Sunday, November 15, 2020

ব্যথার সংসার,কী বুঝতে যে কী বুঝলো! ❑ ঋপণ আর্য

এক নিষ্ঠুর গরমকালের ছেলেবেলায় হিমুদের পুকুরের জলে একটা শুকনো বাদামপাতায় কিছু পিঁপড়ে তুলে ভাসিয়েছিলাম। পাতাটা ছিল জাহাজ আর পিঁপড়েগুলো সেই জাহাজের নাবিক। সে এক মজাদার খেলা। জাহাজ ভাসছে তার উপর নাবিকরা এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছে। বাবার তাড়া খেয়ে জাহাজটি না তুলেই স্কুলে চলে গেছিলাম। ভেবেছিলাম, বাড়ি ফিরে বিকালের স্নানে আমার সেই নাবিকদের উদ্ধার করবো। কিন্তু কোথায় সেই নাবিক! কোথায় সে জাহাজ আমার! সারা পুকুর দাপিয়েও খুঁজে পাইনি। ভীষণ মনখারাপ, কাউকে বলতেই পারিনি আমার কারণে তাঁরা নেই, মা-কেও না, কেবল পাপের ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বেরিয়েছি। এমনকি যখনই সেই ঘটনা মনে পরতো তখনই ব্যথা পেতাম। এই যে লিখছি এখনও যেন ব্যথারা হুহু করে জাগছে । জানি সেইরকম পাপবোধ আর জীবিত নেই আমার ভেতর, তবু সেই ঘটনার মনে পড়ায় ব্যথা কিন্তু আছে। এখন প্রশ্নটা হল, সেইরকম কিংবা তার চেয়েও বড় ঘটনায় ব্যথা পাই না কেন? কেনই বা পাপবোধ জাগে না আর? সেই সরলতা ভেঙে কি অনেক বেশি কুটিল হয়ে গেছি? এই কারণেই কি মানুষসহ সমস্ত প্রাণীদের শিশুরা অনিন্দ্যসুন্দর দেখতে হলেও পরবর্তী জীবনে নানান ব্যথার ভার এসে, মিথ্যের ছাপ এসে তাদের চেহারাদের বদলে দেয় এমন?

      চেহারা নয় শুধু যাপনের প্রসঙ্গও বদলে দেয়। পুরোনো অনেক ব্যথাই তখন নিছক মজার প্রসঙ্গ হিসাবে পালিত হয়।  তবু সে ছেড়ে যায় না, সব সময় পাই, হরদম তার ইভেন্ট তৈরিতে ব্যস্ত হই। একজনকে আনন্দ দিয়ে অন্যের ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াই। ধরা যাক, ভারত-পাকিস্তানের খেলা হচ্ছে। ভারত জিতল যেই পাকিস্তান ব্যথা পেল। উল্টোটাও হতে পারে। আসলে আনন্দ দানের ঐ খেলাটাই যে কারো না কারো ব্যথা ছিল। এতটাই প্রশ্রয় দিতে ভালবাসি বলেই তো আনন্দের গান ছাপিয়ে ব্যথার গান অনেক বেশি জনপ্রিয়, আপন হয়ে ওঠে। তার রেখে যাওয়া দাগে রোজ আঙুল বুলোই। তাই হয়ত 'কালোর চেয়ে বেশি সত্যি, ঘা-খাওয়া মানুষ আমরা সন্দেহের চোখে দেখি আলো।'

     আলো ভেবে যে সমস্ত গুণকে একটা মানুষের ভেতর পেয়ে আরেকটা মানুষ জীবনসঙ্গী হিসাবে যাপনে জড়ায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরবর্তীতে দেখা যায় সেই প্রিয় গুণটাই ব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমার মায়ের সরলতাই বাবার পছন্দের অন্যতম কারণ ছিল, কিন্তু এখন দেখা যায় মায়ের সেই সরল ব্যবহার বহুক্ষেত্রেই বাবাকে ব্যথা দেয়। আমার বন্ধুপ্রীতিকে পছন্দ করে যে মেয়েটি যাপনে জড়ালো, আমার সেই গুণটিই তার একসময়ের বেদনার কারণ হল। এমন ঘটনা আরো নানান প্রসঙ্গেই দেখেছি।

      আপাতদৃষ্টিতে একটা সামান্য কথা একটা মানুষ থেকে আরেকটা মানুষে গেলে রূপ বদলে যায়, ওজন বদলে যায়, হিসাব বদলে যায়। ধরাযাক, সেই কথাটা যখন প্রেমিকা বলল, হেসে উড়িয়ে দিলাম। বোন বলল, ধমকি দিলাম। বাবা বললেন, উপদেশ হিসাবে নিলাম। কিন্তু সেই কথাটা যখন একজন বন্ধু প্রসঙ্গ বিশেষে বলল, ভেতরে কোথাও নিদারুণ এক ব্যথা পেয়ে পালটা আঘাতে তাকেই ব্যথা দিয়ে ভারমুক্ত হতে চাইলাম। কিংবা দিলাম না তাকে পালটা আঘাত, সেই বেদনার ঝোপ-জঙ্গল বয়ে বেরালাম কিছুকাল, তাকে দিয়ে বন্ধুটির সাথে মানসিক দূরত্ব গড়লাম। কিংবা খুব কাছের কেউ, যেমন মা, মায়ের খুব সামান্য এক দোষে সেই বয়ে আনা ব্যথার ভার প্রকাশ হল নিদারুণ আঘাতে। এই যে কাউকে পালটা আঘাত হেনে নিজের ব্যথার ভার কমাতে চাইলাম, এমনই তো মানুষ আমরা, নিঠুর পাষাণপুরী। আমরা কেবল পালটা আঘাতেই ব্যথা ছাটি না, একটা ব্যথাকে ঢাকতে আরেকটা ব্যথাকে আঁকড়েও ধরি। আমার হাত কেটে গেছে, হাতে সহ্যাতীত ব্যথা। কিন্তু দেখা গেল পরমুহূর্তে প্রেমিকা আমার, সম্পর্ক ভেঙে চলে গেল। তো কী হল? মুহূর্তে হাতের ব্যথার শোক গেলাম ভুলে। দেখি, প্রেমিকা হারানোর বেদনা তখন আমাকে ফাঁকা ড্রামের মতো কী তুমুল বাজাচ্ছে! তখন আমার এই পরিস্থিতির সমব্যথী কোনো বন্ধু এসে মলম হতে চাইছে। আবার কোনো বন্ধু এই ঘটনায় ঠিক তেমনটাই চরম আনন্দিত, যেভাবে কোনো শোকসভায় কারো কারো নাচার ইচ্ছে হয় খুব। এই যে আরেক বন্ধু এমন ঘটনায় সমব্যথী না হয়ে উপেক্ষা করল, তাকে দেখে যেন আমার কষ্ট বেড়ে গেল হুহু। এমন অনেক চেখে দেখেছি সহ্যাতীত উপেক্ষার বেদনাকে। শিখেছি, কাউকে ব্যথা দিতে হলে তাকে উপেক্ষা করাই অন্যতম পন্থা। হিন্দি একটা সিনেমায় দেখেছিলাম, নায়ক এক একটা মেয়ের সাথে প্রেম করে ধোকা দিয়ে উপেক্ষা করে চলে যাচ্ছিল আরেকটা প্রেমে। কিন্তু শেষে যখন নিজেই উপেক্ষিত হল কারো কাছে, বুঝেছিল আগের প্রেমিকাদের সে কী ব্যথা দিয়ে এসেছে। সে তখন সেই সমস্ত পুরোনোয় ফিরে এসে ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছিল। 

      কিন্তু এই ক্ষমা চাওয়ার সময় আমরা যদি পার করে ফেলি? তখন কী হবে? প্রলয় অনিবার্য? এই আমরা যেমন নিজেদের ব্যথার নিজেরাই কারণ, তেমনি পরিণাম বুঝেও তো প্রকৃতির ব্যথার কারণ আমরা। প্রকৃতি কিন্তু কখনোই নিজের ব্যথা নিজে তৈরি করেনি, অন্যের ব্যথারও কারণ হতে চায়নি । ধরা যাক, ঘোরপাপী আমি, জল যখন পিপাসায় পান করবো তখন সে তার যে যে চরিত্রগুলো বহন করবে, একজন শুদ্ধ মানুষের পিপাসার ভেতর গিয়ে একই তো পরিচয় দেবে। তার কাছে চোর, গুন্ডা, সাধু-অসাধুর কোনও ভেদাভেদ নেই। প্রকৃতি আসলে এতটাই মহান, দীর্ঘকাল তার ক্ষমা ধর্ম দেখে তার ব্যথাকে পাত্তা দিতে ভুলে গেছি আমরা। শুধু প্রকৃতি কেন, শূন্য অচেতন পাত্রেরও তো সহ্য ক্ষমতার একটা সীমা আছে। আমরা কি এখনও টের পাচ্ছি না, প্রকৃতির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা? এরপরেও জীবন্ত বৃক্ষদের হত্যা করে যাবো এমন?

      কথিত আছে আফ্রিকার কঙ্গো উপতক্যা অন্তর্গত বিশেষ এক অঞ্চলের অধিবাসীরা জীবন্ত বৃক্ষকে হত্যা করে না কখনও। কিন্তু তাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকায় তো কাষ্ঠ সংগ্রহের একান্ত প্রয়োজন। তাই তারা কোনো বৃক্ষকে নির্বাচন করে প্রত্যেকেই সেই বৃক্ষের চারপাশে ঘুরে ঘুরে সকাল-সন্ধে গালাগাল দেয়, কষ্টের কথা শোনায়। এভাবে ক্রমাগত চলে কিছু দিন। ব্যথার ভার সইতে না পেরে একসময় বৃক্ষটি শুকিয়ে যেতে আরম্ভ করে এবং মারা যায়।

      মানুষেরও এমন এক ব্যথার মর্মান্তিক তথ্য রেখে গেছেন বিশ্ববিখ্যাত অভিযাত্রী ডক্টর ডেভিড লিভিংস্টোন তার লেখায়। তিনি লিখেছিলেন,  'আশ্চর্য যে অসুখটি আফ্রিকাতে স্বচক্ষে দেখেছি, তা হল হৃদয় ভাঙনের অসুখ। স্বাধীন কোনো মানুষ ক্রীতদাস হওয়ার পরে, দাস-প্রভুদের খোঁয়াড়ে জন্তুর মতো আচরণে পৌঁছে কয়েক সপ্তাহের মাথায় মারা যেত'। লিভিংস্টোন তাঁদের সাথে কথা বলেও জেনেছিলেন, ব্যথা বলতে তাঁরা বুকে হাত দিয়ে দেখাতো, হৃদয়ের অবস্থান যেখানে। ঠিক এই প্রসঙ্গটি তুলেই কবি রণজিৎ দাশ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিকে আঙুল তুলে তার একটি কবিতায় লিখেছিলেন, 'কয়েকশো বছর আগেও মনঃকষ্ট বা শোক মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসাবে চিকিৎসা জগতে স্বীকৃত হত। কিন্তু এখন আর তা হয় না। এখন আর কোনো মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হবে না এই মন্তব্য, ভগ্নহৃদয়ের অসুখে এই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে'।

      আমরা যারা এখনো অ-মৃত তাদের কাছে প্রিয় চরিত্রের মৃত্যু যে কী নিদারুণ বেদনার। অথচ ওই মৃত্যুকে নিয়েই গল্প করতে আমরা যে কী ভালবাসি। এত প্রিয় গল্প আমাদের জীবনে আর কিছু নেই। কর্ণের মৃত্যুর গল্প... ভীষ্মের মৃত্যু... তরুণ কবি অভিমন্যুর মৃত্যু... লোরকার মৃত্যু... বাইশে শ্রাবণ এমন কত যে সঞ্চিত গল্প আমাদের! যেন কোনো শোক নেই... বেদনা নেই... বিষাদ নেই, সবই জ্যোতির্ময় চিরদিনের গল্প আজ। 

      আসলে ব্যথা নিয়েই জন্ম আমাদের, আর মা হচ্ছে সেই ব্যথার আধার, যিনি তিলে তিলে অসম্ভব এক সহ্যশক্তিকে গর্ভে সঞ্চয় করেছেন। এই প্রসঙ্গে মাকড়সা মায়ের কথা মনে পড়ে, তিনিও তার জালে সন্তানদের খাদ্য হিসাবে নিজের শরীরটাকেই বিছিয়ে দেন, সন্তানদের ফালা ফালা করে খাওয়া তিনি সহ্য করে মৃত্যুবরণ করেন। সমগ্র মা জাতিটাই এমন। সেই মায়ের প্রসব যন্ত্রণা অতিক্রম করেই তো জন্ম আমার  কেঁদে উঠেছিল। যতই আমরা ব্যথাকে নানান রঙের হাসি-খুশি-সুখী পোশাক পড়াই না কেন, আনন্দযজ্ঞে ডাকি না কেন, সে হেসে বলবে, 'ঠিক আছে তুমি পালন করো ওসব, আমি বরং তোমার জন্য দরজার বাইরে অপেক্ষা করি'।

      তাই বুঝি রাধা আগাম ব্যথাকে বুঝে কৃষ্ণের সাথে অভিসারে যাওয়ার আগে নিজেকে তৈরি করতে চেয়েছিল? ওঁঝার কাছে মন্ত্র শিখে, সখীদের দিয়ে নিজের চোখ বাঁধিয়ে, উঠোনে জল ঢেলে, কাঁটা বিছিয়ে ব্যথা সহ্যের আগাম পরীক্ষায় হেঁটেছিল সে। যাতে করে গভীর ঝড়-জলের  রাতে পিচ্ছিল কাঁটা বিছানো পথ, সাপ-খোপেরা অভিসারের বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। রাধা মিলনানন্দ পেয়েছিল,  বিরহ ব্যথাও অতিক্রম করে আনন্দ অশ্রুতে ভেসেছিল। কিন্তু 'মাথুর পর্যায়'-কে তো অতিক্রম করতে পারেনি কিছুতে। কৃষ্ণশূন্য সবকিছুই যেন তখন হাহাকার তাঁর, দৃশ্যমান সব কিছুই যেন শূন্য তখন। তাই তো বিদ্যাপতির কবিতায় কী নিঠুর ব্যথায় রাধাকে ডুকরে উঠতে দেখি- 
     'সূন ভেল মন্দির, সূন ভেল নগরী/ 
     সূন ভেল দসদিস, সূন ভেল সগরী'

      আমরা ৯৯ শতাংশ মানুষ 'মাথুর পর্যায়'কে মেনে নিতে পারি না। সেই যে প্রেমিকা ছেড়ে গেল আমায়। একদা দেখা গেল সময় সহ্যের প্রলেপ মাখিয়েছে তাতে।  আমিও হেঁটে চলে গেছি অন্য কোনো প্রেমে। কিন্তু সত্যি ঘটনা এই যে, 'মাথুর পর্যায়'-কে আজও কোনো সমাজ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। সে কোনো মনুষ্যজাতি নয়,  সে হল নেকড়েদের সমাজ। একটি নেকড়ের জীবনসঙ্গী কখনো যদি মারা যায়, তাহলে বেঁচে থাকা নেকড়েটি বাকী জীবনে কখনোই আর কোনো নেকড়েকে জীবনসঙ্গী করে না। হয়ত সঙ্গী হারিয়ে ফেলার ব্যথাটাকে বাকি জীবনটুকু বইবে বলেই এমন তার যাপন।

      আমাদের যাপনে ব্যথাকে সাধারণত দুই পথে পাই, একটি দৃশ্যমান অর্থাৎ শারীরিক, অন্যটি অদৃশ্যমান অর্থাৎ মানসিক। কিন্তু এই দুটির অনুভূতি এক জায়গাতেই তো হয়, মস্তিষ্কে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা অন্যের দৃশ্যমান ব্যথাগুলোয় উতলা হই। এই প্রসঙ্গে একদিন এক দাদা বলেছিলেন, 'দেখবে একটা অ্যাকসিডেন্টে তোমার এক বন্ধুর পা ভেঙে গেলে তুমি বা তোমরা উতলা হয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে ছুটলে, বারবার তাকে দেখতেও গেলে। কিন্তু সেই বন্ধুটি যখন মানসিক গোলযোগে মস্তিষ্কের তার কেটে ফেলল, খারাপ লাগা পেলেও তাকে তো কই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে না? একসময় পাগল আখ্যা দিয়ে কেবল পাশে সরিয়ে রাখলে। ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে তোমার উতলাটুকুও গেল ফুরিয়ে!  ' কী অদ্ভুত!!  এটা কেন হল?! এ কেমন ধাঁধা? আসলে কেউ আর এই শত সহস্র কর্মের সংসারে সহ-কর্মী ঈশ্বরকে ডেকে মনের কথা বলি না যে, তাঁর মনের কথাও তো শুনি না।  যদি শুনতাম একটু সময় নিয়ে এসব বেদনা, তাহলে স্টেশনে যে ভিখিরিটাকে এক টাকাও দিলাম না, তার  ব্যথার গল্পে মনোযোগী নিজেই হয়ত গোটা পকেটটাই উজাড় করে দিতে একটুও পিছপা হতাম না।

      'কেন এমন হয়' ভাবতেই যেন ভেতরে গোপন এক কান্না বেজে ওঠে। যেন এই নিভৃত গোপন অশ্রুপাতের পর কিছুতেই আর বলা যাবে না,--  'এই অশ্রু আমারই সবটুকু!' এর মধ্যে যে এই জগৎ সংসারের কার কতটুকু কীভাবে এসে জড়ো হয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা কারও সাধ্য নয়। এ হল আসলে এক মহা-মিলন। কে এই মিলনের ঈশ্বর, যিনি এমন মেলালেন আমায় জগত সংসারে? সেই মিলন কি পূর্ণ হল আমার ভেতর এসে? বড়ো সংশয় জাগে। এ সংশয় যেন পৃথিবী দাপানো বর্ষার রাতে নিঃঝুম বেদনায় নিজেকে খোঁজার সংশয়। যেন মনে হয়, 'আমি আর পারছি না, কিছুতেই পারছি না, এক্ষুনি হয়ত ফেটে যাবো'। আর তক্ষুনি মা এসে যেন বলেন আমায়, 
 'তুই কষ্টে থাকলে জানবি,/
 অন্য কোনো কেউ তোর অধিক কষ্ট নিয়ে/
 রাস্তা পার হচ্ছে'। 
কী অদ্ভুত! চোখ তুলে দেখি, নিজের জন্য কোনো শোক নেই, ব্যথা নেই আর। ব্যথা যত রাস্তার দুপাশে সার বেঁধে, হাত নেড়ে ডাকছে আমায়। সত্যিই তো, এই বেদনাঘোর জগতে কারণে অকারণে কত কত ব্যথা দিয়ে ফেলেছি প্রিয়জনে! কত কত অখুশি করেছি! কী নিদারুণ তার ভার! সেই দায়ভারই এখন উপলব্ধির মালিক আমার, আগে জানলে হয়ত গুরুত্বটা এমন হুহু করে মরম ছুঁতো না, কাঙালের মতো মনে হত না, 'ব্যথার এই সংসারে আমাকে বাঁচতে গেলে যে করেই হোক আমার চারপাশের মনগুলো ভাল রাখতে হবে'। নাগালের জল-মাটি, গাছ-পাখি, মানুষ-রাস্তা একবার হাসতে শুরু করলেই যেমন হাসিয়ে ছাড়ে গোটা মরশুমকেই, মন ভালর এমন সংক্রমণ চাই। মানসিক বিচলিত পাশের মানুষটিকে শুনতে শুনতে এই যে বুঝতে পারছি, ব্যথারও তো জ্বর হয়। আমি আমার সমস্ত অন্তঃকরণ ঢেলে তাঁর জলপট্টি হতে চাই। আর সন্ধ্যা শেষে সেই বিছানায় পৌঁছাতে চাই যেখানে ব্যথা এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলবে, এই তো, দ্যাখ, এখন তোর আর কোনো অসুখ নেই।

No comments:

Post a Comment

আমাদের শৈশবখানা ❑ ঋপণ আর্য

Anyone who does anything to help a child is a hero to me. ”    —Fred Rogers প্রায় দুই দশক ধরে আমার অন্যতম একটি শখ হল চাইল্ডহুড ফ...