Tuesday, August 16, 2022

ইমোজি সম্পর্কে দু-চার কথা; যা আমি ভাবি ❑ ঋপণ আর্য

খুবই ছেলেবেলা, যখন ডিডি7-এ রোববার চারটে নাগাদ সিনেমা হত। একদিন প্রসেনজিতের কোনও সিনামা দেখছি, বাবাও পাশে ছিলেন। দেখি, প্রসেনজিৎ ট্রেন থেকে একটা ডিগবাজি খাওয়া জাম্প মারলেন, আর মেরেছেন তো মেরেছেন; একটুও না টলে কী সুন্দর বন্ধুর জমিনে দাঁড়িয়ে গেলেন! খুব অবাক হয়ে বাবাকে বললাম, এত সুন্দর কী ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল? বাবা বললেন, নায়করা এসব পারে। শুনে নায়ক হওয়ার বাসনা জেগেছিল কি না মনে নেই। অত অত অবাক হয়ত হতাম না যদি জানতাম গতিজাড্যের কথা, যদি জানতাম 'সিনেমায় জীবন থাকতে পারে, কিন্তু জীবন তো সিনেমা না।' বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের অবাক বা বিস্মিত হওয়ার পরিধি, ব্যথা পাবার পরিধি, পাপ বোধের পরিধি হয়ত সংকুচিত হতে শুরু করে, একপেশে হতে শুরু করে। নইলে ওইসব সময়ের পাশাপাশিতে যে সব বিষয়ে অবাক হতাম তা তো আর হই না, নিদেনপক্ষে একটা পিঁপড়ে মেরে যে ব্যথাবোধ ও পাপবোধ জাগত তা তো আর জাগে না! তবু টের পাই, আর পাঁচজন সমবয়সী গড় মানুষের চেয়ে আমি একটু আলাদা, ধরনধারণে যেন আরও কম বয়সী, বিস্ময় বেশি আর আবেগ তো নিশ্চিত মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বা তারও কম বয়সী কোনও ছেলের। এইজন্যই হয়ত যে কোনও শিশুর আমাকে তার সহজেই সমবয়সী ভেবে নিয়ে আপজন হয়ে উঠতে সময় নেয় না। আর এসবের সাথে আমি টিউওবলাইটও (এখনকার এলিডি টিউব নয়)। ওই যে সুইচ টিপলেই সঙ্গে সঙ্গে জ্বলত না, তেমনই। তাই আমার হাসি তিন প্রকারের। প্রথমে না-বুঝে সকলের সঙ্গে হেসে উঠি, তারপর বিষয়টা বুঝে হাসি, আর শেষে প্রথমে যে না বুঝে হেসেছিলাম; সেটার কথা ভেবেই আরেকবার হাসি। এমনই ট্যালা। কতকত বার যে উপহাসের পাত্র হয়েছি, বইমেলার মাঠে কারো নিদারুণ ধমকে প্রকাশ্যে হুহু করে কেঁদে ফেলেছি, এইফেসবুকেই এমন অনেক বন্ধু আছে সে ঘটনা সহজেই মনে করতে পারবে। স্প্যানিশ কবি বিওলেতা মেদিনা সেদিন আমাকে দেখে তার একটি বইতে স্প্যানিশ ভাষায় লিখে দিয়েছিলেন,—
" ছেলেটি কাঁদছিল, 
কেননা সে হাসতে জানে"

নানান ক্ষেত্রে আমার কম বোঝা থেকে গেছে বলেই হয়ত এখনও ঠিকঠাক সামলে উঠতে পারি না নিজেকে। নইলে '২৪ ঘন্টা' চ্যানেলে সার বেঁধে যশোর রোডের হাত-পা কাটা গাছগুলো দেখে কেন এত লাউড কেঁদে ফেলবো? চোখ বুজে কেন ভেবে ফেলবো, দু-আড়াইশো বছর বয়সের সাড়ে চার হাজার গাছ পরপর দাঁড়িয়ে বলছে; 'এই দেখো আমরা কী সুবিশাল অরণ্য!' সে কী যে আকুলতা, সে কী যে কান্নার ঢেউ! মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে, এই গন মাধ্যমে ডাক দিয়ে; শতশত মানুষের সারা পেয়ে; প্রাথমিক অবস্থায় পৌঁছে যখন দেখি; আমরা মাত্র দশ জন! গাছগুলোকে বাঁচাতে কেন ফের গনমাধ্যমে এসে ভিক্ষে চাইছিলাম, কেন প্রদর্শন করেছিলাম; 'দেখো আমারা এই জনা দশেক ওই গাছগুলোর মতো কত অসহায়, কেন তোমরা সারা দিয়ে কথা রাখোনি?' ওইসব কথা হয়ত অনেকের আতে লেগেছিল। পরের সপ্তাহে জমায়েতে প্রায় পাঁচশো জন। আসতে লাগলো অজস্র মিডিয়ার কভারেজ, অনেক সেলিব্রিটি।  আমি লিডিংয়ের কী বুঝি? পার্টিফার্টি করা কোনও সমাজ সংস্কারকও তো নই।  যে কমিটি তৈরি হল, হলাম না তার কনভেনার, যাদের অ্যাক্টিভিটি ভাল লেগেছিল প্রাথমিক, তাদেরই সাজেস্ট করলাম ওইসব পদে। ভেবেছিলাম, আমার কাজ লেখালেখি, আমার কাজ ডাকাডাকির। তবু আর পাঁচজন সাধারণ আন্দোলনকারীর মতোই সঙ্গে ছিলাম শারিরীক, চাইতাম না গাছ বাঁচাও আন্দোলন কোনও পার্টির ব্যানার পাক, গাছের চেয়ে কোনও মানুষ বা কমিটি বড় হোক, আমি নয় আমরার প্রতিষ্ঠা হোক, গাছের আমারা, কাছের আমরা। কিন্তু একসময় যখন দেখলাম 'গাছ বাঁচাও'-এর ব্যানার চলে যাচ্ছে ভাঙ্গুর আন্দোলনে, যখন দেখলাম সেই আন্দোলনের প্রথম দিকের একদিনে একটি ছেলে একাই গাছ কাটার নীরব প্রতিবাদ করতে করতে বনগাঁ থেকে হেঁটে হেঁটে পৌঁছায় হাবড়ায়; আমার বাড়ি। সেই রাহুল; কমিটির ছেলেদের কাছে কতকত দিন যাচ্ছেতাই রকমের অপমান হয়েও থেকে যেতে চেয়েছিল, শেষমেশ থাকতে পারেনি। ওদের পাশ থেকে সেদিন আমিও মানসিক ভাবে সরে এসেছিলাম, তবু তারপরেও তো গাছগুলোর কথা ভেবে ফের বড় বড় লিফলেট লিখে দিয়েছি কতদিন, লিখেছি কত কত ট্যাগ লাইন,  "যশোর রোডের গাছ বাঁচাও/ ডাক এসেছে পা মেলাও"। যাই করুক তারা, তাদের প্রতি ভালবাসা আছে এখনও জীবন্ত, ঘটনার দুঃখ থাকলেও তাদের প্রতি ক্ষোভ নেই কোনও, তারা ছুটোছুটিতে থেকে গেছিল বলেই না; সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গাছগুলো এখনও বেঁচে আছে।

এমনই ট্যালা, এক কথার প্রসঙ্গে অন্য কথায় ঢুকে যাই। যা হোক যে কথা বলছিলাম, আমি সেই টিউব লাইট, যে কোনও কোনও সময়ে এই ফেসবুকে কারও কারও কমেন্টের রিপ্লাইয়ে কথা খুঁজে পাই না। যারা একটু কাছের তারা জানে; তাদের কমেন্টে কেমন বিভোর থেকে রিপ্লাইয়ে বহু পরে যাই। কিন্তু ফেসবুকে এমন মানুষজন তো আমার সবাই নয়, তাই নাগাল হারাতে পারে ভেবে কোনও পোস্টে শুধু ইমোজি কমেন্ট করি। আজও তেমনই এক বর্ষীয়ান সাহিত্যিকের একটি ছবিতে কমেন্ট করেছিলাম; পরপর চারটে বিষ্ময় বাচক চিহ্ন বা তিনটে প্রশ্ন বাচক চিহ্ন সাইজের নাদান; আপ্লুত ভালবাসা বাচক ইমোজি। তার উত্তরে তিনি যা লিখলেন এবং তার প্রতুত্তরে আমি যা লিখলাম হুবহু তুলে দিলাম।

তিনিঃ "বলার কথা মুখের ভাষায় বলাই কি ভালো না? ছাঁচে ঢালা একঘেয়ে ছবি বা স্টিকার বা ইমোজি দিয়ে মন্তব্য বাঞ্ছনীয় নয়। সময়ের অভাব হলে মন্তব্য না করাই তো ভালো।"

আমিঃ "সেটা হয়ত সার্বিক হিসাবে ঠিকই বলেছেন। কিন্তু 'ভালো লাগলো'-এর চেয়ে কখনও কখনও এই ছোটো খাটো ইমোজি অনেক বেশি বাঙ্ময় হয়ে ওঠে আমার কাছে। বিস্ময়বোধক চিহ্ন যেমন আছে; তদরূপ 'ভালো লাগার' আপ্লুত বাচক চিহ্ন তো নেই কোনও, তাই করেই যখন ফেলেছি মন্তব্যটি;  এই বেলায় তারই চিহ্ন হিসাবে গ্রহণ করুন। পরের বেলায় আপনার ক্ষেত্রে মন্তব্যের আগে বিষয়টি নিশ্চিত পূর্ণ বাক্যে মাথায় রাখবো। ভাল থাকবেন। শারিরীক সুস্থতা কামনা করি।"

হয়ত আমি রিপ্লাই করতাম না। "দাদা, ভুল হয়ে গেছে" বলে এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু যখন মনে হল, তার দৃষ্টিভঙ্গির সাপেক্ষে তাকে খুব বিরক্ত করেছি, আমার ভাল লাগা বোধ তাকে খারাপ লাগা দিয়েছে, তখন আমার দৃষ্টিভঙ্গিটা খোলসা করে জানাতেই তো পারি। তাই লিখেছিলাম।

আজ সকালেই দেখি, বোন প্রফাইল পিকচার বদলেছে। ছবিটিতে  পরী-Prabirদার মাঝে বুদ্ধি বসে আছে। 

কমেন্ট করলাম, "🌿❤️🌿"

এক বন্ধু দেখি এসে লাভ রিয়াক্ট করে গেছে। সে নিশ্চিত বুঝেছিল, দুই সবুজ প্রিয়জনের মাঝে আমার তুমুল ভালবাসা বসে আছে। বা, এরকম গোছেরই অন্যকোনও উপমা ভেবে ভালবাসা জানিয়েছিল কমেন্টটিকে। আমি ভাষায় লিখলে ওই ইমোজিগুলোর মতো অত ভাল কি লিখতে পারতাম? 

আজ দুপুরেই হোয়াটসঅ্যাপে কথা হচ্ছিল কুন্তলদার  সাথে। তার একটা কথার তুমুল সমর্থনে আমি ধুকপুকানি হার্টবিট পাঠিয়েছিলাম, ওই যাকে মনে হয় চলমান বা প্রবাহমান একটা ভালবাসাকে পাঠানো, যার থেমে থাকা নেই। যদি কুন্তলদা মুখোমুখি থাকতো, তখন তার ওই  কথার প্রতুত্তরের আমার উজ্জ্বল সমর্থনের মুখটি দেখতে পেত, সেটা কী ইমোজি নয়? সে কি বুঝে যেত না; আমি যদি কোনও কিছু নাও বলতাম?

এই যে কতকত ইমোজি আছে, ওদের আমার টাইপে কথাবলার প্রসঙ্গে কবিতাই তো লাগে। এক একটা ইমোজিকে প্রসঙ্গ বিশেষে এক একটা আস্ত কবিতা। কবিতার প্রসঙ্গ এল যেই মনে হল, উদাহরণই ভাল ব্যাখ্যা হতে পারে।  একদিন শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে হাবড়ায় ফিরছি, সঙ্গে বন্ধু অভিজিৎ। দু'জনেই জানালার কাছে, দুই বেঞ্চে এবং মুখোমুখি। বিধাননগর ছাড়তেই ভিড় বাড়ল।  আমার আর তার কথার মাঝে একজন ভদ্রলোক বারবার এসে দাঁড়াচ্ছিলেন। কথা বলার সময় তার সাইড দিয়ে মুখ বের করে কথা বলতে হচ্ছিল। আচ্ছা, কথা বলার সময় মুখ দেখাটা কি খুব জরুরি? ওই ট্রেনের আলোয় মুখখানি আসলেই যে জীবন্ত ইমোজি বুঝিনি তখন, এখন প্রসঙ্গ বিশেষে মনে হল। কিন্তু এটাও সত্যি যে; সেদিন সেই মুহূর্তে  শমীকদা একটি কবিতাকে প্রমাণ হতে দেখেছিলাম,— 

     লাইটা 
     জ্বেলে দাও 
     কথাগুলো দেখতে পাচ্ছি না।

🌿

No comments:

Post a Comment

আমাদের শৈশবখানা ❑ ঋপণ আর্য

Anyone who does anything to help a child is a hero to me. ”    —Fred Rogers প্রায় দুই দশক ধরে আমার অন্যতম একটি শখ হল চাইল্ডহুড ফ...