Monday, July 20, 2020

কাব্যগ্রন্থ: মোমবাতি ও স্বপ্নের প্রত্যাবর্তন (২০০৭) নির্বাচিত কবিতা




রচনাকাল— ২০০৬ ।


প্রকাশক ও প্রকাশকাল— অভিযান পাবলিশার্স, কলকাতা বইমেলা জানুয়ারি ২০০৭।



উৎসর্গ


হলুদ ফুল

পাশবালিশ

ধুলোবালি

ফিসফিস


বিভাব কবিতা

____________

ফুল দিতে পারিনি

হলুদ ফুল...

আসলে ফুলের আশে-পাশে

এমন সব অনুভূতি আছে,

যার এখনও শব্দ তৈরি হয়নি


ছেলেবেলায় বাবা একটা কাগজের জাহাজ তৈরি করে

দিয়েছিলেন... আজ সেটা মোমের আলোয় ভাসালাম



বোধ ও মননের মধ্যে সুপ্ত ফারাক খুঁজতে দু’চারটে অবকাশ

রবিবারের মতো পর্দা সরিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানায়।

অস্তত্ব জানালা ও দরজার উপর ভীষন আস্থাশীল।

কিন্তু আমাদের সুদক্ষ হাত ওখানেও রঙ চাপায়।

প্রতিফলিত রঙে তীব্র হয় দুটি আর্তনাদ—

                             একটা ইচ্ছের, অন্যটা ভয়ের।

প্রতিশ্রুতি মিথ্যে হ’লে ভালবাসা, ভাললাগাগুলো

বোতাম সেলাই ভুলে যায়। একথা ঠিক—

অবস্থান কখনও অতীত, ভবিষ্যত ভাবে না। শুধু ভাবে—

‘আজকে থাকাটা জরুরি’।

তবুও অস্বচ্ছ প্রচ্ছয় আঁকড়ে ধরে প্রচ্ছদে নিজেদেরকে

বন্দর ভাবি কেউ কেউ...। জোয়ারের উৎসাহে জোনাকির

জ্বলে ওঠা, অথচ ভাঁটার টানে অস্বচ্ছ অনুভব।

অস্বচ্ছ অনুভব কখনও ঋতুদের ধারক হতে পারে না।

শুধু স্পর্শের পরিসীমায় নিজের আয়তনকে তুলে ধরে।

তাই দৃশ্যরা চিরকাল সাহায্য প্রার্থী হয়ে থেকে যায়

নোঙরের কাছে... তবুও দু’একটা জাহাজ দৃশ্য খুঁজতে এসে ডুবে যায়।

বহুদিন... বহুদিন জলের নীচে। একদিন পাটাতনগুলো

আলগা হলে স্বতন্ত্র অংশেরা পুনরায় ভেসে ওঠে এবং

পেরিয়ে যায় অজস্র প্রতিশ্রুতি... অজস্র বন্দর...



দুই
___

তারপর সকলেই একদিন সিঁড়ি হয়ে গেলাম।

সিঁড়ির ভাঁজে ভাঁজে তীর্যক রেখা, ভাঙাকাচের গুঁড়োর মতো

অহংকার... সরলরেখা হয়ে খোলা দরজায় আত্মমোচনে

শিখে নেয় চুম্বনের বুনন !

আলো, খোলা দরজা দিয়ে দিনে বাইরে থেকে ভেতরে এবং

রাতে ভেতর থেকে বাইরে যাতায়াত করে। রাত গভীর হলে

সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে আলো, কেঁপে কেঁপে ওঠা সময়।

আয়ু ফুরিয়ে গেলেও

গ্রীবা থেকে

          আরেকটা জন্মদিন

           মাথার কাছে জ্বলিয়ে রাখে মোমবাতি...



তিন
____

ক্ষতই শেষ কথা নয়।

গলিত মোম দিয়ে আরও একটা মোমবাতি তৈরির

দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বুঁদ হলেই ক্ষমতার অপমৃত্যু।

আর ভোর নিশ্চিত হলেই বাবা আমাকে দেখতে চান...।

তারপর দু’টো মুখ মুখোমুখি বাকি অন্ধকার গ্রাস করে।

পূর্ণতা অনুসরণ করে নাবিকের সংযম!

এখন সেখানে রাত হলে একটা মোমবাতি

নিজের মাংসের চরিত্র বর্ণনা করে।



চার
____

কিছু সত্যের ভূমিকায়, কিছু মিথ্যের প্রশ্রয়ে

প্রতিশ্রুতিরা দেওয়াল-লিখন হয়ে যায়।

যার সাশ্রয় মূল্য নেই, তার অধিকার মূল্য

আমাদের গ্রাস করে...

সকাল বিকাল চিমনি থেকে ধোঁয়া বের হয়

ভূত শব্দের অভিধান প্রতিফলক রাখে বিস্ময়ে-

মনের বিষাদগুলো মোমের আলোয় পুড়ে যাওয়া

প্রজাপ্রতির ডানার প্রলেপ... সুস্থ হয়ে পুনোরায়

আলোয় আবর্তিত !

 

পাঁচ
____

ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বৃক্ষের প্রসারিত বাহুও

ভালোবাসার বিরুদ্ধচারণ শেখায়।

যার জন্য অস্তিত্ব, তার জন্য টিউশনি ফেরত

শিমুল বোঝে— নিজস্ব ক্ষমতা অপেক্ষিক...

চুম্বক দন্ডের বিপরীত ক্রিয়ার মতোই

আকর্ষণ আত্মহত্যা করে অথবা পাগল হয়ে যায়।

আসন ঘরের মোমবাতি নিভিয়ে মা ফিরলে

এক দৌড়ে মা’র কাছাকাছি

প্রসাদের সিংহভাগ

                 তখন ক্লাস থ্রি...

বরং অবস্থানের হিসাবেই আসি—

ধরি,

বর্তমান = মোমবাতি

আপেক্ষিক = মোমের পুড়ে যাওয়া

অতএব,

    জমে যাওয়া মোমে শিমুলের একমাত্র কাজ

    সলতের যোগান...



ছয়
____

দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই সিদ্ধান্তে ফিরে আসতে চাই প্রত্যেকে।

মাঝের সময়টুকু নির্দেশিত অর্থে ফসল চুরি করে।

ধানের-গোলায় প্রবেশ পথে এক মোম জ্বলে সারারাত...

অনেক সাহসী ইঁদুরের মতোই তোমার পরিচয় উপহার হিসাবে

গ্রহনের পর দেখেছি—দাবি এসেগেছে !

ইচ্ছার স্বাধীনতা প্রকট হওয় প্রত্যেকেরই...

ইচ্ছার অপচয়ে দেখেছি— প্রিয় মানুষেরা নিজেরাই

বেমালুম মরীচিকা!

তাই আয়নায় নিজের প্রতিকৃতি ঠিক নয় জেনেও

শুধু তার শাসনই গ্রহন করি।

ঘরমুখো প্রতিটা মানুষের হাতে সবজি তুলে দিলেই

সন্ধ্যার গায়ে আরতির শিখা হেসে ওঠে!

শুধু তুমি নও...

শ্মশান ফেরত আমিও স্বভাবিক জীবন-যাপনে নির্বাচিত হই।



সাত
____

এভাবেই সময় কাটানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করি!

সহ-অবস্থান ও শান্তি এখন অনায়াসে মানতে পারি।

শুধু ‘সিদ্ধান্ত’, যা কখনও বুঝতে পারি না।

অয়নদের বাড়িতে একসন্ধ্যায়

তুমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে

বিষদাঁত ভাঙতে ভাঙতে একদম ভুলেগেছি।

সত্যের গভীরে যেতে সকলেরই ভয়।

তাই কোনোদিন বুঝতে চাই না—

‘ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেলেই

ক্রমশ বেড়ে চলে স্টেশনের দূরত্ব...’

বরং সুক্ষ্ম এই পরিবর্তনে ভাবপ্রবন অস্বীকারকে গুঁজে দিই।

ঘরির কাটা কি জীবাশ্ম ভালবাসে?

যে তাকে পড়তে ভালবাসে, তার নির্দেশ কি অমান্য করে?

তিনি হলে বলতেন— নির্দেশ এবং বোধ, নির্দেশ এবং জীবন

কোনোদিন এক হয় না।

বুঝিনি কিছুই!

শুধু এক একদিন নিজের আঙুল পোড়াতে গিয়ে থমকে গেছি

মোমের আলোয় দেখেছি—

                 আলোর নীচে গাঢ় এক নীল বলয়!

এখনও সেই নীলরঙ

কারও কারও ফেলে যাওয়া হাতের ছাপে

আমাকে হাত মেলানোর ইঙ্গিত করে



পর্বান্তর
_______

বিছানা জুড়ে মোমের আলোরা জ্বলে

তুই খুঁজিস একাকিত্বের মান!

আমি যে তোর খোলা বইয়ের পাতা

চোখের পাতা ডুবিয়ে করিস স্নান...



আট
_____

অভ্যাসের পরিবর্তনে—

             বামচোখ ঈষৎ জ্বলে যায়

             ডানচোখ তবু তোমার চোখের গ্রন্থিতে

             একটা চেনা অভ্যাস সাজাতে ব্যস্ত...

             তুমি তাঁর অঙ্ক কষতে পারো—

হ্যাঁ! সিঁড়িভাঙা অঙ্ক কষতে কষতে ছাত্রটি

সিঁড়ি বেয়েই নামতে থাকে...

মন ভোলানোর টফি কিনতে গিয়ে

হাসি খুশি মুখে কিনে ফেলে অন্যকিছু...

বিশ্রামের ভেতর স্বস্তি খুঁজতে

তার হাসির ভেতর নিজেকে উপস্থাপন করো...

গুচ্ছ গুচ্ছ মুগ্ধতার শেকলে বন্দি হও...

যেহেতু, কিনে আনা মোমবাতির আলোয়

বিশুদ্ধ মন্ত্রের মতো রাত

এই প্রথম তোমাকে চিঠি লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে...



নয়
____

ব্যাখ্য কিন্তু থাকবে না।

ক্লান্তি ও শাস্তির সম্ভাবনা ভাঙতে যে ঝড় ভীষণ উদ্যোগী

তার থেকে এক পেয়ালা বাতাস তুমি ড্রয়িংরুমে

সজিয়ে রাখো...

মোমের আলো নেভানোর আগে শুভেচ্ছা

বিনিময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো ধুয়ে নাও,

তার পিচ্ছিল পদার্থগুলো পরীক্ষা কর

তারপর

চূড়ান্তভাবে গ্রহণের আগে ভেবে নাও নিয়ন্ত্রণ...

ওই সব সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ

আর নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখো

                               জন্ম ও আমাকে



দশ
_____

দখল নিতে নিতে বিমুগ্ধ তুমি, বোঝালে—

ব্যর্থতার দাবি মেটানো কতোটা জরুরি!

ভুল প্রেমেও মোমবাতি নিজেকে অপচয় করে,

চোরা এক জিভ চেটে নেয় যাবতীয় সন্যাস...

খড়-কুটো জড়ো করতে করতে তোমার প্রয়োজন

এখন শুশ্রুষা জমাতে শিখেছে...

আর

আমার প্রয়োজন শিখেছে— কীভাবে

ঈশ্বরের মতো কালো আকাশ মোমের আলোয়

নীল হয়ে ওঠে...



এগারো
_______

এটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়—

জানালার গ্রিলে রোদ্দুর বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

তোমার চোখের মধ্যে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের

উপস্থিতি গত রাতেও অঙ্ক কষেছিলো,

মোমবাতির একই অবস্থানে আমি বুঝেছিলাম—

রামধনুর রঙ গোনার আর দরকার নেই !

অমনি তুমিও

অনন্তের রাফখাতা মারলে ছুড়ে জানালায় !

ঘোর বিয়োগেও জানালা এমনই

           নিভৃত এক উপার্জনের পথ,

           যে পথে পৃথিবী ঘরে ঢুকছে

           আর আমাদের ঘর বড় হয়ে যাচ্ছে



কিছু কিছু মৃত্যু রূপান্তরিত জন্ম

যেমন-

     আগে কেউ হাত চেপে ধরলেই

     হাত লাল হয়ে যেত...

     বাবার অবর্তমানে

     বাজারের ব্যাগেও এখন

     হাত লাল হয় না।



No comments:

Post a Comment

আমাদের শৈশবখানা ❑ ঋপণ আর্য

Anyone who does anything to help a child is a hero to me. ”    —Fred Rogers প্রায় দুই দশক ধরে আমার অন্যতম একটি শখ হল চাইল্ডহুড ফ...