অনুভূত হয়, এমন স্পর্শ নিয়েই ধরা দিয়েছেন কবি মণিশঙ্কর বিশ্বাস তার অশ্রুতরবার কাব্যগ্রন্থে। এই গ্রন্থ প্রাপ্তির আগে কবি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ভাবে ধরা দিলেও, আমার কাছে প্রথম বিস্তার পেয়েছে এই গ্রন্থে এসে। কেন না কবির সমাদৃত পূর্ব ও প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'চন্দনপীড়ি' নাগালে আসতে তখনও একটু দেরি। 'আশ্রুতরবার'ই সেই অনুঘটক যা আমাকে কবির হৃদয়ের প্রতিবেশী হতে প্রবল উৎসারিত করেছে। অনুভব করি, আমিও তো আসলে সেই প্রার্থনা সঙ্গীতের— "বৃক্ষের সহজতা দাও"। চেয়ে দেখি, অতি সামান্য আমিও কেবল জল-বাতাসা, ছায়াটুকু নিয়ে ফিরে যেতে চাই, ওটুকু যে দিনান্তেরও গৃহ সঞ্চয়। কেন কবি কাব্যগ্রন্থের নাম রাখলেন অশ্রুতরবার? আমাদের যাপনের মুহূর্মুহু অশ্রুবিন্দু রাশির অসিতে নিরন্তর ক্ষতবিক্ষত হয় বলে? ‘অশ্রুতরবার’ শীর্ষক দীর্ঘ কবিতাটির পায়েপায়ে কবির সাথে এই তো পাচ্ছি খুঁজে,— “এত জল জমা ছিল তোমার স্বদেশে/ আমি তার নিচে, প্রাচীন পলির ‘পরে/ দাগ কেটে কেটে আঁকি হরতন, ইস্কাপন, তাসঘর—/ শরণার্থী তাঁবু হতে ধাতুর শিখায়”। আজকের তারিখটি যতই দাগ কাটুক, যতই উল্লেখযোগ্য হোক না কেন আর কোনও দিন ফিরে আসবে না! এ যেন ঝরে পড়া অশ্রু দানা, কিছুতেই চোখে ফিরে আসবে না। যে নেই, সে আছে তবু জেগে থাকা স্মৃতিচারণায়। "যেন দুঃখ চলে গেছে/ রয়ে গেছে তার সন্তানসন্ততি"।
কবিতা রচনার ক্ষেত্রে নতুন নতুন উপমা আবিষ্কারের কথা বলতেন বিনয় মজুমদার। এই বইয়ের কমবেশি প্রতিটি লেখায় আবিষ্কারের মতো নাগাল পেয়েছি উপমার, যা শব্দ ছাপিয়ে, পঙতি ছাপিয়ে কবিতাকে সমুদ্র বানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে উথলে উঠে আসতে চাইছে "বাংলাদেশ" কবিতাটি,— "আমাকে আলাদা করো দুপুরের নির্জনতা থেকে— / দুপুরে শ্যামল ঘেরা পুকুর পাড়ের থেকে— / যেখানে তোমাকে ভাবি। / ভাবি, হয়তো তুমিও দূরে গিয়ে /ভেবেছো আলাদা হবে, আমার মনের থেকে—/ যেন সংখ্যালঘু মনস্তত্ত্ব—/ যেন বৃষ্টির ভিতর ফুটে আছে / শাপলার ফুল, একটু খয়েরি, একা। / # /ফাঁকা মাঠের ভিতর গরু চরে নিরুত্তেজিত। / কাঁটাতার ধ'রে বালক দেখেছে দূরে, / অন্য দেশে সূর্য অস্ত যায়।/ হয়তো তুমিও ওরকম দূরে গিয়ে /ভেবেছো আলাদা হবে / # /আমার রক্তের থেকে।” কী অমোঘ আর্তির এই কবিতাটি। মোহাবিষ্ট হই বারেবারে। ব্যথা টের পাই। আচ্ছা কবির ব্যথায় ভেতরটা এই যে চিনচিন করে উঠল, এর উৎস তো আমার শরীর নয়, তাও টের পাচ্ছি কীভাবে? অশ্রুতরবার গ্রন্থের ব্যাক কভারের কবিতাটির কিছু পঙতি আঙুল ধরে উৎস চেনায়, " শারীরবিদ্যা সম্পর্কে অপ্রতুল জ্ঞানের কারণে / ব্যথা অন্যস্থানে অনুভূত হতে পারে, / প্রকৃত ব্যথার থেকে দূরে।"
তাও প্রকৃত ব্যথা এতই আপন, দূরত্ব মানে না। এই কাব্যগ্রন্থের পরতে পরতে অশ্রুবারি রাশি তরবার সম, গেঁথে আছে এমন, কবিরও কোনো উদ্যেগ নেই যেন ছাড়ানোর। কবি "মায়া" কবিতার শেষ স্তাবকে লিখেছেন,— “সেই একটি পলক বিঁধে আছে— অস্ত্র বের করে/ নিতে ভয় হয়; গাঁথা-অস্ত্র, ব্যথার অংশের মতো/ ব্যবহার করি— তাকে চেপে রেখে দিই সশরীরে/ রক্তক্ষরণ যেন না হয় আর, ব্যথা পাই যত।” —ব্যথা বড় ছায়াঘন। কবি মণিশঙ্কর বিশ্বাস করেন যতটুকু ছায়াময় ততটুকু পেতে রাখা বুক, আমার মতো পাঠকের তার বাতাস দামে এসে বসতেই যেন এই পেতে রাখা। মন পাতলেই যেন টের পাবো 'রুমি' নামের সংগোপনকে,— “ ঘুমোতে পারি না/ সারা রাত/ আলো/ জ্বলে থাকে/ মনে” । কান পাতলেই যেখানে শুনতে পাবো কবির স্বগতোক্তিকে,— “ যদি আরো স্থির হও, চূড়ান্ত ব্যাধের মতো—”। কবি এখানে থেমে থাকার কথা বললেও স্থির লক্ষ্যকে কিন্তু হারানোর কথা বললেন না। কেন বললেন? এই পলকহীন স্থিরতায় সজাগ থেকেও জগতে অনেক বেশি মিশে থাকা যায় বলে? টের পাওয়া যায় বেশি জগতকে? গাছ যেমন গমনহীন চলন চঞ্চলতায় টের পায় সব? এ স্থিরতা কেবল থেমে থাকা নয় বলেই হয়ত কবিকে চলন সর্বস্ব ফুল গাছ হয়ে উঠতে দেখি,— “ তোমাকে পাইনি আমি—/এই কথা খুব বড় কথা নয়/ তোমাকেই ভালোবাসি— এই কথা ভেবে,/ নিজেকে ফুলের গাছ মনে হয়”।
কবি মনিশঙ্কর বিশ্বাসের কবিতার পরম সম্পদ হল সহজতা। একটু বোধগম্যি মানুষ মাত্রেই সহজেই রিলেট করতে পারবে পঙতি থেকে বিচ্ছুরিত অনুভূতিদের। চার ফর্মারএই অশ্রুতরবার কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি মূলত দুটি পর্বে বিন্যস্ত। "বিনিসুতোর মালা" আর "অশ্রুতরবার"। প্রথম পর্বে কুড়িটি ও দ্বিতীয় পর্বে আছে ষোলোটি কবিতা, যার ভেতর আছে আরও একাধিক সিরিজ কবিতা। বইয়ের ব্যাক কভার ব্লার্ব ও বিভাব কবিতাটি খুবই উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও প্রথম পর্বের মায়া, বিনিসুতোর মালা, বাংলাদেশ, নিদাঘ, প্লেজ্যারিজম এবং দ্বিতীয় পর্বের সবকটি কবিতাই উল্লেখযোগ্য। বিশেষত লেখা, শ্যামাগ্নি, ইছামতী, শ্রীচরণেষু, বিন্দু, বাবা কবিতাদের কথা চলেই আসে। কবি কী অনায়াসে ব্যক্তিগত শোকের সরিক করে নেন অভূতপূর্ব দৃশ্য ব্যঞ্জনায়। অমনি কবির 'বাবা'র প্রসঙ্গে লিখেফেলা দৃশ্য ব্যঞ্জনায় আটকে যাই,—
“এখন তোমার হাতে নেই বাজারের থলি।/ শীতের প্রথম ফুলকপি টম্যাটো হাঁসের ডিম/ ইলেকট্রিক বিল কিষান বিকাশ পত্র----/ কিছু নেই ওই হাতে। / বুকের বাঁ-দিকে শুধু ফাঁকা এক মাঠ/ রোদ্দুর সেখানে তার খেলা দেখায়,/ শিরীষ গাছের মাথায় নামিয়ে রাখে গহনার বাক্স।/ যে পথ নদীর দিকে চলে গেছে / তুমি তার জানালায় দাঁড়ানো মেঘ—/ বৈকুণ্ঠের মত নীল আকাশের নিচ দিয়ে/ হেঁটে যাচ্ছ এখন--- / সম্ভবত ফরিদপুরের দিকে”।
কবি মণিশঙ্কর বিশ্বাস সেই বিস্মিত বালক, যা আমার কাছে এক অপার বিস্ময়। যে আপনজন হয়ে উঠেও বোঝায়, "মনে করো আমি কোনো প্রশ্নের আগে ইতস্তত-করাটুকু।" এহেন থেকে যাওয়া আমারও তো! লক্ষ্যকরি, "অজান্তে নিজেকে ছোঁয়ার মতো" সঙ্গে হেঁটে চলেছে "অশ্রুতরবার"।
প্রকাশিতঃ সুখপাঠ ওয়েবজিন (ফেব্রুয়ারী ২০২১) || আলোচিত কাব্যগ্রন্থঃ অশ্রুতরবার || কবিঃ মণিশঙ্কর বিশ্বাস || প্রকাশনাঃ ভাষালিপি || প্রকাশকালঃ ২০১৯
No comments:
Post a Comment