Monday, September 5, 2022

মগের মুলুকীয় স্বপ্নের বয়সের সেইসব ভাষাপাঠের অনেক শিক্ষক অথবা একজন ❑ ঋপণ আর্য

মহম্মদ-বিন-তুঘলকের রাষ্ট্রনীতিতে সবচাইতে চড়া মাপের মগের মুলুক নেমেছিল। এমনকী, ঐতিহাসিক বারনীর মতে, ‘প্রতিদিনই সুলতানের প্রাসাদ থেকে মৃতদেহ বের করা হত। তিনি বিদ্রোহী বাহাউদ্দিনের মাংস রান্না করে তার আত্মীয়দের খেতে বাধ্য করেছিলেন’... ভাবা যায়! বিশ্বের বাজারে হিটলার, ভারতের বাজারে প্রায় দুশো বছর ইংরেজ রাজত্ব, খানসেনা কবলিত বাংলাদেশে ৭১এর আগের অবস্থা, এমন কী মাতৃভাষাতেও চড়েবসেছিল মগের মুলুক। এই চড়েবসাটাকে ভাঙতে পারলেই স্বাধীন। ভাঙতে পারলেই শোক মুখেও ২১শে ফ্রেবুয়ারী হেসে ওঠে। এরূপ প্রতিবেশী নানান অভিজ্ঞতায় প্রতিকার না ভাবেই মগের মুলুককে পেলেও সরাসরি প্রথম সাক্ষাৎ ক্লাস ফাইভে। তখন ক্লাস ফাইভের আগে স্কুলে ইংরাজী আবশ্যিক পাঠ্য ছিল না। যারা বিত্তবান তারাই কেবল ওই বাড়তি সুবিধা নিতে পারত প্রাইভেট স্কুল মারফত। উক্ত বিষয়টায় তখনকার রাজ্য সরকার মগের মুলুক নামিয়েছিল আরকি। ওই ফাইভে অত্তোসব বুঝতাম না। দক্ষিণ নাংলা হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার আগের বছর সে হাইস্কুলের মীরির সাথে প্রাইমারি স্কুলের আমি স্বাধীনতা দিবসে প্রথম এসেছিলাম। মীরি ওদের ক্লাসের ঘরটায় নিয়ে গেছিল। আমরা বাদে পুরোটা ফাঁকা ছিল। মীরি দরজা, জানালার কপাটে, টেবিলে, চেয়ারে, হাইবেঞ্চে লাথি কাষাতে কাষাতে বলছিল, - ‘দেখছিস তো এখানে কত স্বাধীনতা, আমাদের স্কুল কত্ত শক্ত’। আমার ক্লাস ফোরেই জালবুনতে শুরু করেছিল হাইস্কুল।

কিন্তু কই স্বাধীনতা ফাইভে? বিশেষত মুকুল স্যারের ক্লাস, যার চশমা সবসময় নেমে আসতো নাকের ডগায়। চশমা নেমে যাওয়া ফাঁকা জায়গা দিয়ে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছড়িয়ে পড়তো ক্লাসময়। যার উপর স্থির হত সেই দৃষ্টি, সে সব মুখস্ত ভুলে যেত। মুকুল স্যার তখন কাছে ডাকতেন তাকে। ‘ ওহে বালক এদিকে এস। তারপর, পড়িসনি কেনও? কোথায় বাড়ি? বাবার নাম কি? বাবা কী করে? ইত্যাদি অহেতুক প্রশ্নের তালে তালে নির্দিষ্ট দুই জায়গায় (পিঠে ও পাছায়) বেত কষাতে থাকতেন। আমরা গুনতাম। ৪০টা হাইয়েস্ট। যে সেই ৪০ মারটা খেয়েছিল দুদিনের মাথায় ফের তার স্যারের কাছে যাওয়ার তলব এলে মুখফস্কে সে বলে ফেলেছিল,
-পৃথিবীতে স্যার আপনি আমার সবচেয়ে বড় শত্রু!
তারপর থেকে পেটানো বন্ধ না হলেও তাকে আর পেটাতেন না স্যার। যতদিনে বুঝেছিলাম, স্যার তাদেরই পেটাতেন যারা তাকে ভয় পেত, সাহস থাকলেই পার পাওয়া যায় । ততদিনে মগের মুলুক ক্লাসটারও সন্ধান পেয়েগেছিলাম। ফাইভে তখন নিয়মিত চতুর্থ পিরিয়ডের পরে ছুটি হত। চতুর্থ পিরিয়ডে কুমুদ স্যার ইতিহাস পড়াতেন। এমনিতে স্যার ছিলেন শান্ত। কিন্তু ক্লাসে শব্দ হলেই ক্ষেপে যেতেন। তখন খুব পেটাতেন শব্দকারীকে। ক্লাসে আমাদের আগের দিনের পড়া মুখস্ত লিখতে হত। দুপাতার কম লিখলে হবে না। যে আগে দেখাবে তার ছুটি। স্যার পড়েও দেখতেন না সে সব জমা পড়া খাতা, অথচ টিকচিহ্ন বসাতেন আর ছুটি দিতেন। আমরা তাই উত্তরের খাতায় প্রথম দু-তিন লাইন পড়া লিখতাম তারপর লিখতাম মুখস্ত হয়ে যাওয়া গান, কবিতা আর ইচ্ছাখুশির রচনা। আমার প্রথম ব্যাক্তিগত লেখালেখির ভাষাপাঠ হয়ত ওই মগের মুলুকের ক্লাস থেকেই। কুমদস্যার নাকি বিঘাত মেপে নাম্বার দিতেন পরীক্ষার খাতায়, অতীতে এক ছাত্র নাকি তার কাছে ১০০-র পরীক্ষায় ১১০ পেয়েছিল। কথাগুলো অমুলক লাগেনি। কুমুদস্যারের পুরো বিচার ব্যাবস্থাই ছিল মগের মুলুক। অথচ স্কুলে ক্লাসের বাইরে ছাত্রদের গণ্ডগোলের বিচারের ভার ছিল তার উপর। তার বিচার ব্যবস্থায় অন্যতম রুল ছিল, যে দুজন বা তিনজনকে নিয়ে বিচার তাদের প্রত্যেকের ব্যাক্তিগত অভিযোগ আলাদা আলাদা ভাবে শোনা হবে, কারো আভিযোগের ভিতর অন্য কোনো অভিযোগকারী কথা বলে ফেল্লেই তখন সেই অন্য অভিযোগকারীকে ক্যালান দিয়ে বিচার শেষ। আসলে কুমুদস্যার শাস্তিদানের সময় তুঘলকের মতোই অপরাধের গুরুত্বকে বিবেচনা করতেন না। তখন বাংলাদেশ থেকে বড় বড় ছেলেরা এসে এইট-নাইনে ভর্তি হত। কিন্তু বড় তারা গতরে, মোটেও চটপটে নয়, আদপ-কায়দা, কথাবলার ধরন যেনও কেমন ন্যতানো । আমরা স্কুলের দোতালার বারান্দা থেকে ওদের লক্ষ্য করে নিচে ঢিল ছুড়তাম। লেগেও যেত দুয়েকটা। কয়েক দিনের মাথায় তাড়া করে তারা ঠিক ধরেও ফেলল। কুমুদস্যার আগে তাদের কথা শুনলেন। আমি চুপচাপ। স্যার যখন আমাকে শুনতে চাইল, কেনও আমি ওদের রোজ ঢিল ছুড়ি? আমি হাত কচলে কাচা মিথ্যেকথা বলতে শুরু করেছিলাম, “ স্যার রোজ না, আজকে যখন সাইকেল চালিয়ে স্কুলে ঢুকছিলাম তখন ওই দাদাটা আমাকে থামিয়ে বলেছিল, সাইকেল নাকি তার গায়ে লেগেছে, তাই আমাকে ডান কানজুড়ে একটা চড় মেরেছে। স্যার, কানটা এখনও টনটন করে যাচ্ছে। তাই...’ আর এগতে হল না। এতটা টাটকা মিথ্যে কথা বাংলাদেশ থেকে আসা সরলসোজা ক্লাস এইটের দাদাটার সহ্য হয়নি। সে চিৎকার করে বলতে শুরু করেছিল, ‘স্যার ও সব মিথ্যে বলছে।’ ব্যাস আর যায় কোথায়। বিচার শেষ। কুমুদস্যারের তুঘলকি আইনে দাদাটির ক্যালান খাওয়া বেশ উপভোগ করেছিলাম বটে কিন্তু সাবধান হইনি। ফলত কয়েক দিনের মাথায় ফের ঢিল ছোড়া জারি হল। এবার তারা আর কুমুদ স্যারের কাছে নিয়ে গেল না। তারা বলল, চল তোকে পালসারে চাপাবো! নিয়ে গেল সহ প্রধান শিক্ষক নারায়ণ পালের কাছে। তাদের কাছে স্যার হয়ত আগেই শুনেছিলেন, তাই আমার সামনে আর তিনি নতুন করে কিছু শুনলেন না। কেবল তাদের একজনকে একটা নতুন ব্লেড কিনে নিয়ে আসার দায়িত্ব দিলেন। আমার ভেতর শুকিয়ে কাঠ। ব্লেড দিয়ে কী করবেন স্যার?! স্যার আমাকে একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বসতে বললেন। দশ...পনের...কুড়ি মিনিট যায় সেই দাদাটিও ব্লেড কিনে ফিরছে না! আর স্যারও আমাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলছেন না! আমার কান্না পেয়ে গেছিল। এবার স্যার এগিয়ে এলেন, পিঠে হাত বুলিয়ে মনে করিয়ে দিলেন বিদ্যাসাগরের বোধদয়ের ঢিল ছোড়ার সেই গল্পটা। আরও বললেন, আমার ঢিল ছোড়ায় যদি ওই দাদাটির চোখ নষ্ট হয়ে যেত তাহলে আমাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যেত, ডাক্তার আমার চোখ দুটো তুলে সেই দাদাটিকে পড়িয়ে দিত। তখন কোনও আয়নাতেও আমি আমাকে দেখতে পেতাম না! সেদিন সেই পুরনো গল্পকে ভাঙিয়ে কী অমাইক মন্ত্রের মতো ভাষাপাঠ দিয়েছিলেন। 

সেই প্রথম পালস্যারকে বিস্তারে পেলেও ফাইভে তার ক্লাস পাইনি। সিক্সে ক্লাস পেলেও কোনো নিয়মিত রুটিনে পাইনি। সেভেনে পেয়েছিলাম বাংলার ক্লাসে। তার আগে সিক্সের এক টিফিন পার করা দুপুরে স্কুলের বাইরের রাস্তায় ‘বিচিত্রা’ দোকানের সামনের খেলা শেষ না হওয়া জনা কয়েক আমরা। হঠাৎ বুঝতে না দিয়ে বেত হাতে পেছনে উদয় হলেন পালস্যার। ধরেও ফেললেন আমার ডানা। বাকি সব বন্ধুগুলো স্কুল মুখো ধাঁ...। স্যার বেত উচু করতেই বিষন্ন আমি বলেছিলাম, ‘স্যার, আমার খুব খিদে পেয়েছে’। স্যার হাত ধরে বটতলার মিষ্টির দোকানটায় নিয়ে গেছিলেন। আমি বাড়ি থেকে টিফিন এনেছি কিনা জানতেও চাইলেন না। আমার টিফিন তৃপ্তি তার মুখে ফুটে উঠতে দেখেছিলাম। আমাকে নিয়ে তার স্কুলে ফেরায় কেমন একটা জড়িয়ে থাকা ছিল, বেতটাকে আর বদমেজাজি মনে হচ্ছিল না।

বেত স্যারের সঙ্গে এলেও ক্লাসে কোনো বেতবাজি ছিল না। রসিক মানুষ স্যার দারুন গলা বাজাতেন যা পুরো ক্লাসটাকেই চুপ রাখতো। তখন স্যার আমাদের পুরো অঞ্চলটার ভাষার উপর দিয়ে চোষে বেড়াচ্ছেন ভাষা খুঁজতে। নাংলার বিলের ইতিহাস লিখতে গিয়ে আমাদের গ্রামেরও ইতিহাস লিখে ফেলেছিলেন। আমার বাবা-দাদারাও জানতেন না, নাঙলার বিল অতীতের ব্যবসা বানিজ্যের সেই জলপথ, যা পদ্মানদী নামে উত্তর বঙ্গের সাথে যোগাযোগ রাখতো। রুদ্রপুরের উপর দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত সারবেঁধে প্রসারিত জোড়া পুকুরগুলো আসলে সেই পদ্মার শাখানদী, নাম ছিল সুতানটী। আমার ইতিহাস বই জানতো না, আকবর সেনাপতি মানসিংহ যোশর রাজ প্রতাপাদিত্যের কাছে জলপথে দুবার পরাস্ত হয়ে যে স্থলপথে যোশরে পৌঁছান, সে পথ রুদ্রপুরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গৌরবঙ্গ রোড। বইটা প্রকাশ পাবার পরে বিচিত্রায় পাওয়াও যেত দেখতাম। কিন্তু আমার ওই বয়সটা কমিক্স সংগ্রহে আরও বেশি উৎসাহী ছিল। অমনি মনেপড়ে গেলো, আমি আর মানস প্রতি কমিক্স দুটাকায় তিনদিনের মেয়াদে স্কুলে ভাড়া খাটাতাম । নতুন কমিক্স কেনার জন্য বাবার কাছে ঘ্যান ঘ্যান উধাওগুলো কী দারুন হাততালির মতো উপভোগ করতাম! সেই স্কুলবেলার অনেক বাদে ‘পুরতত্ত্বে নাংলা বিলের এপার ওপার’ বইটি পড়তে গিয়ে স্যার আমার প্রপিতামহ হয়ে উঠেছিলেন। অবশ্য তার প্রতি শ্রদ্ধা স্কুলবেলাতেই আমাকে পেয়েবসেছিল।

শ্রদ্ধার একটা ভয় আছে, বিবেচনা বোধ আছে। তাই আমার দুষ্টুমিরা স্যারকে এড়িয়ে চলত । ক্লাস এইটের স্কুলস্পোর্টের দিন হাতে একটা কালো রবারের বালা পড়ে এসেছিলাম স্কুলবন্ধুদের দেখাবো বলে । সেদিনের এদিক-সেদিক ছুটোছুটির ভেতর পালস্যারের মুখোমুখি হতেই দ্রুত হাতটাকে পেছনে লুকিয়ে নিলেও তার চোখ এড়াতে পারিনি। কড়া সুরে তিনি দেখতে চাইলে হাতটা সামনে এনে ‘খুলে ফেলব স্যার’ বলেই খুলতে যাচ্ছিলাম। তিনি বাঁধা দিয়ে নরম সুরে বললেন,’আমি কি বারন করেছি? আর আমার কথায় এখন খুল্লেও তুমি ফের পড়বে। তারচেয়ে তুমি ওটা পড়েই থাকো । তোমার যেদিন মনে হবে, ওটা তোমার যোগ্য না, একমাত্র সেদিনই খুলবে’। সেদিন কী বুঝেছিলাম ঠিকঠাক মনে নেই, তবে স্যারের চলে যাওয়ার পরেও বালাটা পড়ে থাকাতে খুউব অস্বস্তি হচ্ছিল।

আমার ক্লাস নাইনেই পালবাবু স্কুল ছাড়েন। সেই ছেড়ে যাওয়ার মনখারাপ মনে নেই। তবে এখনো তার সাথে দেখা হলেই স্কুলবেলার সেই ‘এড়িয়ে চলা’রা মনেপড়ে সান্তনা খোঁজে। বুঝতে পারি, তখন সময় হন্যে হয়ে আমার পেছন ঘুরতো। এখন আমি সময়ের পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে হাতড়ে বেড়াই সাদাজামা-নীলপ্যান্টের সেইসব দৈনন্দিন ভাষাপাঠ, যারা আমার মগের মুলুক তুলে এনে বাথরুমে সীমাবদ্ধ রাখতে শিখিয়েছিল। আমার দিনের অপ্রাপ্তমনষ্ক মগের মুলুক এখনও বাথরুমে কাটায়।


Monday, August 22, 2022

জানালা, নিভৃত উপার্জন... ❑ ঋপণ আর্য

ছেলেবেলায় ভাবতাম, সবচেয়ে বড় জানালা বুঝি জেলখানায় থাকে। সিনেমায় দেখেছিলাম, মানুষের পরিবারে বেড়ে ওঠা গোরিলাটা কয়েদ হবার পর সেলের দেওয়ালে বেড়েওঠার প্রিয় সঙ্গী সেই জানালাটা এঁকেছিল, যে জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তার সারাবেলার সজাগ দেখে আনন্দে কাটাতো। সেদিন তার জানালার জন্যে আমার ভেতরটাও হু হু করেছিল।

আদতে জানালার ভেতরের মানুষটি কখনোসখনো জানালা দিয়ে তাকিয়ে থেকে ঘটমান কোনও দৃশ্য দ্যাখে না, এমনকী বাইরের জগৎটাও দ্যাখে না! কী দেখে সে?...স্রেফ নিজেকে দ্যাখে। তখন তার হৃদয়ের ছবিটি ফুটে ওঠে জানালার ঠিক বাইরে।

জানালা, বাইরেটা প্রকাশ্যে রেখে ভেতরকে খানিক অপ্রকাশ্যে রাখে বরাবর। একদিন টালিগঞ্জের বাসায়, তিন তলার ছাদের ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল পাশের দোতলার ছাদে শীতের রোদে চুল শুকোচ্ছে ছাদওয়ালী। আমি তার গান দেখতে পাচ্ছিলাম। ছাদওয়ালী নামটা জ্যাঠতুতো ভাই অনুপের দেওয়া। বিগত কয়েক মাস ধরে অনুপ ছাদওয়ালীর ‘ছুটফুটন্ত’ দেখে আসছিল। ছাদওয়ালী জানে না তার ব্যক্তিগত খেয়াল এভাবে বেঘোরে চুরি যাচ্ছে। জানালা নির্বিকার, যার শুধু নির্দিষ্ট আকার নিয়ে কেবল থেমে থাকা আছে। কিন্তু জানালা নির্ভর মানুষদের মনোবিকারে পাল্টিখাওয়ার কোনও থেমে থাকা নেই। তাই হয়ত যাকেই জানালা ভাবতে শুরু করা হয় প্রায়ই দেখা যায়,  সে হয় দরজা না হলে ঘুলঘুলি হয়ে যাচ্ছে!!

জানালা মানে কেবল কোনও বিশেষ পরিস্থিতির দরজা নয়, প্রকৃতির যাতায়াত নয়, অমল ও দইওয়ালার মতো আরও কত কিছু। বাংলায় একটা জ্যান্ত প্রবাদ আছে, দেওয়ালেরও কান আছে। জানালার বাইরে থেকে উঁকির ইচ্ছেটা যখন প্রবল হয়, ঠিক তখনই দেওয়ালের কান জানালা হয়ে ফোটে । তখন ক্লাস ফাইভ, রুদ্রপুর বাজারের পাশে সবিতানেম্বরের বাগানওয়ালা মাঠে ছুটির দুপুরে ক্রিকেট খেলতাম। কোনও একদিন লেগে ফিল্ডিং দিচ্ছিলাম। উজ্জলের বলে ঘন্টু হাকিয়ে ছয় মেরেছে। বাগান পেরিয়ে হারিয়ে গেছে বল। অনেকের মতো আমিও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আর পাচ্ছিলাম না বলেই খুঁজতে খুঁজতে দুলাল দের ঘর পর্যন্ত পৌঁছতেই ঘরের ভেতরের একটা হাল্কা গোঙানি জানালা দিয়ে ভেসে আসছিল। আমি জানালায় উঁকি দিতেই সদ্যবিবাহিত দুলাল দে বিষম খাওয়ার ঢঙে বলল, ‘তুই রবীনদার ছেলে না? দাঁড়া তোর বাবাকে বলে দিচ্ছি’... মনে আছে, অজ্ঞাত একটা অপরাধের ভয়ে, বাজার ফেরত বাবার হাতে মার খাওয়ার ভয়ে কেটেছিল কয়েকটাদিন। আর দুলালকাকারাও জানালাটাকে নিজেদের ইচ্ছেয় নিয়ে গেছিল, পর্দা লাগিয়ে।

জানালার নিজস্ব কোনও ইচ্ছে নেই। জানালা সান্নিধ্যদের ইচ্ছে আছে নানান। হাবড়া হাইস্কুলের ক্লাস এইটের A সেকশান ছিল দোতালায়, নীচের রাস্তার গা বরাবর। রাস্তার ওপাশে গার্লসস্কুলের পাঁচিল আর পাঁচিল অতিক্রম করা গার্লসস্কুলের দোতালার জানালারা। টিফিন পিরিওডে ক্লাসমেট রাজীবের দুর্ধর্ষ ইচ্ছাপূরণ তার পাশে দাঁড়িয়ে ক্লাসের অধিকাংশের উপভোগের। আক্কেল ভোগে গেলে যা হয়। রাজীব জানালা দিয়ে গার্লস স্কুলের জানালা তাক করে হিসি করতো। সে হিসি নীচের মাঝ রাস্তাও অতিক্রম করতো না। তবুও তার সেই ক্যালমা বহুদিনের। আর এই বহুদিনের একদিনে সে পাশ ফিরে দেখেছিল আমরা কেউ নেই, ক্লাসরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন সহপ্রধান শিক্ষক সুবলবাবু। বীভৎস জান্তব লাগছিল স্যারকে। পেটাতে পেটাতে নিয়ে গেছিলেন। তারপর থেকে স্কুলজীবনে রাজীবের সাথে দেখা হয়নি। দেখা হয়েছিল বহুদিন পরে। শুনে অবাক হয়েছিলাম, তার নাকি গ্রিলের দোকান! তাহলে তো হরেক মাপের জানালা তৈরি হয় তার কারখানায়!! তার দ্বারা জানালার সৎ না অসৎ ব্যবহারে নিয়তি তাকে এই জীবিকা দিল?! আমার ঘরের ছ’ফুট বাই ছ’ফুটের একমাত্র জানালায় বসে আছে রাজীবের কারখানার গ্রিল। এটা ধরে নেওয়া ঠিক না / জানালার গ্রিলে রদ্দুর বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। জানালা জানে রদ্দুর, মেঘ, বৃষ্টির ছাট একনাগারে টিকে থাকার নয়। কিন্তু যে জানালা কখনও রদ্দুর দেখেনি তার  কাছে মেঘের খবর আসবে কীভাবে? ফলত সে  জানালার ভেতরের দিকটা স্যাঁতসেঁতে থাকে আজীবন। দরজা ভেঙে ফেলার আগেই রিপারা হোস্টেলের ওই রকম একটা স্যাঁতসেঁতে জানালা দিয়ে প্রথম দেখেছিল, মৌ-এর শরীর সিলিং ফ্যানে ঝুলছে!!

আমার ঘরের জানালায় সে স্যাঁতসেঁতে নেই, সব মরশুমই আসে। বছরের দুটো ঈদে অশ্বত্থ তলায় হাজার মানুষ নামাজ পড়তে বসে। আমি জানালা দিয়ে সমবেত প্রার্থনা দেখি। ঈদের সুবাদে জানার বাইরের রাস্তায় মাত্র দু’ঘন্টার মেলা বসে। জানালা দিয়ে তার গন্ধ আসে, আমিন-সাবির-কবির-মিজানুরদের ঈদের নিমন্ত্রন আসে। পিচ  পড়বে বলে পুরনো রাস্তাকে আকার ও অবস্থান বদলাতে দেখি, দুপুরের রোদে না হাঁপানো তুহিনের নতুন শেখা সাইকেলিং, সমীরনের নিখুত মার্বেলগুলির টিপ, ইদানিং রাস্তার গা ঘেঁষে  উদ্দেশ্য না জানা একটা পাতাল ঘরকে তৈরি হতে দেখি। ভোকাট্টা ঘুড়িকে অশ্বত্থ গাছের মটকায় ঝুলতে দেখি, হাওয়া এলে  অশ্বত্থকে সে ঘুড়ি ওড়াতেও দেখি।  সবই জানালার সুবাদে। জানালা আমার নিভৃত উপার্জন। জানালার সুবাদে আমাকে টিমু, চন্দন, শুভ দেখে ফেললেই বলে ওঠে, ‘এ কাকা আসবো?’ ওদের ঘরে ডাকি। ওরা গেম খেলার চাইতে গেম খেলা দেখতে বেশি উৎসাহী। ওদের উৎসাহে আমার ঘর ভরে ওঠে। জানালার ঝাপ নামানো থাকলে অবশ্য অশ্বত্থের তলা ওদের ডেকে নেয়। জানালার ঝাপ নামানো থাকলে সকাল ১১টা’কেও আমার ঘরে গভীর রাতের মতো লাগে। আর ঝাপ খুল্লেই মনে হয়, জানালা দিয়ে পৃথিবী ঘরের ভেতর ঢুকছে আর আমার ঘর ক্রমশ বড়ো হয়ে যাচ্ছে।


 

Tuesday, August 16, 2022

ইমোজি সম্পর্কে দু-চার কথা; যা আমি ভাবি ❑ ঋপণ আর্য

খুবই ছেলেবেলা, যখন ডিডি7-এ রোববার চারটে নাগাদ সিনেমা হত। একদিন প্রসেনজিতের কোনও সিনামা দেখছি, বাবাও পাশে ছিলেন। দেখি, প্রসেনজিৎ ট্রেন থেকে একটা ডিগবাজি খাওয়া জাম্প মারলেন, আর মেরেছেন তো মেরেছেন; একটুও না টলে কী সুন্দর বন্ধুর জমিনে দাঁড়িয়ে গেলেন! খুব অবাক হয়ে বাবাকে বললাম, এত সুন্দর কী ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল? বাবা বললেন, নায়করা এসব পারে। শুনে নায়ক হওয়ার বাসনা জেগেছিল কি না মনে নেই। অত অত অবাক হয়ত হতাম না যদি জানতাম গতিজাড্যের কথা, যদি জানতাম 'সিনেমায় জীবন থাকতে পারে, কিন্তু জীবন তো সিনেমা না।' বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের অবাক বা বিস্মিত হওয়ার পরিধি, ব্যথা পাবার পরিধি, পাপ বোধের পরিধি হয়ত সংকুচিত হতে শুরু করে, একপেশে হতে শুরু করে। নইলে ওইসব সময়ের পাশাপাশিতে যে সব বিষয়ে অবাক হতাম তা তো আর হই না, নিদেনপক্ষে একটা পিঁপড়ে মেরে যে ব্যথাবোধ ও পাপবোধ জাগত তা তো আর জাগে না! তবু টের পাই, আর পাঁচজন সমবয়সী গড় মানুষের চেয়ে আমি একটু আলাদা, ধরনধারণে যেন আরও কম বয়সী, বিস্ময় বেশি আর আবেগ তো নিশ্চিত মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বা তারও কম বয়সী কোনও ছেলের। এইজন্যই হয়ত যে কোনও শিশুর আমাকে তার সহজেই সমবয়সী ভেবে নিয়ে আপজন হয়ে উঠতে সময় নেয় না। আর এসবের সাথে আমি টিউওবলাইটও (এখনকার এলিডি টিউব নয়)। ওই যে সুইচ টিপলেই সঙ্গে সঙ্গে জ্বলত না, তেমনই। তাই আমার হাসি তিন প্রকারের। প্রথমে না-বুঝে সকলের সঙ্গে হেসে উঠি, তারপর বিষয়টা বুঝে হাসি, আর শেষে প্রথমে যে না বুঝে হেসেছিলাম; সেটার কথা ভেবেই আরেকবার হাসি। এমনই ট্যালা। কতকত বার যে উপহাসের পাত্র হয়েছি, বইমেলার মাঠে কারো নিদারুণ ধমকে প্রকাশ্যে হুহু করে কেঁদে ফেলেছি, এইফেসবুকেই এমন অনেক বন্ধু আছে সে ঘটনা সহজেই মনে করতে পারবে। স্প্যানিশ কবি বিওলেতা মেদিনা সেদিন আমাকে দেখে তার একটি বইতে স্প্যানিশ ভাষায় লিখে দিয়েছিলেন,—
" ছেলেটি কাঁদছিল, 
কেননা সে হাসতে জানে"

নানান ক্ষেত্রে আমার কম বোঝা থেকে গেছে বলেই হয়ত এখনও ঠিকঠাক সামলে উঠতে পারি না নিজেকে। নইলে '২৪ ঘন্টা' চ্যানেলে সার বেঁধে যশোর রোডের হাত-পা কাটা গাছগুলো দেখে কেন এত লাউড কেঁদে ফেলবো? চোখ বুজে কেন ভেবে ফেলবো, দু-আড়াইশো বছর বয়সের সাড়ে চার হাজার গাছ পরপর দাঁড়িয়ে বলছে; 'এই দেখো আমরা কী সুবিশাল অরণ্য!' সে কী যে আকুলতা, সে কী যে কান্নার ঢেউ! মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে, এই গন মাধ্যমে ডাক দিয়ে; শতশত মানুষের সারা পেয়ে; প্রাথমিক অবস্থায় পৌঁছে যখন দেখি; আমরা মাত্র দশ জন! গাছগুলোকে বাঁচাতে কেন ফের গনমাধ্যমে এসে ভিক্ষে চাইছিলাম, কেন প্রদর্শন করেছিলাম; 'দেখো আমারা এই জনা দশেক ওই গাছগুলোর মতো কত অসহায়, কেন তোমরা সারা দিয়ে কথা রাখোনি?' ওইসব কথা হয়ত অনেকের আতে লেগেছিল। পরের সপ্তাহে জমায়েতে প্রায় পাঁচশো জন। আসতে লাগলো অজস্র মিডিয়ার কভারেজ, অনেক সেলিব্রিটি।  আমি লিডিংয়ের কী বুঝি? পার্টিফার্টি করা কোনও সমাজ সংস্কারকও তো নই।  যে কমিটি তৈরি হল, হলাম না তার কনভেনার, যাদের অ্যাক্টিভিটি ভাল লেগেছিল প্রাথমিক, তাদেরই সাজেস্ট করলাম ওইসব পদে। ভেবেছিলাম, আমার কাজ লেখালেখি, আমার কাজ ডাকাডাকির। তবু আর পাঁচজন সাধারণ আন্দোলনকারীর মতোই সঙ্গে ছিলাম শারিরীক, চাইতাম না গাছ বাঁচাও আন্দোলন কোনও পার্টির ব্যানার পাক, গাছের চেয়ে কোনও মানুষ বা কমিটি বড় হোক, আমি নয় আমরার প্রতিষ্ঠা হোক, গাছের আমারা, কাছের আমরা। কিন্তু একসময় যখন দেখলাম 'গাছ বাঁচাও'-এর ব্যানার চলে যাচ্ছে ভাঙ্গুর আন্দোলনে, যখন দেখলাম সেই আন্দোলনের প্রথম দিকের একদিনে একটি ছেলে একাই গাছ কাটার নীরব প্রতিবাদ করতে করতে বনগাঁ থেকে হেঁটে হেঁটে পৌঁছায় হাবড়ায়; আমার বাড়ি। সেই রাহুল; কমিটির ছেলেদের কাছে কতকত দিন যাচ্ছেতাই রকমের অপমান হয়েও থেকে যেতে চেয়েছিল, শেষমেশ থাকতে পারেনি। ওদের পাশ থেকে সেদিন আমিও মানসিক ভাবে সরে এসেছিলাম, তবু তারপরেও তো গাছগুলোর কথা ভেবে ফের বড় বড় লিফলেট লিখে দিয়েছি কতদিন, লিখেছি কত কত ট্যাগ লাইন,  "যশোর রোডের গাছ বাঁচাও/ ডাক এসেছে পা মেলাও"। যাই করুক তারা, তাদের প্রতি ভালবাসা আছে এখনও জীবন্ত, ঘটনার দুঃখ থাকলেও তাদের প্রতি ক্ষোভ নেই কোনও, তারা ছুটোছুটিতে থেকে গেছিল বলেই না; সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গাছগুলো এখনও বেঁচে আছে।

এমনই ট্যালা, এক কথার প্রসঙ্গে অন্য কথায় ঢুকে যাই। যা হোক যে কথা বলছিলাম, আমি সেই টিউব লাইট, যে কোনও কোনও সময়ে এই ফেসবুকে কারও কারও কমেন্টের রিপ্লাইয়ে কথা খুঁজে পাই না। যারা একটু কাছের তারা জানে; তাদের কমেন্টে কেমন বিভোর থেকে রিপ্লাইয়ে বহু পরে যাই। কিন্তু ফেসবুকে এমন মানুষজন তো আমার সবাই নয়, তাই নাগাল হারাতে পারে ভেবে কোনও পোস্টে শুধু ইমোজি কমেন্ট করি। আজও তেমনই এক বর্ষীয়ান সাহিত্যিকের একটি ছবিতে কমেন্ট করেছিলাম; পরপর চারটে বিষ্ময় বাচক চিহ্ন বা তিনটে প্রশ্ন বাচক চিহ্ন সাইজের নাদান; আপ্লুত ভালবাসা বাচক ইমোজি। তার উত্তরে তিনি যা লিখলেন এবং তার প্রতুত্তরে আমি যা লিখলাম হুবহু তুলে দিলাম।

তিনিঃ "বলার কথা মুখের ভাষায় বলাই কি ভালো না? ছাঁচে ঢালা একঘেয়ে ছবি বা স্টিকার বা ইমোজি দিয়ে মন্তব্য বাঞ্ছনীয় নয়। সময়ের অভাব হলে মন্তব্য না করাই তো ভালো।"

আমিঃ "সেটা হয়ত সার্বিক হিসাবে ঠিকই বলেছেন। কিন্তু 'ভালো লাগলো'-এর চেয়ে কখনও কখনও এই ছোটো খাটো ইমোজি অনেক বেশি বাঙ্ময় হয়ে ওঠে আমার কাছে। বিস্ময়বোধক চিহ্ন যেমন আছে; তদরূপ 'ভালো লাগার' আপ্লুত বাচক চিহ্ন তো নেই কোনও, তাই করেই যখন ফেলেছি মন্তব্যটি;  এই বেলায় তারই চিহ্ন হিসাবে গ্রহণ করুন। পরের বেলায় আপনার ক্ষেত্রে মন্তব্যের আগে বিষয়টি নিশ্চিত পূর্ণ বাক্যে মাথায় রাখবো। ভাল থাকবেন। শারিরীক সুস্থতা কামনা করি।"

হয়ত আমি রিপ্লাই করতাম না। "দাদা, ভুল হয়ে গেছে" বলে এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু যখন মনে হল, তার দৃষ্টিভঙ্গির সাপেক্ষে তাকে খুব বিরক্ত করেছি, আমার ভাল লাগা বোধ তাকে খারাপ লাগা দিয়েছে, তখন আমার দৃষ্টিভঙ্গিটা খোলসা করে জানাতেই তো পারি। তাই লিখেছিলাম।

আজ সকালেই দেখি, বোন প্রফাইল পিকচার বদলেছে। ছবিটিতে  পরী-Prabirদার মাঝে বুদ্ধি বসে আছে। 

কমেন্ট করলাম, "🌿❤️🌿"

এক বন্ধু দেখি এসে লাভ রিয়াক্ট করে গেছে। সে নিশ্চিত বুঝেছিল, দুই সবুজ প্রিয়জনের মাঝে আমার তুমুল ভালবাসা বসে আছে। বা, এরকম গোছেরই অন্যকোনও উপমা ভেবে ভালবাসা জানিয়েছিল কমেন্টটিকে। আমি ভাষায় লিখলে ওই ইমোজিগুলোর মতো অত ভাল কি লিখতে পারতাম? 

আজ দুপুরেই হোয়াটসঅ্যাপে কথা হচ্ছিল কুন্তলদার  সাথে। তার একটা কথার তুমুল সমর্থনে আমি ধুকপুকানি হার্টবিট পাঠিয়েছিলাম, ওই যাকে মনে হয় চলমান বা প্রবাহমান একটা ভালবাসাকে পাঠানো, যার থেমে থাকা নেই। যদি কুন্তলদা মুখোমুখি থাকতো, তখন তার ওই  কথার প্রতুত্তরের আমার উজ্জ্বল সমর্থনের মুখটি দেখতে পেত, সেটা কী ইমোজি নয়? সে কি বুঝে যেত না; আমি যদি কোনও কিছু নাও বলতাম?

এই যে কতকত ইমোজি আছে, ওদের আমার টাইপে কথাবলার প্রসঙ্গে কবিতাই তো লাগে। এক একটা ইমোজিকে প্রসঙ্গ বিশেষে এক একটা আস্ত কবিতা। কবিতার প্রসঙ্গ এল যেই মনে হল, উদাহরণই ভাল ব্যাখ্যা হতে পারে।  একদিন শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে হাবড়ায় ফিরছি, সঙ্গে বন্ধু অভিজিৎ। দু'জনেই জানালার কাছে, দুই বেঞ্চে এবং মুখোমুখি। বিধাননগর ছাড়তেই ভিড় বাড়ল।  আমার আর তার কথার মাঝে একজন ভদ্রলোক বারবার এসে দাঁড়াচ্ছিলেন। কথা বলার সময় তার সাইড দিয়ে মুখ বের করে কথা বলতে হচ্ছিল। আচ্ছা, কথা বলার সময় মুখ দেখাটা কি খুব জরুরি? ওই ট্রেনের আলোয় মুখখানি আসলেই যে জীবন্ত ইমোজি বুঝিনি তখন, এখন প্রসঙ্গ বিশেষে মনে হল। কিন্তু এটাও সত্যি যে; সেদিন সেই মুহূর্তে  শমীকদা একটি কবিতাকে প্রমাণ হতে দেখেছিলাম,— 

     লাইটা 
     জ্বেলে দাও 
     কথাগুলো দেখতে পাচ্ছি না।

🌿

Friday, May 27, 2022

মিথ্যেকথা ফেয়ার করতে বসে ❑ ঋপণ আর্য

ছেলেবেলায় একবার ‘ঘোড়ার ডিম’ দেখার শখ বাবাকে জানিয়েছিলাম। বাবা বাজার থেকে সেদিনই একটা কুমড়ো কিনেছিল। বলেছিল, ঘোড়ার ডিমটা নাকি সেই কুমড়োর মধ্যেই আছে। হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলাম, কই আগে তো কোনো কুমড়োতে দেখিনি। বাবা বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে বলেছিলেন, সব কুমুড়োতে থাকে না রে। সেদিনভর কত কতবার যে কুমড়োটা কাটতে তাগাদা দিয়েছিলাম। যতক্ষণ পর্যন্ত কুমড়োটা কাটেনি, ততক্ষণ পর্যন্ত ঘোড়ার ডিমের সাইজ, রং ও তার অবাক আমার ভেতর আনন্দময় ভাবনায় ছিল। সত্যিটা দেখার পরে ভাবনারা স্থির হলো... বেকুফ হলো... বোবা হলো।

আসলে সত্যির কোনো বানানো ব্যাপার নেই, যেমন খুশি সাজো নেই, রোদ বা রঙের চড়ে বসা নেই, কাসুন্দি নেই, কুয়াশা মাখানো নেই, পরিণামহীনতা নেই। কিন্তু মিথ্যের এসব আছে। মিথ্যে তাই সত্যির মতো একঘেয়ে নয়।

জীবনে যা হতে চেয়েও, বোঝাতে চেয়েও পারিনি, সেই সব হোঁচট খাওয়াদের মিথ্যে এসে একলহমায় জিতিয়ে দিল। এখান থেকে এখনো দিব্বি দেখা যাচ্ছে, সুখেনের বৌকে কেউ বোঝাতে পারছে না এক পাড়াভর্তি সংশয়, তার শাখা-সিঁদুর সুখেনের পাঁচ বছরের অনুপস্থিতিকে মিথ্যেই প্রতিরাতে সান্ত্বনা দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

মিথ্যের অভ্যাস একটা গোটা মানুষকে খেয়ে ফেলে, গোটা রাষ্ট্রকে খেয়ে ফেলে। যেভাবে জেহাদের নামে দক্ষিণী দুনিয়াকে তিলেতিলে খেয়ে ফেলেছে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী সম্প্রদায়। যে মানুষটা রাষ্ট্রীয়/ধর্মীয়/আর্থিক ক্ষমতায় সমৃদ্ধ, তিনি মিথ্যেয় জড়ালে তার মিথ্যেরা নাদুস-নুদুস সেই কালোমিথ্যে, যার কখনো সখনো অমরত্বও জুটে যায়। যেভাবে যুধিষ্ঠিরের মুখে ‘অশ্বত্থামা হত’ অমরত্ব পেয়েছে, মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাও পিছিয়ে নেই।

তেমনি আবার যে ম্যাজিশিয়ান নিছক আনন্দদানেই মিথ্যে খরচ করে চলেছেন নিয়ত, তার মিথ্যেকে আমি সাদামিথ্যে বলব। কেননা এই মিথ্যে কারো ক্ষতিসাধন তো করে না। আমি তাই সেই ম্যাজিশিয়ান সেজে চারপাশের হাসিগুলোকে আরও চওড়া দেখতে চাই, দুঃখগুলোয় মিথ্যে মাখিয়ে দুঃখের ওজন কমাতে চাই। শান্তির বাবা মরে যাওয়ার পরও বিদেশের শান্তি মণ্ডলকে ফোন করে জানাই, তার বাবা অসুস্থ খুব, সে যেনও যত দ্রুত সম্ভব চলে আসে। আমি কোনোমতেই চাই না, সত্যিকথা শান্তির ঘরে ফেরার জার্নির ব্রেকফেল করুক। চাই না, শান্তি জীবন্ত লাশ হয়ে ঘরে ফিরুক।

সত্যি স্থির হলে যদি মানুষ লাশ হয়, মিথ্যে স্থির হলে সেই মিথ্যেটা ধীরে ধীরে সত্যি হয়ে ওঠে। কলেজে এ ওর ডাকনাম জানতে চাইলে নিজেই নিজের একটা ডাকনাম দিয়েছিলাম। কত্তদিন কলেজ ছেড়েছি। অথচ কলেজের সেই সময়কার বন্ধুদের বা স্যারদের সাথে দেখা হলেই সেই নাম ফিরে আসে। এমনকি ওই ডাকনামের অন্য কেউকে শোনার পরিধির মধ্য থেকে কেউ একজন ডাকলেই আমারও সারা দেওয়ার প্রবণতায় মুখ ফিরে যায়।

ডাকতে ডাকতেই একলব্য একদিন মিথ্যের মধ্যে সত্যিকে সাধনায় পেয়েছিল। সেই মিথ্যের দোহাইয়ে নিজের বুড়ো আঙুল খসিয়ে হাসতে হাসতে দ্রোণাচার্যের চাহিদাও মিটিয়েছিল। দ্রোণাচার্যের ছল একলব্যকে মহৎ করেছে। কিন্তু অর্জুনকে কি খাটো করেনি একটুও? সেই ছলচাতুরীই কি যুধিষ্ঠির মাধ্যমে কুরুক্ষেত্রের ময়দানে দ্রোণাচার্যের সম্মুখে ফিরে এসেছিল? এই যে সমর্থন খুঁজতে, মিল খুঁজতে বসে গেলাম। মনের সমর্থনে মিলেও গেলাম বন্ধু যত। আবার মিল ভাঙিয়ে ছেড়েও গেলাম অনেকে। অথচ তাদের তো শেকড়ওয়ালা বন্ধু ভাবতাম, যাদের সাথে কতদিনকার কত কত সত্যি-যাপন। সেসব সম্পর্ক একলহমায় মিথ্যে হয়ে গেল! তাহলে কি অনেকগুলো সত্যি দিয়ে একটা মিথ্যে রচিত হলো? অথবা, মিথ্যের এতটাই জোড় যে জোরালো সত্যিদের খাটো করে দিল নিমেষে!

সক্রেটিসের সমাজে, গ্যালিলিওর সমাজে উভয়ে মিথ্যে ছিল। মানবধর্মের চোখে জাতপাত, বর্ণভেদ, শুচিবাই মিথ্যে। অপির চোখে আমি মিথ্যে। আমার চোখে অনুপম মিথ্যে। অনুপমের চোখে মলিনা মিথ্যে। মলিনার চোখে অতনু মিথ্যে। অতনুর চোখে ভূত মিথ্যে। কিন্তু এক পূর্ণিমার মধ্যরাতে দূর গ্রাম থেকে ফেরার পথে মাঠের আলের পাশের গাছে একটা গোটা শরীরকে ঝুলতে দেখে অতনুরও ভূত খেয়ালে এসেছিল। ঝুলন্ত শরীরটা যখন কেঁপে কেঁপে উঠছিল দূর থেকে ভূত ভাবনারা সত্যি হয়েছিল। অতনুর একার তখন সাহস ছিল না। আমরা সঙ্গে থাকায় সত্যি-মিথ্যে যাচাই জোট বেঁধেছিল। তাই গাছটির কাছাকাছি যেতেই বোঝা গেল, নাদুসনুদুস একটা কলাগাছ। যার একটা শুকনো পাতা ডগা মচকে ঝুলে আছে। জ্যোৎস্না যাকে সাদা কাপড়ে জড়িয়েছে। আর হাওয়া এসে দোলাচ্ছে জ্যোৎস্নার সেই ছলনা।

সুন্দরী ছলনা জানে। সুন্দর সে ছলনা ধুমধাম পালন করে। আলোবাজিসহ কেক কাটে। আমিও তার দেখাদেখি দোকান থেকে কয়েক ছটাক মিথ্যে কিনে আনি। সতেজ গুচ্ছ ফুলের ভেতর প্লাস্টিকের ফুল গুঁজে এনে সে তোড়া প্রিয়জনের হাতে তুলে দিয়ে বলি, এই সমস্ত ফুলের শেষ ফুলটা যতদিন না শুকোবে ঠিক তত দিন পর্যন্ত সঙ্গে থাকব। প্লাস্টিক, যা ফুলের স্বভাবধর্মের মিথ্যে। আর এই মিথ্যের কোনো শুকিয়ে যাওয়া নেই। আর শুকিয়ে যাওয়া নেই বলেই পপ গায়িকা বিটনিস্পিয়ারের চিবোনো চিকলেট নিলামে বিক্রি হয়। অদ্ভুত! মিথ্যে সান্ত্বনায় মিছিমিছি কত খরচ! মিথ্যে সান্ত্বনায় আমিও মূল্যবান খরচ ভেবে নেটডেটা রিচার্জ করে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে মুখ গুঁজছি... প্লাস্টিকের ফুলে মুখ গুঁজছি। বাবা বলেন, ‘এসব আসলে মনে মনে কথা বলার সময় ও সুযোগগুলোকে হরণ করেছে। আগে তোর মাকে কত দীর্ঘ অদর্শনের ফাঁকফোকরে পথে-ঘাটে, চিঠিতে সত্যি-মিথ্যের জাল বুনতাম, আর এখন...’

আমার দাদুকে মনে রাখার মতো বয়সে কখনও মুখোমুখি দেখিনি। কিন্তু বাবাকে লেখা তাঁর সেই চিঠি দেখেছি, যেখানে ছোট্ট আমাকে নিয়ে কয়েক লাইন লেখাছিল। সেই যাপনের বড় পুরস্কার, স্পর্শ অর্জন, যার কলম বদলালেও, রিফিল বদলালেও হাতের লেখার স্পর্শরা একটুও বদলায়নি... বদলায় না। অথচ আমার চারপাশ আমাকে নিয়ে কত্ত বদলেছে! তোমার সঙ্গে মনে মনে কথা বলায় তোমার উত্তরদেরও ইচ্ছেখুশি ভেবে নেওয়া আর যাচ্ছে না। তাই ভিড় বাসেও তোমার থেকে বিদায় নেবার পরেও তোমার কণ্ঠের অনুযোগ, হাসিতে মনটাকে ফোনে তুলে রাখি। তুমি সত্যি-মিথ্যে যাই বোঝাও, আমি সত্যি-মিথ্যে যাই বোঝাই অবিশ্বাসের আর কোনো উপায় দেখতে পাই না। দেখতে পাই সুমিতেশ দা’র সেই কবিতাটিকে,

'আজ এমন একটা মিথ্যের শহরে ঢুকে পড়ছি

যেখানে গাছপালা, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট

মিল্কবুথ, পেট্রলপাম্প, রেস্তোরাঁ... জাগতিক সমস্ত কিছুই মিথ্যে :

তো এমন একটা মিথ্যের শহরে

আমার মতো এক মিথ্যে বিকেলের সাথে

তোমার মতো এক মিথ্যে সন্ধ্যার দেখা হলে

আমরা যে সেইসব মিথ্যে কথাই বলব

        এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।'

আমাদের শৈশবখানা ❑ ঋপণ আর্য

Anyone who does anything to help a child is a hero to me. ”    —Fred Rogers প্রায় দুই দশক ধরে আমার অন্যতম একটি শখ হল চাইল্ডহুড ফ...