া দেয় আড়ালে,
দু'চোখেই জল করে চিকচিক
জানালায় মুখখানা বাড়ালে৷
রাতারাতি সব গেছে পালটে
গােল-গাল পৃথিবীটা চৌকো
নদীটার গায়ে কোনাে সাড়া নেই
হাই তােলে ছায়া ছায়া নৌকো।
নৌকোয় আলাে জ্বলে টিমটিম
সে-আলাের ধার ঘেষে বিচ্ছু
বসে-বসে তারা গােনে একলা
ভয়ডর নেই তার কিছু!
ছেলেটা এখন আছে ঘুমিয়ে
চারিদিকে বইখাতা ছড়ানাে,
একটু পরেই কত কাজ তার
ফুল-পাখি-পিঁপড়েকে পড়ানাে।'
ইন্টারভিউ শেষে বাইরে এসে দেখি, সবাই চলে গেলেও দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে বোন রিপা এতক্ষণের ইন্টারভিউটুকু শুনছিল, তার চোখের অশ্রু বিন্দুতে চিকচিক করছে আলো, সে আলো আমাতেও সংক্রমিত হল!
যেহেতু শৈশব দীর্ঘ
একদিন ছিল, যেদিন হয়ত আমারই নানান আচরণের দ্বারা ব্যথিত হয়ে একে একে বান্ধবেরা দূরে সরে যেতে শুরু করেছিল। ফলত নিজেরে দোষারোপ দেওয়া অনিবার্য নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, মনে হয়েছিল, আমার আত্মা কোনওমতেই শুদ্ধ নয়। হয়ত তেমনই আত্মাশুদ্ধির প্রয়োজন মনে হওয়া কোনও দিনে দুটি বাক্য উপশমের মতো নাগালে এসেছিল, The soul is healed by being with children. They are the hands by which we take hold of heaven. মানসিকতায় খুলে ফেললাম সেই পাঠশালা, যেখানে আমাদের প্রিয় শিশু সকলকে বানালাম আমার গুরুমশাই, ওদের মনজগতের সখ্য হলাম, ধীরে আয়ত্বে এল আপন হওয়ার কৌশল। ওদের সাহচর্য অনেক বোধোদয়ে পরিচালিত করতে লাগলো, টের পেলাম, মানুষের আচরণ বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাণীদের মতো প্রবৃত্তি খুব প্রভাবশালী নয়। মানবজীবনের পরিপক্কতা জন্মের পূর্বে হয় যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি হয় জন্মের পরে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। মানব শিশুর গুরুমস্তিষ্কের বহিরাংশ, সেরিব্রাল কর্টেক্স, অনেক দিন অপরিণত থাকে। অন্য সকল প্রাণীর চেয়ে একমাত্র মানুষের শৈশবকাল তাই দীর্ঘ সময়ব্যাপী!
অবশ্য কোনও কোনও ক্ষেত্রে কোনও কোনও মানুষের শৈশব বড়ই সল্পস্থায়ী। শিশু যত রকমারি অভিজ্ঞতার সামনে হাজির হয়, শৈশবকালও তার ক্রমান্বয়ে কমে আসে। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ছে, ১০-১১ বছরের একটি বাড়ির পাশের বাচ্চার বাবা মারা যাওয়ার পরে, এক লাফে বড় হয়ে যেতে তাকে দেখেছি, এই রকম কোনও ঘটনার জেরেই একদিন লিখেছিলাম,
"কিছু কিছু মৃত্যু রূপান্তরিত জন্ম
যেমন—
আগে কেউ হাত চেপে ধরলেই
হাত লাল হয়ে যেত...
বাবার অবর্তমানে
বাজারের ব্যাগেও এখন
হাত লাল হয় না।"
গৌর নাম্নী সেই ছেলেটির বাবা মারা যাওয়ার পর গোটা সংসার তার কাধে এসে পড়েছিল। আমি ওর তুলনায় তখন বছর দশেকের বড়। আমার পক্ষে সেই মুহূর্তে আমার নিজের সংসার টানার ক্ষমতা ছিল না। গৌড়ের ছিল, অভিজ্ঞতার নিরিখে তখন আমার চেয়ে যেন বয়স তার বেড়ে গেছে! কৈশরেও সে আর বুঝি নেই! খানিকটা হয়েছেও সে রুক্ষ মেজাজের...
সুদীর্ঘ শৈশবই আসলে মানবশিশুকে করে তোলে নমনীয় এবং এরই ফলে এই মানব জাতি যেকোনও আকস্মিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য ঘটিয়ে অস্তিত্ব রক্ষা করতে পেরেছে যুগ যুগ ধরে। মানবশিশুর অভিভাবককত্বের দায়িত্ব তাই গভীর তম। এই সুদীর্ঘ শৈশবজীবনের নানান অর্বাচীনতা খেয়াল করেই কবি ও শিক্ষক রাণা রায়চৌধুরী একটা গদ্যে লিখেছিলেন—
"সন্তান সকল ছেঁড়া সহজপাঠ, ছেঁড়া রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আরো আরো ছিঁড়ে কাটাকুটি করছে— পারলে পুরো শিশুজীবনটাই ছিঁড়ে ফেলে তারা। মাস্টারের কাজ পড়ানো নয়—জীবন থেকে যাতে ছিঁড়ে না পড়ে যায় এইসব শিশুসকল সেদিকে খেয়াল রাখা।"
—এই সময় পর্বে অবিভাবদের অত্যন্ত জরুরি কাজটি হল, শিশুর প্রতি ধৈর্যকে অক্ষুন্ন রাখা। একটা বাচ্চার সাথে প্রথম দিকে একটু বেশি সময় কাটাতে গেলেই হাঁপিয়ে যেতাম, বাচ্চার সাথে একটানা খানিক সময় কাটানো যদিও জোরালো কোনও কাজ নয়। অথচ মনে হত, এর চাইতে কেউ যদি কাঠা দশেকের জমি কোদালে কোপাতে বলত সেটা আরও সহজ ছিল। এমন কেন হয়? আসলে শিশুর আচরনের অর্বাচীনতা সহ্য করতে পারার যে ধৈর্য, তার অভাব বোধের দরুন এইরূপ মনে হয়। তাই তো আমরা ধৈর্য হারিয়ে শিশুর সামান্য ভুলে গুরুতর শাস্তি দিয়ে ফেলি। অনেক সময় শাস্তি পাওয়ার কারণ না জেনেই শিশুটিকে শাস্তি হজম করতে হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে শিশুটি ভেবেই ফেলে, তার বাবা-মা হয়তো তাকে আর চায় না। কিন্তু সত্যিকথাটি হল, ছোটরা যখনই কোনও ভুল করে, তখনই সেই ভুলকে উপলক্ষ করে ছোটদের খুব অন্তরঙ্গ হওয়ার, একটা মনখোলা বোঝাপড়া করার মস্ত বড় সুযোগ এসে যায় অভিভাবকদের হাতে। এমন কী এগুলির মধ্যে দিয়ে ছোটদের চিন্তাধারার ওপর প্রভাব বিস্তারের অনেক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
রাস্তায় বেরোলেই দেখবেন এমন কিছু বাইক চালক আছেন যারা
নিজেদের এবং অপরের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদজনক তীব্র গতিতে বাইক ছোটান, যেন উদীয়মান শ্মশানযাত্রী! কীভাবে সব চেয়ে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছনো যায়, এটাই যেন লক্ষ্য! আত্মবিশ্বাস তাঁদের এমনই গভীর হয় যে, তাঁরা ভুলে যান, গাড়ি চালানোর দক্ষতা ছাড়াও আরও অনেকগুলি জিনিসের ওপর গন্তব্যস্থানে পৌঁছনো নির্ভর করছে। ভুলে যান যে, গাড়িখানির ভার-বহনের একটা সীমা আছে। যেরকম উল্কাবেগে বাইক ছোটাচ্ছেন, গাড়ির বেগশক্তি তত নয় এবং এতে গাড়িখানির ওপর অযথা ধকল পড়ছে, অত্যাচার করা হচ্ছে।
শিশু পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক অভিভাবকও এই ধরনের চালকের মতো। শিশু নিতান্তই শিশু এবং তাকে পরিচালনা করবার যথেষ্ট দক্ষতা তাঁদের আছে, এই মনে করে তাঁরা ছোটদের যেমন খুশি পরিচালনা করেন। মুহূর্তের জন্যও তাঁরা ভাবেন না যে, এর দ্বারা ছোটদের ওপরে অত্যধিক পরিশ্রমের বোঝা চাপানো হয় এবং ছোটরা তা সইতে পারে না। এমন অবস্থায় ছোটরা তাদের ব্যর্থতার কারণও বুঝতে পারে না, কিংবা যে লক্ষ্যে পৌঁছবার জন্যে তাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তারও মাথামুণ্ডু কিছু বুঝে উঠতে পারে না। ছোটদের এই মনোদ্বিধার দিকে অতি উৎসাহী অভিভাবকরা লক্ষ্য দেন খুবই কম। আমরা ছোটদের প্রতি যখনই দরকার মত সহানুভূতি দেখাতে পারিনা, তখনই তারা হয় দ্বিধাগ্রস্ত, ভাবে, তার আচরণে বড়রা হয়তো ভুল বুঝবে। শিশুটি গুটিয়ে যায়, তখন সে সরে এসে নিজের একটা জগত তৈরি করে যার সঙ্গে বয়স্ক জগতের অনেক ব্যবধান, এই দুই জগতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে গেলে অনেক কসরত করতে হয়। শিশুর এই জগতে প্রবেশ অধিকার পেতে গেলে, শাস্তি বর্জন করতে হবে, লোভ দেখানো বা ঘুষ খাইয়ে কাজ হাসিল করার ফন্দিও ছাড়তে হবে। তাহলে কাজ হাসিল হবে কীভাবে?
—একটু প্রশংসার মধ্যে দিয়ে ছোটরা চায় স্বীকৃতি। পাড়ার দাদারা ছোটদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশেন, তাদের খেলাধূলার মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাহবার আয়োজন করেন। তাই পাড়ার দাদাদের কথা ছোটরা অনেক মূল্যবান মনে করে। অভিভাবক ও শিক্ষকরা এই জন্যে অনেক সময় অনুযোগ করেন, পাড়ার দাদারা ছেলে-মেয়েদের মন কেড়ে নেয়। তাহলে আপনি অবিভাবক বা শিক্ষক কেন পারছেন না? কারণ, আপনার প্রাধান্য এবং শ্রেষ্ঠতা (সুপিরিয়রিটি)। একথা মেনে নিচ্ছি, বয়সে বড় আমরা শিশুর চেয়ে অনেকাংশে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু সেই শ্রেষ্ঠতার খাতিরে আমাদের কোনও প্রাধান্য শিশুর ওপর বিস্তার করবার চেষ্টা করলেই আমরা সমস্যার কারণ হয়ে উঠবো!
আমাদের অধিকাংশ বাচ্চাদের মা-বাবা, অবিভাবকেরা চাই, তাদের জীবনের যাবতীয় অসফলতাগুলো তাদের বাচ্চাদের ভেতর দিয়ে সাফল্য পাক, সেইমতো কঠোর অনুশাসনে বেড়াজালে আরোপিত জীবনে বেঁধে ফেলাও হয় তাকে। পরবর্তী জীবনে বাচ্চাটি খারাপ পথে পরিচালিত হলে সেই অনুশাসনেরই দোষ দিই আমরা। এই প্রসঙ্গে দিন কয়েক আগেই সম্মুখীন হওয়া একটা অভিজ্ঞতার কথা শোনাই। এক বান্ধবী যখন জানায়, সে সহ তার মা-বাবা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছে। কারণ শুধোলে সে জানায়, তার দাদা বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে, পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখেনি। আমি জানতে চাই, মা-বাবার সাথে তাদের দুই ভাইবোনের কেমন বন্ধুত্ব ছিল? সে জানায়, কোনও দিনই তারা বন্ধুজন ছিল না, কঠোর অনুশাসনে মানুষ হয়েছে। জানি না ওদের বাবা-মা কোন ভুলে বা দোষে এই শাস্তি ভোগ করছেন। ভাবতেই বিভাস রায়চৌধুরীর লেখা দু'টি পঙক্তি মাথায় এল—
"শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না কোনও দিন
বন্ধুদের ভুল এক জীবনে ক্ষমা করা যায় বারবার..."
শিশুর কাছে হতে হবে সমান ও সহজ বন্ধু। তার সমস্যায় সাহায্য করতে হবে বন্ধুর মতো, কর্তৃত্বের খাতিরে নয়। কথাবার্তা, আচরণে তাকে সব সময়ে আমাদের একথাটা বোঝাবার চেষ্টা করতে হবে। এই প্রসঙ্গে আমার জীবনের একটা ঘটনা শোনাই। মাধ্যমিকের মতো উচ্চমাধ্যমিকেও বরুণদার কাছে ইংরাজি পড়তাম, লেখালেখির উৎসাহে কত বই যে পড়াতেন! বরুণদার প্রতি আমার শ্রদ্ধা অগাধ। শ্রদ্ধার একটা ভয় আছে, বিবেচনা বোধ আছে। তাই আমার যাবতীয় দুষ্টুমি দাদার এই ব্যাচকে এড়িয়ে চলত। পড়ার ঘরেও দাদার খানিক দূরে এক কোনায় চুপচাপ থাকতাম। আমার এই চুপ থাকা একটি মেয়েকে পেয়ে বসেছিল। যেভাবে খাতাগুলো হাত ঘুরে ঘুরে বরুণদার কাছে পৌঁছায়, ফিরে আসার পথও অনুরূপ। এই ফিরে আসার পথেই একদিন সে খাতার ভেতর চিঠি দিয়েছিল, চিঠিটিতে তার নাম ছিল না! নোটের জেরক্সের অক্ষর মিলিয়ে নাম আবিষ্কারে আনন্দ হয়েছিল খুব, নিজেকে তোপসে তোপসে লাগছিল। কেন না ফেলুদা ভাবতাম একমাত্র বাবাকেই। পড়ালাম চিঠিটা, এবার কী করণীয় আমার, জনতে চাইলাম। বাবা হেসে বললেন,
—'তুমি বড় হয়েছ, নিজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী হয়েছ, এই যে তোমার মাধ্যমিকের ফলাফল, তোমার এই বড় সিদ্ধান্তের দাম আজীবনের। তাই এই চিঠির ব্যাপারে কয়েকটা পরামর্শ দিতে পারি বড়োজোর। তোমার আর ওই মেয়েটির বয়স প্রায় একই। যেখানে আমাদের সমাজে মেয়েদের তুলনামূলক আগেই বিয়ে দিয়ে দেয়, সেখানে তোমাদের সম্পর্কটা তৈরি হয়ে ভেঙে গেলে তোমাদের ভেতরকার বন্ধুত্ব বেঁচে থাকবে তো? এসব ছাপিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর বয়স পর্যন্ত এই সম্পর্ককে ধরে রাখতে পারবে তো? যদি মনে হয় সব টিকিয়ে রাখতে পারবে তাহলে আমি আর তোমার মা প্রয়োজনে তোমাদের ভেতরের পিওন হতেও রাজি। '
—এহেন আরও নানান ঘটনার মাধ্যমে বাবা হয়ত বারবার শেখাতে চেয়েছেন; তার বাচ্চারা চোখ খোলা রেখে স্বপ্ন দেখতে শিখুক। তিনি হয়ত চেয়েছেন; তার বাচ্চারা মাটিতে পা রাখুক, তাই বিশ্বাসী ভঙ্গিতে তাদের কাঁধে কিছু দায়িত্ব তুলে দিতে দ্বিধা পোষেননি।
আমাদের উচিত শিশুদের আত্মবিশ্বাস জাগানো, তা ছোটোখাটো দায়িত্ব নিতে শেখানো হোক বা প্রশংসা। সে নিজেকে যতটা অপদার্থ মনে করছে, ততটা সে নয়, এ কথাটা তাকে বিশ্বাস করাতে হবে। 'বাঃ বেশ করেছ', 'আমি খুব খুশি হয়েছি' —এরকম শুনলে যেকোনও কারোই ইচ্ছে হবে একটা কাজ আর একবার করতে এবং আরও ভালভাবে। একটু বাহবা পেলে শিশুও সেই রকম আমাদের ওপর আস্থাবান হয়ে ওঠে। তবে তাকে উৎসাহ দিতে গিয়ে আমরা কখনও যেন মাত্রাতিরিক্ত আবেগ প্রকাশ না করি। আমাদের বড়দের কথার প্রতিক্রিয়া শিশুর মনে নানা রকম হতে পারে। একটা ভুল প্রশংসার ফলে আমরা মস্ত বড় সমস্যার সৃষ্টি করে ফেলতে পারি। তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, প্রশংসার ভাষা ব্যবহারে। 'লাল্টু কেমন সুন্দর হাতপাখা বানিয়েছে, বেশ হয়েছে'-একথা আমরা বলতেই পারি। কিন্তু 'লাল্টুর মতো সুন্দর ছেলে আর হয় না, এমন ছেলে আমি জগতে আর একটাও দেখিনি'—একথা কিন্তু বিপজ্জনক। লাল্টু যা করেছে তার বাহবা আমরা নির্ভয়ে প্রয়োজনীয় সময়ে দিতেই পারি, কিন্তু লাল্টু "কী" বা "কেমন", তার জন্যে তাকে প্রশংসা করে তার ক্ষতি সাধন নাইবা করলাম।
শিশুর প্রতি ভাষা ও প্রশ্নের ব্যবহার
জা ল্যুক গদরের একটা সিনেমা দেখেছিলাম, 'মেয়েটি সম্পর্কে আমি যা জানি'৷ একটা দৃশ্যে, বাচ্চা মেয়েটা তার মাকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলো, 'ভাষা কী?' উত্তরে মা বলেছিল,— 'আমরা যে বাড়িটায় থাকি, সেটাই ভাষা।' —কী অদ্ভুত, ভাষাই আমাদের অন্যতম আস্তানা! এই যে বাচ্চাটি প্রশ্ন করল বলেই তো এত দারুণ একটা উত্তর মায়ের মনে তৈরি হল। কেউ একজন বলেছিল, প্রশ্ন তৈরি হওয়াটাই আসল, একটা উত্তর যতটা প্রাসঙ্গিক, প্রশ্নটা তার হাজার গুণ বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রশ্ন তৈরি হলে যুগযুগান্তর পেরিয়ে এক সময় না এক সময় উত্তর ঠিকই পাওয়া যায়। প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে শিশুকে জ্ঞানের পথে নিয়ে যাওয়ার কথাটা অদ্ভুত মনে হলেও এই কৌশলটি সক্রেটিসের আমল থেকে চলে আসছে। তবে শিশুকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রেও ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে সর্তক থাকতে হবে।
ধরুন, বাড়ি ফিরে দেখলেন আপনার অতিপ্রিয় সাদা জামাটায় কালার পেন্সিলে কাঁচা হাতের কেউ একজন অজস্র আঁকিবুঁকি করেছে। দেখেই আপনার খুব মাথা গরম হল। যে বাচ্চাটির কীর্তি, তাকে সামনে পেয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, এসব কে করেছে? কেন জামাটাকে নষ্ট করলে? আর কোনও দিন এরকম কাজ করবে?
এমন ধরনের রুক্ষ রূঢ় প্রশ্ন করলে শিশুদের মনে খুব ভয় জাগে, যা তাদের কোনও স্থায়ী উপকারে তো আসেই না, উপরন্তু যে-প্রশ্ন ছোটদের মনে উদ্বেগ আতঙ্কের সৃষ্টি করে, তারা সেই প্রশ্নের জবাবও ঠিকমতো দিতে পারে না। অনেক সময় ভাল-মন্দ বুঝতে না পেরে মিথ্যা কথাও বলে ফেলে। ছোটদের অভিজ্ঞতা অল্প এবং তারা কোনও ভাব বা চিন্তা গ্রহণ করে ধীরে ধীরে। মানুষের ভাষার মধ্যে যে প্রতীক ধ্বনি রয়েছে, তার সঠিক অর্থ বুঝতে তাদের সময় লাগে। তাই ছোটদের প্রতি প্রশ্ন করার ভাষাও তাই সহজ হওয়া চাই। প্রশ্নের বাক্য হবে সংক্ষিপ্ত, সরল। প্রশ্নের মধ্যে যেসব শব্দ ব্যবহার করা হবে, তার প্রত্যেকটি যেন ছোটদের শব্দভাণ্ডারের পরিধির মধ্যে থাকে। প্রশ্নটি সব সময়েই একটি সম্পূর্ণ বাক্যের আকারে ছোটদের সামনে আনতে হবে। অসম্পূর্ণ বাক্য কিংবা শুধুমাত্র 'কেন' দিয়ে প্রশ্ন করা ঠিক নয়। এর ফলে শিশুরা সম্পূর্ণ বাক্য বুঝতে পারার এবং সম্পূর্ণ বাক্য বলতে পারার অভ্যাসে পিছিয়ে পড়ে। তাছাড়া, এমন প্রশ্ন করা উচিত, যার উত্তরে ছোটদের সম্পূর্ণ বাক্য ব্যবহার করতেই হবে। যে-প্রশ্নের উত্তরে কেবল 'হ্যাঁ' কিংবা 'না' বললেই হয়, সেই প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে ছোটদের মনে উদ্দীপনা জাগানো শক্ত হয়ে পড়ে। তাছাড়া কেবলমাত্র হ্যাঁ বা না বলে প্রশ্নের জবাব দেবার সুযোগ পেলে ছোটরা অনেক সময়ে আন্দাজে জবাব দেবার আগ্রহ বোধ করে, অন্যমনস্কভাবে ভুল জবাব দিয়ে চিন্তার কর্মক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। প্রশ্ন আবার খুব সহজ, খুব মামুলী হলে ছোটরা মোটেই উৎসাহ পায় না; সেই ধরনের প্রশ্ন তাদের জানার আগ্রহকে দমিয়ে দেয়। ছেলে-ঠকানো প্রশ্ন ছোটদের খুব আনন্দ দেয় বলে অনেকে আবার এই ধরনের যথেচ্ছ প্রশ্ন করে থাকেন ছোট ছেলে-মেয়েদের। তাঁরা বলেন, এই ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হলে ছোটরা উপস্থিত বুদ্ধিবিকাশের সুযোগ পায়, মজা পায়। তবে একথাও ঠিক, যে-সব প্রশ্ন ছোটদের কেবল বোকা বানায়, অপদস্থ করে, সেই সব প্রশ্ন তাদের মধ্যে হীন মনোভাবের সৃষ্টি করতে পারে। উপস্থিত-বুদ্ধি বিকাশের কথা দূরে থাকুক, দুর্বল-মনের শিশুরা এর ফলে প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই ভয় পাবে, লজ্জা পাবে, এড়িয়ে যেতে চাইবে। সেই জন্যে, সব প্রশ্নই ছোটদের বয়সের উপযোগী বুদ্ধির অনুপাতে হওয়া উচিত। প্রশ্ন করতে হবে ঠকানোর চ্যালেঞ্জ দিয়ে নয়, আলোচনায় জয়লাভের আনন্দ আভাস দিয়ে।
অধিকাংশ ছোটদের মধ্যেই একটা সহজ অন্তর্দৃষ্টি এবং সরল বিবেচনা শক্তি আছে, একথাটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। উপযুক্ত স্নেহ, সহানুভূতি ও সহযোগিতা পেলে তারা এমন অনেক পরিস্থিতিকে অতিক্রম করতে পারে, যেখানে বড়দেরও দ্বিধাগ্রস্ত হতে হয়। এরকম দৃষ্টান্ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অহরহ ঘটে থাকে, একটু সজাগ থাকলেই তা দেখা যায়। যাঁরা ছোটদের এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে একে নিতান্তই ঘটনাচক্রের দৈবমিলন মনে করেন, তাঁরা শিশুকে তুচ্ছ মনে করে নিজেদের বয়স্কজনোচিত মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে চান মাত্র। একদিন মামা অন্তপ্রাণ আমার দুই বছরের ভাগ্নির সামনে মজা করে বাবা আমায় মারতে উদ্যত হলে দেখি, ঝটপট সে তার জলের পট আমার মুখে তুলে দিয়ে বাবাকে উদ্যেশ্য করে বলছে,
—'দাদু, আপনকে মেরো না, ন জল খাচ্ছে তো, জানো না, কেউ জল খেতে লাগলে তাকে মারতে নেই?'
উত্তেজনা মুখর শৈশব
শিশুর সরলতায় জগতে কোনও কুটিল ছবি সহজে ধরা পড়ে না, হয়ত এরই জন্যে তারা চরম নিষ্ঠুর। দেখা গেল, একটা বাচ্চা হাতের লাঠিখানা দিয়ে কাউকে অচানক জোরসে মেরে বসল বা হাতের ছুরি দিয়ে কারো গায়ে দিল এক কোপ বসিয়ে! কিংবা একটা পাগলের পেছনে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে পিছু নিলো! এইসব কাজ করার পরও দেখা গেল তার মুখে কোনও অপরাধবোধ নেই! বরং উচ্চস্বরে হেসে উঠেছে, যেন খুব মজা পেয়েছে। কেন এমন হয়? আসলে বাচ্চারা নিজেদের সেই কাজের অন্তর্গত মনে করে যে কাজে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। যা ছিল না, যা হওয়া সম্ভব নয় তার সম্ভাবনার দিকে যেতে চায় অর্থাৎ তারা জাদু দেখতে চায় এবং তার সন্ধান করে। তাই হয়ত আমার প্রাইমারি জীবনে ‘বড় হয়ে কী হতে চাই’ রচনায় লিখেছিলাম ম্যাজিসিয়ান হওয়ার ইচ্ছে। গোটা স্কুলবাড়িটাকে ভ্যানিশ করে দিয়েছিলাম। গভীর প্রচেষ্টায় টুকরোটাকরা ম্যাজিক আত্মস্থও করেছিলাম। তাক লাগাতে পারতাম বাবাকেও। সেই সব ম্যাজিকদের এখনও কাজে নামতে দেখি! বাচ্চারা খুব সহজে আমার সাথে মেশার আগ্রহ দেখায়। শুধু ঘটনা নয়, কথার উত্তরের মাধ্যমেও তারা এই মজা বোধ তৈরি করে। একদিন একদল পোলাপান শোর করে যাচ্ছিল পথে, তাদের মুখে বারবার যে শব্দবন্ধ উচ্চারিত হচ্ছিল, তা হল,
—এএএ জ্যোৎস্নার ফুল ফুটেছে, জ্যোৎস্নার ফুল ফুটেছে।
এ শুনে জিজ্ঞেস করা হল,
—জোৎস্নার ফুল কোথায় ফুটেছে রে?
—"তোমার পোঁদে" বলেই তারা ঝমঝমিয়ে হেসে ওঠে।
নিষেধে আগ্রহান্বিত শৈশব
ওই পোলাপানদের মতোই এক ত্যাদোড় ইনফ্যান্টের বাচ্চাকে বহু আগে পড়াতে যেতাম ভোরে, যাকে কাবু করতে কালঘাম ছুটে যেত। পাত্তাই দিত না, চোখ পাকালে পালটা চোখ পাকাত৷ ফলত তার পড়াশুনায় মন বসাতে সঙ্গে নিয়ে যেতাম হরেক টফি, লজেন্স। একদিন সে পুরো ব্যঞ্জনবর্ণ স্লেটে একটানে লিখে ফেলায় আমি খুব খুশি, কাছে টেনে চুমু খেয়ে বলেছিলাম, 'আই লাভ ইউ'। এই কথাটি খোকার মায়ের কানে যায়, তিনি এসে ঝাঁঝের সাথে বলেন, "মাস্টার তুমি আর পড়াতে আসবা না, তুমি ওকে আকথা শেখাচ্ছো।" "আই লাভ ইউ" আকথা!? আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! আমার সব বোঝানোই সার! এখনও বুঝে উঠতে পারি না কোন পরিবেশে কোন কথা আসলেই আকথা। আজকাল বাবা-মায়েরা বাচ্চার মুখে একটা খিস্তি শুনেই তাকে প্রহার করেন, নিষেধ করেন এর সাথে মিশবি না ওর সাথে খেলবি না। কিন্তু তারা জানে না "নিষেধ" শব্দটার সঙ্গে বাচ্চারা সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়, হয়ত অভিকর্ষ বলের অধিক টানে বেশি ওদের।
একটা গল্প পড়ছিলাম, তাতে বোঝানো হয়েছে, মায়ের নিষেধ না মানার ফলে একটি ছেলেকে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বাবা-মায়ের কথা না শুনলে অনেক দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হয়, সে-কথা ছোটদের বোঝানোর জন্যে এমন কত যে গল্প আছে! সোহেলের সখ হল পাড়ার বন্ধু অতনুর মতো নিজের হাতে আতশবাজি পোড়াবে। কিন্তু তার মা কিছুতেই রাজি হলেন না, উপরন্তু তাকে বোঝালেন, বাচ্চাদের হাতে ওসব বাজি পোড়ানো খুবই বিপজ্জনক। সোহেল অনেক আব্দার, কাকুতি মিনতি করল। কিন্তু মায়ের হুকুম কিছুতেই নড়ল না। ফলে সোহেল কোনও এক ফাঁকে বেরিয়ে পড়ে লুকিয়ে কিনে আনল ফুলঝুরি, লুকিয়েও রাখলো শোবার ঘরের কুলুঙ্গিতে। তারপর ফাঁকা সময় বুঝে সেগুলোকে নিয়ে গেলো স্নানের ঘরে, দরজা বন্ধ করে জ্বালালো ফুলঝুরি। জ্বালানোর পরে মনে মনে হয়তো তখন ভেবেও নিয়েছিল, তার মা মিছেই ভয় পেয়েছে। কিন্তু হঠাৎ দৈবক্রমে একটা জ্বলন্ত ফুলঝুরি থেকে কেমন করে যেন আগুন ধরে গেল সোহেলের জামায়। জামা থেকে প্যান্টে। কি যে হল বোঝবার আগেই ওর সর্বাঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। তার আকুল চিৎকারে বাবা ছুটে এলেন। সে ততক্ষণে প্রায় অর্ধদগ্ধ! — হয়তো এই কাহিনীর নীতিকথা : 'সব সময়ে মায়ের কথা শুনতে হয়; মা ভাল-মন্দ সব কিছু বোঝেন।' কিন্তু অবাক হয়ে ভাবতে হয়, এই ঘটনাটির প্রথমে মা কেন 'না' এই কথাটা বলে সোহেলকে সরিয়ে দিলেন? তিনি হয়তো বলবেন, বাচ্চা ছেলেকে তার মা তো চাইবেই সাবধানে রাখতে। কিন্তু প্রশ্ন আসে, কেমন করে সোহেল বাজী পোড়ালে বিপদ হবে না, সেটা হাতে ধরিয়ে শিখিয়ে দেবার ঝঞ্জাট টুকু তিনি কি নিতে চাননি?
অল্প বয়সে কবি রসিক সরকারের কবিগানে শুনেছিলাম, এক বাবা ঘাটে ছেলের হাতে পিদ্দুম ধরিয়ে দিয়ে, নাও নিয়ে মাঝ দরিয়ায় যাওয়ার আগে বারবার সতর্ক করেছিলেন, "খবরদার, আগুনে কিন্তু হাত দিবিনে"। নাও ঘাট ছেড়ে কিছুটা যেতেই ওই বাচ্চাটি প্রথম যে কাজটি করল, পিদ্দুমের আগুনে দিল আঙুল ঢুকিয়ে। তাই বারবার বারণ করে নাইবা বাড়ালাম শিশুর আগ্রহ, বরং খোদ তাকে দিয়েই যদি বারণ করানো সম্ভব হয় সেটাই একমাত্র কাজে দেয় দেখেছি। কবি সুমিতেশ সরকার খুব কাছের এক প্রিয়জন ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্বের তাঁরই এলাকায় একটা সাক্ষাতের দিনের কথা মনে পড়ল এই প্রসঙ্গে। সেদিন সঙ্গে ওনার বাচ্চাটি ছিল, সে এক সময় ফুটপাতের বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই রাজি হলেন তিনি, সেই মতো সেই বাচ্চা সকলকে নরম ভাষায় বুঝিয়েও বলেছিলেন, যে বাচ্চাগুলো একটু আগেও খেলার ভেতর গালাগাল-খিস্তি আওড়াচ্ছিল। অবাক হয়ে সে কথা স্মরণ করাতেই সুমিতেশদা বলেছিলেন, 'কয়েকটা গালাগাল যদি না শেখে তাহলে সেই গালাগাল যে খারাপ সেই বোধে নিজে থেকে উন্নীত হবে কীভাবে?' গালাগালি বা রুক্ষ আচরণ করলেই তো শিশু অপরাধী হয় না, তার এই স্বভাবের জন্য সে যতটা না দায়ী তার অধিক দায়ী পরিবার ও বাসস্থান।
অপরাধ প্রবণ শৈশব
এখন প্রশ্ন কোন শিশু অপরাধী হবে?
ক্লাস ফোরের যে ছেলেটি ক্লাসের সহপাঠির সঙ্গে ঝগড়া-মারামারির সময়ে পকেটে লুকিয়ে রাখা ব্লেড দিয়ে বন্ধুটির হাত লম্বা করে চিরে দিয়েছিল, তাকে দেখে স্কুলশুদ্ধ সব শিক্ষরা একবাক্যে রায় দিলেন, 'বড় হয়ে ছোঁড়াটা পাক্কা গুণ্ডা হবে।' কিন্তু ছোটোদের মধ্যে কারা অপরাধপ্রবণ হবে, তা বোধ হয় এত সহজে বলা যায় না। শিশু মনোবিদরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁচেছেন যে, স্নেহশীল পিতা এবং নির্বিকার পিতার সন্তানরা বিশেষ অপরাধপ্রবণ হয় না। বাবা-মা না থাকলে, কিংবা তাঁরা অত্যধিক কঠোর, নিষ্ঠুর হলে, বা সন্তানদের অবহেলা করলে, অধিকাংশ ছেলেই অপরাধপ্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। যে-সংসার ভেঙে গেছে, সেই সংসারের ছেলে-মেয়েরা বেয়াড়া হয়ে যায়, এটা খুব জোর দিয়েই বলা হয়। তবে, সংসার ভেঙে যাওয়াটাই বড় কথা নয়; ঝগড়াঝাঁটি খিটিমিটি অশান্তিটাই হল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা শিশুকে স্নেহ করুন বা না করুন, তাঁদের নিজেদের মধ্যেই যদি অহরহ কলহ লেগে থাকে, তা হলে অল্পবয়সী শিশুর মনে অপরাধপ্রবণতা জেগে ওঠা কিছুই অস্বাভাবিক নয়। সমাজের অধিকাংশ লোকই মানতে চান না যে, অপরাধপ্রবণতার গোড়া হল পরিবারের দুটি প্রধান মানুষ—মা আর বাবা।
কয়েকদিন আগের ঘটনা, হাবড়ার দেশবন্ধু নগরের ১৮-১৯ বছরের এক ছেলে আত্মহত্যা করেছিল। কারণ, সে পূজোয় বাবার কাছে একটা বাইকের আবদার করেছিল। খানিক অর্থনৈতিক সমস্যার দরুন বাবা বলেছিলেন, এই তো কয়েক দিন বাদের দীপাবলিতেই কিনে দেবেন। কিন্তু এইটুকু অপেক্ষা, এইটুকু ধৈর্য সে ছেলের সহ্য হয়নি। ফলত সেই মাবাবাকে অকালে হারাতে হয়েছিল তাদের একমাত্র সন্তান। হয়ত ছেলেটির বাচ্চা বয়সে যুক্তিবোধ জাগবার আগে থেকেই তার মাবাবা তার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মিয়ে দিয়েছিলেন যে, সে যা চাইবে তক্ষনি তাই তার প্রাপ্য। কেবলমাত্র আত্মহত্যার মতো আচরণ নয়, এই ধরণের অধিকাংশ বাচ্চারা বড় হলে, তাদের কোনও খেয়াল পূর্ণ না হলেই চুরি করার মতো সিদ্ধান্ত নিতেও পিছুপা হয় না।
শিশুদের চুরি করা বা না বলে নেওয়ার স্বভাবটি অহরহ চোখে পড়ে। এক শিক্ষক দিবসে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের দেখাদেখি ক্লাস ফোরের কিষানও একটি কলম গিফট করেছিল, যেটি ছিল মাস কয়েক আগে আমার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় একটি কাঠের কলম। কিছুতেই সে কথা তাকে স্বীকার করানো গেলো না, বরাবরই বলে যাচ্ছিল, তার বাবা কিনে দিয়েছে! ক্লাসে কখনও সহপাঠির স্কেলবক্স, খাতা, খেলনা সুযোগ পেলেই সে সরাতো। তাকে দিয়ে যদি জোর করে খাতায় এক হাজার বার লেখানো যায়, 'না বলিয়া অন্যের কিছু লইলে চুরি করা হয়', তাতে হয়ত তার হাতের লেখা আরও খানিক ভালো হত, কিন্তু তার হাতটান স্বভাব ন্যূনতম কি ঘুচত? ছোট ছেলে-মেয়েদের মধ্যে চুরি করার প্রবৃত্তি একটা সমস্যা এবং এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অনেকেই ছোটদের মধ্যে সরল অনভিজ্ঞ শিশুটিকে ভুলে যান। শাস্তি বিধানের সাথে দোষ দেন শিশুটির বস্বভাব এবং নীতিহীনতার।
এই প্রসঙ্গে শ্রুতি নামের মেয়েটির কথা মনে পড়ছে, বড় হয়ে চাকরির সূত্রে ইচ্ছে করেই দূরে চলে গেছেন, পরিবারের সাথে নিতান্ত যোগাযোগ রাখতে হয় তাই রাখেন, যেন তেমন টানই অনুভব করেন না! কারণ জানতে চাইলে বলেছিলেন, তারা দুইভাইবোন, সে ছিল ছোটো, মেয়ে বলেই ছেলেবেলা থেকেই পরিবারের নিদারুণ অবহেলায় সে মানুষ হয়েছে। খাবারের বড় ভাগটা সবসময় দাদাকে দেওয়া হত। তিনটে চকোলেট এলে দুটো পেত দাদা, আর বাকি একটা পেত সে। একাধিকবার দাদা বাড়ি থেকে টাকাপয়সা চুরি করে তাকে চুরির অপবাদ জড়ালে মাবাবা সহজে মেনে নিয়ে শাস্তি বিধান দিতেন। ফলত পরিবারকে কখনোই ক্ষমা করতে পারেনি শ্রুতি। তার দাদা যে বাড়ি থেকে মাঝেমধ্যেই চুরি করায় সিদ্ধহস্ত হয়েছিল, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই, কারণ তার মাবাবাই অজান্তে তাকে শিখিয়েছিলেন, অপরের জিনিসে ভাগ বসিয়ে নিজের তৃপ্তি সাধনে দোষ নেই। আত্মতৃপ্তি সাধনের এই স্বেচ্ছাচারিতার মনোভাব শিশুর মনে বড়রাই অজান্তে জাগিয়ে দিয়ে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে, আত্মতৃপ্তির স্বেচ্ছাচারিতা আর এই অসন্তোষের বোঝা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নানাভাবে ছোটদের চুরির পথে টেনে নিয়ে যায়।
এই যে শ্রুতির দাদা বা কিষাণকে দেখা গেলো চুরি করে অস্বীকার করতে বা মিথ্যা কথা বলতে, আসলে চুরির মতোই ছোটোদের মধ্য আরেকটি অন্যতম প্রবণতা হল মিথ্যে কথা বলা। ওদের দেওয়া অজুহাতের হাতেখড়ি আমাদের হাতেই, মিথ্যে কথা বলার পাঠ আমরাই প্রথম দিই ওদের। জাপানে শিশুরা মিথ্যে কথার অস্তিত্ব জানতে পারে না, তাদের শেখানো হয় তেমনই। অথচ আমাদের এখানে,
বাচ্চাটি খেতে না চাইলে, তাকে বলা হয়, খেয়ে নাও বাবা, না হলে জুজু চলে আসবে।
শিশুদের মোবাইল আসক্তি
কার্য উদ্ধারই হোক বা যথেষ্ট ধৈর্যের অভাববোধ হোক বা শৈশবের অনির্বচনীয় আচরণ থেকে নিস্কৃতি পেতে আমরা অবিভাবকেরা শিশুর সামনে পেশ করি জোড়ালো বাহানা। যেমন, শিশুটি যাতে অযথা বিরক্ত না করে সেজন্য তার হাতে এখন যত্রতত্র ধরিয়ে দিই স্মার্ট ফোনটি। এখন হামেশাই দেখা যাচ্ছে, স্মার্ট ফোনটি না চালিয়ে দিলে শিশুটি আর ভাতের গ্রাস মুখে তুলছে না। খেতে খেতে সে মোবাইল দেখছে। তার কেবল আগ্রহ মোবাইল স্ক্রিন জুড়ে, সে কী খাচ্ছে তাতে তার কোনও আগ্রহ নেই! খাদ্যের প্রতি আগ্রহ থেকেই মুখের লালার (স্যালাইভা) ক্ষরণ হয়, যা থেকে খাদ্যের প্রাথমিক হজম ক্রিয়া শুরু হয়, মুখকে যা রাখে ব্যাকটেরিয়া মুক্ত। কেবল খাওয়ার আগ্রহের দরুন স্যালাইভা ক্ষরণে অনেক কঠিন খাবারও সহজে হজম হয়। সেখানে শিশুটি দিনের পর দিন আগ্রহহীন খাদ্য গ্রহণে কতটা হজমে পৌঁছোবে? সে খাদ্য কতটাইবা পুষ্টি জোগাবে তার শরীরে?
আজকাল মোবাইল অ্যাডিকশন কে বলা হয় ডিজিটাল ডায়েট। আমরা যেমন খাই, মোবাইলটাও একটা ডিজিটাল ডায়েট হয়ে গেছে, মানুষ খাচ্ছে। মোবাইল ছাড়া আমরাও আর এক পাও চলতে পারি না। নিজের দিদির বৌভাতে গিয়ে রাকেশের দেখি মুড অফ, কোনও আনন্দেই দেখি সে সামিল হতে পারছে না। শেষমেশ জানতে পেরেছিলাম, সে ভুল করে বাড়িতে তার স্মার্ট ফোনটি ফেলে এসেছিল বলেই সে যেন প্রাণহীন, আনন্দহীন! কিশোর কিশোরীরা এখন এই nomophobia-তে ভুগছে। দশ মিনিট ফোন থেকে দূরে গেলেই তাদের মনে হয় পৃথিবী যেন হারিয়ে গেছে। এই উত্তেজনাই হল 'NOMO (NO MOBILE) PHOBIA' ডিজিজ। ফলত আপনি চাইলে যেকোনও বাচ্চাকে মোবাইল ফ্রী করাতে পারবেন না। তাই মোবাইল দেখাবেন, কিন্তু সল্প সময় ধরে। কেন? মোবাইল দেখতে বসে ওদের কল্পনা শক্তি কমে যায়। দেখেই যায় কেবল, চিন্তা করে না ওরা। কিন্তু পড়া আর শোনার ক্ষেত্রে চিন্তা ও কল্পনাশক্তির পরিমাণ বাড়ে বহুগুণে। ধরাযাক, একটি পৃষ্ঠায় লেখা আছে, 'এরোপ্লেনটি আকাশের মাঝ বরাবর উড়ে গেলো'। এই বাক্যটি পড়ার পরে পাঠক নিজের ইচ্ছেমতো আকাশকে ভেবে নিতে পারছে, যেখানে তার ইচ্ছেমতো থোকাথোকা মেঘ ফুটে আছে, হয়তাবা চাতক পাখিটি উড়ছিল মাঝ আকাশে তার ঠিক উপর দিয়ে এরোপ্লেনটিকে উড়ে যেতে দেখতে পেল যেন মানস চক্ষে। কিন্তু মোবাইল স্ক্রিনে কেবল তার জন্য নির্ধারিত আকাশ।
শিশু চায় পূর্ণবয়স্কের মর্যাদা
আগামীকাল একটি শিশু কী হবে তা নিয়ে আমাদের সমাজের অধিকাংশরাই উদ্বিগ্ন, তবুও তো সেই আমরাই ভুলে যাই যে সেই শিশুটি আজকের একজন কেউ। পদে পদে বোঝাই তার গুরুত্ব এখনও কী পরিমাণ মিহি। দেখা গেল একজন পিতা, তাঁর এক বন্ধুর সাথে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত। সেই আলোচনার মাঝে তার শিশুটা এসে কিছু বলতে চাইলে, তাকে প্রায়শই বলা হয়, "দেখছো না আমরা বড়রা কথা বলছি, পরে বলো, যাও এখন।" সেই পিতাটি বুঝতেও পারল না তার থেকে শিশুটির কী পরিমান ক্ষতি সাধিত হল। শিশুটি যে কম গুরুত্বের, তার বড় না হওয়ার আফসোসসহ তার মধ্যে তৈরি হল নানান হীনমন্যতা। এ প্রসঙ্গেও কয়েকদিন আগের একটা ঘটনা শোনাই। বাড়ির পাশের এক বৌদি বললেন,
—'আমার ছেলে তোমার কথা কী সুন্দর শোনে! কই আমাদের কথা তো শোনে না!’
বৌদিটিকে বললাম,
—'দোষ তোমাদেরই, কেননা ওর গুরুত্ব পেতে চাওয়া তোমরাই বাচ্চা বলে ওর আচরণ বা কথাবার্তায় গুরুত্ব দাও না। এই একটু আগে আমি আর বুদ্ধির বাবা গভীর এক আলোচনায় ছিলাম, মাঝে বুদ্ধি এসে মামা বলে ডাকতেই দিলাম আলোচনা থামিয়ে, ওর কথা মন দিয়ে শুনে বললাম, 'ঠিক আছে মা, তাই হবে, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি, বাবার সাথে আগে একটু কথা বলে নিই, তুমি বরং একটু একা একা খেলতে লাগো'। কী অদ্ভুত! আর বিরক্ত না করে একাই খেলতে শুরু করে দিল। তাই বলি কী বৌদি তোমার ওই বাচ্চাটিকে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সমান গুরুত্ব দাও আগে। দেখবে সব যুতে এসে যাবে।
আপনারা অনেকে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, বাচ্চারা বড়দের কথোপকথন গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে, সম্ভবত যা শুনছে তার হয়ত একটি শব্দও বুঝতে পারছে না। তবু শোনে, কিছু শব্দ ধরে রাখার চেষ্টাও করে, এবং তারা প্রায়ই আনন্দের সাথে কিছু শব্দ পুনরাবৃত্তি করে এই সত্যটি প্রদর্শন করে যা তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা বড়দের নির্দেশবোধক বাক্যে আমল দিতে ইচ্ছুক নয়। ইচ্ছুক বেশি, সেই বড়দের অনুকরণ করতে। শিশুদের মতো মহান অনুকরণকারী এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই, মহান কল্পনাপ্রবণ মনের অধিকারীও নেই। শিশুরা কেবল নির্দোষ এবং কৌতূহলী নয় বরং আশাবাদী, আনন্দদায়ক, সুখী এবং জিনিয়াসই বটে।
"মানুষ জন্মায় জিনিয়াস হয়ে
আর মরে ইডিয়ট হয়ে।"
ঠিকই লিখেছিলেন চার্লস বুকাউস্কি। প্রতিটি শিশুই আসলে জিনিয়াস হয়ে জন্মায়। অথচ আমরা দিনকে দিন ইডিয়ট হয়ে যাওয়া মানুষগুলো একটা শিশুর সাথে আরেক শিশুর তুলনা করে আফসোস পুষি, শিশুটির খারাপ আচরণে তাকে কঠোর শাস্তির বিধান করি। আমাদের মতো এইসব ইডিয়ট অবিভাবকদের প্রতি গ্রীক দার্শনিক ডায়োজিনিস একটা বক্তব্যকে ছুড়ে দিয়েছিলেন সেই সূদুর অতীতে,
"ছাত্র খারাপ আচরণ করলে তার শিক্ষককে চাবকানো হবে না কেন?"
হ্যাঁ, চাবকানো হোক আমাদের, আমরাই দায়ী। এতকাল আমরাই অনুধাবন করতে পারিনি আমাদের শিশুকে। দেখেছি, একটা শিশুকে গুরুত্ব-শ্রদ্ধা-ভালবাসা দিলেই যেখানে মহান চুক্তিতেও সে কী অবলীলায় সম্মতি জানায়, সেখানে কেন জোরপূর্বক আদায়ের নিয়ম? সন্তানের আত্মার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সহানুভূতি, দয়া এবং উদারতার সম্পদ কেউ কেন সহজেই উপলব্ধি করতে পারি না? প্রতিটি সত্যিকারের শিক্ষার প্রচেষ্টা কী সেই সম্পদের দরজা খুলে দেওয়া নয়? আমরা যদি সত্যিই আমাদের বাচ্চাদের সুখী, উৎপাদনশীল, নৈতিক জীবন চাই, আমাদের কী উচিত নয় তাদের আউটডোর খেলার জন্য বেশি সময় দেওয়া? তাদের অনুকরণপ্রবণ মানসিকতার কাছে দুর্দান্ত কিছুর নাগাল পাইয়ে দেওয়া আমাদের কি আশু কর্তব্য নয়? তাদের বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য কল্পনাপ্রবণ মনের সীমানা বাড়াতে কেন তাদের রূপকথা, গল্প শোনাবো না বা পাঠে উৎসাহিত করব না?
আসুন প্রার্থনা করি, বাচ্চাদের মনের ওজন বুঝে মেলামেশায় আমরা যেন সতত সফল হই। ওদের প্রতি আমাদের আরও ধৈর্য বাড়ুক। “ওরা বড় নয়, ওরা যে নিতান্তই শিশু”— ওদের ভেতর এই আক্ষেপের পরিবেশ যেন বারংবার না তৈরি করি, কোনও ভাবেই যেন ওদের হীনমন্যতায় ভোগার কারণ না হই। অনুশাসন যেন আমাদের তার শাসক না বানায়, বন্ধুর ভুল ক্ষমা করা যায়, শাসকের ভুল এক জীবনে ক্ষমা করা যায় না। মোটকথা, ওদের কাছে বিশেষ এক আগ্রহের বিষয় যেন হই আমরা, যেন ওরা আমাদের প্রেমে পড়েছে! একজন প্রেমিক ডেডিকেশানে এসে অনেক বড় বড় চুক্তি (deal) অবলীলায় মেনে নেয় যেমন। ঠিক তেমনই, দেখবেন, বাচ্চারা আমাদের ইমপ্রেস করতে কত কিছুই করছে তখন! এমন কী যে বাচ্চাটি মোটেও পড়াশুনায় বসতে চায় না, দেখতে পাবো, সেও পড়াশোনায় বসে আমাদের কী ভীষণ ইমপ্রেস করতে চাইছে তখন!
অনবদ্য বন্ধু।
ReplyDelete