ছেলেবেলায় ভাবতাম, সবচেয়ে বড় জানালা বুঝি জেলখানায় থাকে। সিনেমায় দেখেছিলাম, মানুষের পরিবারে বেড়ে ওঠা গোরিলাটা কয়েদ হবার পর সেলের দেওয়ালে বেড়েওঠার প্রিয় সঙ্গী সেই জানালাটা এঁকেছিল, যে জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তার সারাবেলার সজাগ দেখে আনন্দে কাটাতো। সেদিন তার জানালার জন্যে আমার ভেতরটাও হু হু করেছিল।
আদতে জানালার ভেতরের মানুষটি কখনোসখনো জানালা দিয়ে তাকিয়ে থেকে ঘটমান কোনও দৃশ্য দ্যাখে না, এমনকী বাইরের জগৎটাও দ্যাখে না! কী দেখে সে?...স্রেফ নিজেকে দ্যাখে। তখন তার হৃদয়ের ছবিটি ফুটে ওঠে জানালার ঠিক বাইরে।
জানালা, বাইরেটা প্রকাশ্যে রেখে ভেতরকে খানিক অপ্রকাশ্যে রাখে বরাবর। একদিন টালিগঞ্জের বাসায়, তিন তলার ছাদের ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল পাশের দোতলার ছাদে শীতের রোদে চুল শুকোচ্ছে ছাদওয়ালী। আমি তার গান দেখতে পাচ্ছিলাম। ছাদওয়ালী নামটা জ্যাঠতুতো ভাই অনুপের দেওয়া। বিগত কয়েক মাস ধরে অনুপ ছাদওয়ালীর ‘ছুটফুটন্ত’ দেখে আসছিল। ছাদওয়ালী জানে না তার ব্যক্তিগত খেয়াল এভাবে বেঘোরে চুরি যাচ্ছে। জানালা নির্বিকার, যার শুধু নির্দিষ্ট আকার নিয়ে কেবল থেমে থাকা আছে। কিন্তু জানালা নির্ভর মানুষদের মনোবিকারে পাল্টিখাওয়ার কোনও থেমে থাকা নেই। তাই হয়ত যাকেই জানালা ভাবতে শুরু করা হয় প্রায়ই দেখা যায়, সে হয় দরজা না হলে ঘুলঘুলি হয়ে যাচ্ছে!!
জানালা মানে কেবল কোনও বিশেষ পরিস্থিতির দরজা নয়, প্রকৃতির যাতায়াত নয়, অমল ও দইওয়ালার মতো আরও কত কিছু। বাংলায় একটা জ্যান্ত প্রবাদ আছে, দেওয়ালেরও কান আছে। জানালার বাইরে থেকে উঁকির ইচ্ছেটা যখন প্রবল হয়, ঠিক তখনই দেওয়ালের কান জানালা হয়ে ফোটে । তখন ক্লাস ফাইভ, রুদ্রপুর বাজারের পাশে সবিতানেম্বরের বাগানওয়ালা মাঠে ছুটির দুপুরে ক্রিকেট খেলতাম। কোনও একদিন লেগে ফিল্ডিং দিচ্ছিলাম। উজ্জলের বলে ঘন্টু হাকিয়ে ছয় মেরেছে। বাগান পেরিয়ে হারিয়ে গেছে বল। অনেকের মতো আমিও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আর পাচ্ছিলাম না বলেই খুঁজতে খুঁজতে দুলাল দের ঘর পর্যন্ত পৌঁছতেই ঘরের ভেতরের একটা হাল্কা গোঙানি জানালা দিয়ে ভেসে আসছিল। আমি জানালায় উঁকি দিতেই সদ্যবিবাহিত দুলাল দে বিষম খাওয়ার ঢঙে বলল, ‘তুই রবীনদার ছেলে না? দাঁড়া তোর বাবাকে বলে দিচ্ছি’... মনে আছে, অজ্ঞাত একটা অপরাধের ভয়ে, বাজার ফেরত বাবার হাতে মার খাওয়ার ভয়ে কেটেছিল কয়েকটাদিন। আর দুলালকাকারাও জানালাটাকে নিজেদের ইচ্ছেয় নিয়ে গেছিল, পর্দা লাগিয়ে।
জানালার নিজস্ব কোনও ইচ্ছে নেই। জানালা সান্নিধ্যদের ইচ্ছে আছে নানান। হাবড়া হাইস্কুলের ক্লাস এইটের A সেকশান ছিল দোতালায়, নীচের রাস্তার গা বরাবর। রাস্তার ওপাশে গার্লসস্কুলের পাঁচিল আর পাঁচিল অতিক্রম করা গার্লসস্কুলের দোতালার জানালারা। টিফিন পিরিওডে ক্লাসমেট রাজীবের দুর্ধর্ষ ইচ্ছাপূরণ তার পাশে দাঁড়িয়ে ক্লাসের অধিকাংশের উপভোগের। আক্কেল ভোগে গেলে যা হয়। রাজীব জানালা দিয়ে গার্লস স্কুলের জানালা তাক করে হিসি করতো। সে হিসি নীচের মাঝ রাস্তাও অতিক্রম করতো না। তবুও তার সেই ক্যালমা বহুদিনের। আর এই বহুদিনের একদিনে সে পাশ ফিরে দেখেছিল আমরা কেউ নেই, ক্লাসরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন সহপ্রধান শিক্ষক সুবলবাবু। বীভৎস জান্তব লাগছিল স্যারকে। পেটাতে পেটাতে নিয়ে গেছিলেন। তারপর থেকে স্কুলজীবনে রাজীবের সাথে দেখা হয়নি। দেখা হয়েছিল বহুদিন পরে। শুনে অবাক হয়েছিলাম, তার নাকি গ্রিলের দোকান! তাহলে তো হরেক মাপের জানালা তৈরি হয় তার কারখানায়!! তার দ্বারা জানালার সৎ না অসৎ ব্যবহারে নিয়তি তাকে এই জীবিকা দিল?! আমার ঘরের ছ’ফুট বাই ছ’ফুটের একমাত্র জানালায় বসে আছে রাজীবের কারখানার গ্রিল। এটা ধরে নেওয়া ঠিক না / জানালার গ্রিলে রদ্দুর বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। জানালা জানে রদ্দুর, মেঘ, বৃষ্টির ছাট একনাগারে টিকে থাকার নয়। কিন্তু যে জানালা কখনও রদ্দুর দেখেনি তার কাছে মেঘের খবর আসবে কীভাবে? ফলত সে জানালার ভেতরের দিকটা স্যাঁতসেঁতে থাকে আজীবন। দরজা ভেঙে ফেলার আগেই রিপারা হোস্টেলের ওই রকম একটা স্যাঁতসেঁতে জানালা দিয়ে প্রথম দেখেছিল, মৌ-এর শরীর সিলিং ফ্যানে ঝুলছে!!
আমার ঘরের জানালায় সে স্যাঁতসেঁতে নেই, সব মরশুমই আসে। বছরের দুটো ঈদে অশ্বত্থ তলায় হাজার মানুষ নামাজ পড়তে বসে। আমি জানালা দিয়ে সমবেত প্রার্থনা দেখি। ঈদের সুবাদে জানার বাইরের রাস্তায় মাত্র দু’ঘন্টার মেলা বসে। জানালা দিয়ে তার গন্ধ আসে, আমিন-সাবির-কবির-মিজানুরদের ঈদের নিমন্ত্রন আসে। পিচ পড়বে বলে পুরনো রাস্তাকে আকার ও অবস্থান বদলাতে দেখি, দুপুরের রোদে না হাঁপানো তুহিনের নতুন শেখা সাইকেলিং, সমীরনের নিখুত মার্বেলগুলির টিপ, ইদানিং রাস্তার গা ঘেঁষে উদ্দেশ্য না জানা একটা পাতাল ঘরকে তৈরি হতে দেখি। ভোকাট্টা ঘুড়িকে অশ্বত্থ গাছের মটকায় ঝুলতে দেখি, হাওয়া এলে অশ্বত্থকে সে ঘুড়ি ওড়াতেও দেখি। সবই জানালার সুবাদে। জানালা আমার নিভৃত উপার্জন। জানালার সুবাদে আমাকে টিমু, চন্দন, শুভ দেখে ফেললেই বলে ওঠে, ‘এ কাকা আসবো?’ ওদের ঘরে ডাকি। ওরা গেম খেলার চাইতে গেম খেলা দেখতে বেশি উৎসাহী। ওদের উৎসাহে আমার ঘর ভরে ওঠে। জানালার ঝাপ নামানো থাকলে অবশ্য অশ্বত্থের তলা ওদের ডেকে নেয়। জানালার ঝাপ নামানো থাকলে সকাল ১১টা’কেও আমার ঘরে গভীর রাতের মতো লাগে। আর ঝাপ খুল্লেই মনে হয়, জানালা দিয়ে পৃথিবী ঘরের ভেতর ঢুকছে আর আমার ঘর ক্রমশ বড়ো হয়ে যাচ্ছে।