Saturday, December 6, 2025

আমাদের শৈশবখানা ❑ ঋপণ আর্য

Anyone who does anything to help a child is a hero to me.” 
  —Fred Rogers

প্রায় দুই দশক ধরে আমার অন্যতম একটি শখ হল চাইল্ডহুড ফটোগ্রাফি। দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের সান্নিধ্য যাপনের এতটাই আপনে পৌঁছেছি, এখন আমার নায়ক তারাই যারা সর্বদা শিশুদের বেড়ে ওঠার সহায়ক হতে চান, তাদের নিয়ে ভাবেন, সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। যেমন এই কশেরুকের শিশু সংখ্যা, যার সুরে এই তো ফের উঠছি গেয়ে—
I want to become a gentle breeze to fan children's tender dreams.


একটি ইন্টারভিউ

শুরুটা করি শীতলগ্রাম প্রাথমিক স্কুলে পাওয়া চাকরির ইন্টারভিউ থেকে। এটি ছিল ২০০৯ সালের পর থেকে এযাবৎ প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যের চতুর্থতম ইন্টারভিউ, যার স্মৃতি হুবহু আজীবন মনে থেকে যাবে, এতই প্রখর...। ইন্টারভিউয়ের দিন যাবতীয় সার্টিফিকেটের সঙ্গে নিয়েছিলাম নিজের দু'টি কবিতার বই, যদি এক্সট্রা কারিকুলার হিসাবে গ্রহণযোগ্য হয়, এই ভেবে। ইন্টারভিউতে ঢোকার আগে কাগজপত্রের পরীক্ষা যে ঘরে হচ্ছিল, তাদের বই দু'টো দেখাতেই বলেছিল, 'ইন্টারভিউ বোর্ডে নিয়ে যাও কাজে দেবে, ফেরার পথে আমাকে দিয়ে যেও।' সেইমতো নির্ধারিত ৯ নম্বর রুমের বাইরের লাইনের এক্কেবারে শেষে দাঁড়ালাম, যে আগে আসে ছেড়ে দিই। আসলে একেবারে শেষ পরীক্ষার্থী হিসাবে ঢুকতে চাইছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল, হয় খানিক বেশি সময় দেবে আমাকে; নয়তো একদমই দেবে না। ওই রুমের শেষ ইন্টারভিউদাতা হিসাবে দুরুদুরু মন নিয়ে প্রবেশ করলাম। দেখি, বসে আছেন বছর পঞ্চাশের একজন স্যার আর বছর চল্লিশের একজন ম্যাডাম। ম্যাডামই আমাকে প্রথম বসতে বললেন। বসেই বললাম, 'ধন্যবাদ, দুজনেই আমার প্রণাম নেবেন।' স্যার প্রথম আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। বললাম। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন আমি কী করি। খুব শর্টকাটে আমার এডুকেশন লাইফ সম্পর্কে জানানোর পরে পড়াশুনায় আগ্রহের কথা জানালাম, টুকটাক লেখালেখি করি সে কথাও জানালাম। অনুমতি নিয়ে বই দুটি টেবিলে রাখতেই স্যার হাতে তুলে নিলেন। মিনিট খানেক বাদে তিনি বললেন,

—আপনার তো হায়ার এডুকেশানে যাওয়া উচিত, হঠাৎ প্রাইমারি স্কুলে চাকরির ইচ্ছা হল কেন?

এই প্রশ্নটাই এক অপার খুলে করে দিল। বললাম,

— প্রথমেই একটা অনুরোধ করবো স্যার, শৈশবখানা (shoishobkhana) লিখে গুগুলে একটু  সার্চ করবেন?

— কেন?

—ওই নামে একটা ফেসবুক, ইনিস্টাগ্রাম প্রোফাইল পাবেন, সেখানে প্রায় হাজারের কাছাকাছি নির্বাচিত ফটোগ্রাফিতে চাইল্ডহুড অ্যাক্টিভিটির উপর দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে এসেছি।

এটা শোনার পর স্যার অ্যাকসেস করলেন, পেয়েও গেলেন। বই দুটি হাতে নেওয়ার পর থেকেই কিঞ্চিত মুখ-চোখের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলাম, এবার সেখানে আরও সমীহ দেখতে পেলাম। কী একটা এনার্জি কাজ করলো ভেতরে আমার! বললাম,

— মনোবিদ রুশোর মতে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সাপেক্ষে শিশু জীবনের প্রথমের ১ থেকে ১০ বছরের মধ্য ৫০ শতাংশ ব্রেন তৈরি হয়ে যায় আর বাকি ৫০ শতাশং ব্রেন তৈরি হয় পূর্বের অর্জিত ৫০ শতাংশ ও বাকি জীবনের অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে। স্যার, আপনার সময়কার প্রাইমারি জীবনের কোনও কবিতা বা ছড়া মুখস্থ আছে এখনও?

স্যার সহাস্যে মাথা ঝাঁকালেন, বললেন, 

—একাধিক। 

ফের জিজ্ঞাসা করলাম,

—কিন্তু আপনার সময়ের ক্লাস এইট-নাইন বা গ্রাজুয়েশন লেভেলের কোনও কবিতা নিশ্চয়ই মনে নেই এখন?

স্যার বললেন, 

—একদমই তাই।

বললাম,

— মহামান্য রুশো একটা ৯ বছরের বাচ্চার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যে সাঁতার, দাবাখেলা, রান্নাবান্না, বড় বড় ক্যালকুলাস, পোলো খেলাসহ আরও গাদাগুচ্ছের অ্যাক্টিভিটিতে সক্রিয় ছিল, তার বাবার দৌলতেই। কিন্তু বাচ্চাদের শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলায় গান লেখা হয়, 'স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারি, আমরা কী আর বইতে পারি'। অর্থাৎ রবিঠাকুরের তোতাকাহিনীর মতো শিক্ষাকে এখানে পুশ করা হয়, যেখানে খেলাচ্ছলে শিক্ষা আগ্রহ তৈরি করা কোনও জরুরি বিষয়ই নয়। যেখানে বাড়ির ভিতই দুর্বল সেখানে আমরা দিনের পর দিন কামনা বা চেষ্টা করে যাই বহুতল ইমারত খাঁড়া করার। অথচ ভিত অর্থাৎ শৈশব শিক্ষাটা যদি পোক্ত হত, কতই না সহজ ছিল ব্যপারাটা।

থামলাম একটু। স্যার কিছু বললেন না। মনে হল শুনতে চাইছেন। ভাবলাম, যা হয় হবে, চাকরি যদি খেয়ে লেয় লিক, বলারা যখন ঠেলে বেরোতে চাইছে বলি৷ বললাম,

—আমাদের এ রাজ্যে, এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কেন একটা শিশুকে মনোবৈজ্ঞানিক উপায়ে পাঠ দান করা হয় না? কেন একজন পিএইচডি স্কলার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হবেন না? প্রতিদিনই আমাদের শিশুরা হয় পরিবারের থেকে, না হয় প্রতিবেশী বড়দের কাছে সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজড হয়, ওরা তো পরিবারের কাছে সে কথা স্বীকার করতেও ভয় পায়, কেন স্কুলে ওদের প্রপার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে না? প্রপার কাউন্সেলিংহীন এইসব শিশুরা বড় হয়ে বিকৃত সমাজব্যবস্থা ছাড়া কীইবা উপহার দিতে পারে আমাদের! মাঝেমাঝে মনে হয় স্যার, আমি যদি প্রধানমন্ত্রী বা ওই গোত্রীয় ক্ষমতার মানুষটি হতে পারতাম, যার হাতে থাকবে প্রাইমারী এডুকেশান সিস্টেমটাকে বদলে দিতে পারার ক্ষমতা, অদূর ভবিষ্যতে হাজারও দোষারোপ করার এই সমাজ ব্যবস্থাটি হয়ত থাকত না, সত্যিকারের শিক্ষিত সমাজ আসলে কী, বোঝা সহজ হত।

একটানা এতটা বলতে বলতে সেদিন খুব উত্তেজনা কাজ করছিল। টের পাচ্ছিলাম, কান গরমে লাল হয়ে উঠেছিল।

স্যার বললেন,

—এইভাবে যে কেউ ভাবে বা ভাবা যায়, ভাবতেই ভাল লাগছে, চেতনাকে নাড়িয়ে দিলেন, মনে থাকবে আপনাকে। আপনার বই দু'টো কী আমি রাখতে পারি?

আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালে তিনি আমার ফোন নাম্বার চাইলেন, বলতেই টুকে নিলেন আমার একটি বইতে।

এতক্ষণের কথাবার্তার ভেতরে ম্যাম একটুও কথা বলেননি, এবার জিজ্ঞাসা করলেন,

—রিপা আপনার কে হয়?

বলতে ভুলেছি আমার আর বোন রিপার (রিপা)  একই রুমে ইন্টারভিউ পড়েছিল। পরপর দু'জনে গেলে যদি একজনের চাকরি মিস হয় এই ভেবে বোনই আমার ছয়-সাতজন আগে ইন্টারভিউ অ্যাটেন্ড করে গেছে। ম্যামকে খুব সরলভাবেই বললাম সে কথা। তিনি জানালেন, রিপার সাথেও কথা বলে ওঁদের ভাল লেগেছে। ম্যাম এবার আবদার জুড়লেন, আমাকে একটা কবিতা শোনানোর জন্য। আমি বাড়ি থেকে আগাম একটা ছড়া মুখস্ত করে গেছিলাম। বললাম,

—একটা ছড়া শোনাই তাহলে?

স্যারটি পাশের ৮ নম্বর রুমের স্যারের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, ’স্যার; একটা নতুন ছড়া শোনেন’, বলেই আমাকে জোরে জোরে পাঠ করতে বললেন, ছড়াটির নাম ছিল, 'বিচ্ছু'

'চৌখুপি-চঁদিয়ালে মন নেই
মাথা ভেঙে পড়ে আছে লাট্টু
আটকে রাখে না তার রাস্তা
স্বপ্নের ঘুমভাঙা টাট্টু।

কেউ তাকে সারাদিন খুঁজছে
কেউ তাকে ছায়া দেয় আড়ালে,
দু'চোখেই জল করে চিকচিক
জানালায় মুখখানা বাড়ালে৷

রাতারাতি সব গেছে পালটে
গােল-গাল পৃথিবীটা চৌকো
নদীটার গায়ে কোনাে সাড়া নেই
হাই তােলে ছায়া ছায়া নৌকো।

নৌকোয় আলাে জ্বলে টিমটিম
সে-আলাের ধার ঘেষে বিচ্ছু
বসে-বসে তারা গােনে একলা
ভয়ডর নেই তার কিছু!

ছেলেটা এখন আছে ঘুমিয়ে
চারিদিকে বইখাতা ছড়ানাে,
একটু পরেই কত কাজ তার
ফুল-পাখি-পিঁপড়েকে পড়ানাে।'


ইন্টারভিউ শেষে বাইরে এসে দেখি, সবাই চলে গেলেও দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে বোন রিপা এতক্ষণের ইন্টারভিউটুকু শুনছিল, তার চোখের অশ্রু বিন্দুতে চিকচিক করছে আলো,  সে আলো আমাতেও সংক্রমিত হল!

যেহেতু শৈশব দীর্ঘ

একদিন ছিল, যেদিন হয়ত আমারই নানান আচরণের দ্বারা ব্যথিত হয়ে একে একে বান্ধবেরা দূরে সরে যেতে শুরু করেছিল। ফলত নিজেরে দোষারোপ দেওয়া অনিবার্য নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, মনে হয়েছিল, আমার আত্মা কোনওমতেই শুদ্ধ নয়। হয়ত তেমনই আত্মাশুদ্ধির প্রয়োজন মনে হওয়া কোনও দিনে দুটি বাক্য উপশমের মতো নাগালে এসেছিল, The soul is healed by being with children. They are the hands by which we take hold of heaven. মানসিকতায় খুলে ফেললাম সেই পাঠশালা, যেখানে আমাদের প্রিয় শিশু সকলকে বানালাম আমার গুরুমশাই, ওদের মনজগতের সখ্য হলাম, ধীরে আয়ত্বে এল আপন হওয়ার কৌশল। ওদের সাহচর্য অনেক বোধোদয়ে পরিচালিত করতে লাগলো, টের পেলাম, মানুষের আচরণ বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাণীদের মতো প্রবৃত্তি খুব প্রভাবশালী নয়। মানবজীবনের পরিপক্কতা জন্মের পূর্বে হয় যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি হয় জন্মের পরে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। মানব শিশুর গুরুমস্তিষ্কের বহিরাংশ, সেরিব্রাল কর্টেক্স, অনেক দিন অপরিণত থাকে। অন্য সকল প্রাণীর চেয়ে একমাত্র  মানুষের শৈশবকাল তাই দীর্ঘ সময়ব্যাপী!

অবশ্য কোনও কোনও ক্ষেত্রে কোনও কোনও মানুষের শৈশব বড়ই সল্পস্থায়ী। শিশু যত রকমারি অভিজ্ঞতার সামনে হাজির হয়, শৈশবকালও তার ক্রমান্বয়ে কমে আসে। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ছে, ১০-১১ বছরের একটি বাড়ির পাশের  বাচ্চার বাবা মারা যাওয়ার পরে, এক লাফে বড় হয়ে যেতে তাকে দেখেছি, এই রকম কোনও ঘটনার জেরেই একদিন লিখেছিলাম,

"কিছু কিছু মৃত্যু রূপান্তরিত জন্ম
যেমন—
আগে কেউ হাত চেপে ধরলেই
হাত লাল হয়ে যেত...
বাবার অবর্তমানে 
বাজারের ব্যাগেও এখন 
হাত লাল হয় না।"

গৌর নাম্নী সেই ছেলেটির বাবা মারা যাওয়ার পর গোটা সংসার তার কাধে এসে পড়েছিল।  আমি ওর তুলনায় তখন বছর দশেকের বড়। আমার পক্ষে সেই মুহূর্তে আমার নিজের সংসার টানার ক্ষমতা ছিল না। গৌড়ের ছিল, অভিজ্ঞতার নিরিখে তখন আমার চেয়ে যেন বয়স তার বেড়ে গেছে! কৈশরেও সে আর বুঝি নেই! খানিকটা হয়েছেও সে রুক্ষ মেজাজের...

সুদীর্ঘ শৈশবই আসলে  মানবশিশুকে করে তোলে নমনীয় এবং এরই ফলে এই মানব জাতি যেকোনও আকস্মিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য ঘটিয়ে অস্তিত্ব রক্ষা করতে পেরেছে যুগ যুগ ধরে। মানবশিশুর অভিভাবককত্বের দায়িত্ব তাই গভীর তম। এই সুদীর্ঘ শৈশবজীবনের নানান অর্বাচীনতা খেয়াল করেই কবি ও শিক্ষক রাণা রায়চৌধুরী একটা গদ্যে লিখেছিলেন—

"সন্তান সকল ছেঁড়া সহজপাঠ, ছেঁড়া রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আরো আরো ছিঁড়ে কাটাকুটি করছে— পারলে পুরো শিশুজীবনটাই ছিঁড়ে ফেলে তারা। মাস্টারের কাজ পড়ানো নয়—জীবন থেকে যাতে ছিঁড়ে না পড়ে যায় এইসব শিশুসকল সেদিকে খেয়াল রাখা।"

—এই সময় পর্বে অবিভাবদের অত্যন্ত জরুরি কাজটি হল, শিশুর প্রতি ধৈর্যকে অক্ষুন্ন রাখা। একটা বাচ্চার সাথে প্রথম দিকে একটু বেশি সময় কাটাতে গেলেই হাঁপিয়ে যেতাম, বাচ্চার সাথে একটানা খানিক সময় কাটানো যদিও জোরালো কোনও কাজ নয়। অথচ মনে হত, এর চাইতে কেউ যদি কাঠা দশেকের জমি কোদালে কোপাতে বলত সেটা আরও সহজ ছিল। এমন কেন হয়?  আসলে শিশুর আচরনের অর্বাচীনতা সহ্য করতে পারার যে ধৈর্য, তার অভাব বোধের দরুন এইরূপ মনে হয়। তাই তো আমরা ধৈর্য হারিয়ে শিশুর সামান্য ভুলে গুরুতর শাস্তি দিয়ে ফেলি। অনেক সময় শাস্তি পাওয়ার কারণ না জেনেই শিশুটিকে শাস্তি হজম করতে হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে শিশুটি ভেবেই ফেলে, তার বাবা-মা হয়তো তাকে আর চায় না। কিন্তু সত্যিকথাটি হল, ছোটরা যখনই কোনও ভুল করে, তখনই সেই ভুলকে উপলক্ষ করে ছোটদের খুব অন্তরঙ্গ হওয়ার, একটা মনখোলা বোঝাপড়া করার মস্ত বড় সুযোগ এসে যায় অভিভাবকদের হাতে। এমন কী এগুলির মধ্যে দিয়ে ছোটদের চিন্তাধারার ওপর প্রভাব বিস্তারের অনেক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

রাস্তায় বেরোলেই দেখবেন এমন কিছু বাইক চালক আছেন যারা 
নিজেদের এবং অপরের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদজনক তীব্র গতিতে বাইক ছোটান, যেন উদীয়মান শ্মশানযাত্রী! কীভাবে সব চেয়ে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছনো যায়, এটাই যেন লক্ষ্য! আত্মবিশ্বাস তাঁদের এমনই গভীর হয় যে, তাঁরা ভুলে যান, গাড়ি চালানোর দক্ষতা ছাড়াও আরও অনেকগুলি জিনিসের ওপর গন্তব্যস্থানে পৌঁছনো নির্ভর করছে। ভুলে যান যে, গাড়িখানির ভার-বহনের একটা সীমা আছে। যেরকম উল্কাবেগে বাইক ছোটাচ্ছেন, গাড়ির বেগশক্তি তত নয় এবং এতে গাড়িখানির ওপর অযথা ধকল পড়ছে, অত্যাচার করা হচ্ছে।

শিশু পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক অভিভাবকও এই ধরনের চালকের মতো। শিশু নিতান্তই শিশু এবং তাকে পরিচালনা করবার যথেষ্ট দক্ষতা তাঁদের আছে, এই মনে করে তাঁরা ছোটদের যেমন খুশি পরিচালনা করেন। মুহূর্তের জন্যও তাঁরা ভাবেন না যে, এর দ্বারা ছোটদের ওপরে অত্যধিক পরিশ্রমের বোঝা চাপানো হয় এবং ছোটরা তা সইতে পারে না। এমন অবস্থায় ছোটরা তাদের ব্যর্থতার কারণও বুঝতে পারে না, কিংবা যে লক্ষ্যে পৌঁছবার জন্যে তাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তারও মাথামুণ্ডু কিছু বুঝে উঠতে পারে না। ছোটদের এই মনোদ্বিধার দিকে অতি উৎসাহী অভিভাবকরা লক্ষ্য দেন খুবই কম। আমরা ছোটদের প্রতি যখনই দরকার মত সহানুভূতি দেখাতে পারিনা, তখনই তারা হয় দ্বিধাগ্রস্ত, ভাবে, তার আচরণে বড়রা হয়তো ভুল বুঝবে।  শিশুটি গুটিয়ে যায়, তখন সে সরে এসে নিজের একটা জগত তৈরি করে যার সঙ্গে বয়স্ক জগতের অনেক ব্যবধান, এই দুই জগতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে গেলে অনেক কসরত  করতে হয়। শিশুর এই জগতে প্রবেশ অধিকার পেতে গেলে, শাস্তি বর্জন করতে হবে, লোভ দেখানো বা ঘুষ খাইয়ে কাজ হাসিল করার ফন্দিও ছাড়তে হবে। তাহলে কাজ হাসিল হবে কীভাবে? 
—একটু প্রশংসার মধ্যে দিয়ে ছোটরা চায় স্বীকৃতি। পাড়ার দাদারা ছোটদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশেন, তাদের খেলাধূলার মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাহবার আয়োজন করেন। তাই পাড়ার দাদাদের কথা ছোটরা অনেক মূল্যবান মনে করে। অভিভাবক ও শিক্ষকরা এই জন্যে অনেক সময় অনুযোগ করেন, পাড়ার দাদারা ছেলে-মেয়েদের মন কেড়ে নেয়। তাহলে আপনি অবিভাবক বা শিক্ষক কেন পারছেন না? কারণ, আপনার প্রাধান্য এবং শ্রেষ্ঠতা (সুপিরিয়রিটি)। একথা মেনে নিচ্ছি, বয়সে বড় আমরা শিশুর চেয়ে অনেকাংশে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু সেই শ্রেষ্ঠতার খাতিরে আমাদের কোনও প্রাধান্য শিশুর ওপর বিস্তার করবার চেষ্টা করলেই আমরা সমস্যার কারণ হয়ে উঠবো!

আমাদের অধিকাংশ বাচ্চাদের মা-বাবা, অবিভাবকেরা চাই, তাদের জীবনের যাবতীয় অসফলতাগুলো তাদের বাচ্চাদের ভেতর দিয়ে সাফল্য পাক, সেইমতো কঠোর অনুশাসনে বেড়াজালে আরোপিত জীবনে বেঁধে ফেলাও হয় তাকে। পরবর্তী জীবনে বাচ্চাটি খারাপ পথে পরিচালিত হলে সেই অনুশাসনেরই দোষ দিই আমরা। এই প্রসঙ্গে দিন কয়েক আগেই সম্মুখীন হওয়া একটা অভিজ্ঞতার কথা শোনাই। এক বান্ধবী যখন জানায়, সে সহ তার মা-বাবা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছে। কারণ শুধোলে সে জানায়, তার দাদা বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে, পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখেনি। আমি জানতে চাই,  মা-বাবার সাথে তাদের দুই ভাইবোনের কেমন বন্ধুত্ব ছিল? সে জানায়, কোনও দিনই তারা বন্ধুজন ছিল না, কঠোর অনুশাসনে মানুষ হয়েছে। জানি না ওদের বাবা-মা কোন ভুলে বা দোষে এই শাস্তি ভোগ করছেন। ভাবতেই বিভাস রায়চৌধুরীর লেখা দু'টি পঙক্তি মাথায় এল—

"শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না কোনও দিন
বন্ধুদের ভুল এক জীবনে ক্ষমা করা যায় বারবার..."

শিশুর কাছে হতে হবে সমান ও সহজ বন্ধু। তার সমস্যায় সাহায্য করতে হবে বন্ধুর মতো, কর্তৃত্বের খাতিরে নয়। কথাবার্তা, আচরণে তাকে সব সময়ে আমাদের একথাটা বোঝাবার চেষ্টা করতে হবে। এই প্রসঙ্গে আমার জীবনের একটা ঘটনা শোনাই। মাধ্যমিকের মতো উচ্চমাধ্যমিকেও বরুণদার কাছে ইংরাজি পড়তাম, লেখালেখির উৎসাহে কত বই যে পড়াতেন! বরুণদার প্রতি আমার শ্রদ্ধা অগাধ। শ্রদ্ধার একটা ভয় আছে, বিবেচনা বোধ আছে। তাই আমার যাবতীয় দুষ্টুমি দাদার এই ব্যাচকে এড়িয়ে চলত। পড়ার ঘরেও দাদার খানিক দূরে এক কোনায় চুপচাপ থাকতাম। আমার এই চুপ থাকা একটি মেয়েকে পেয়ে বসেছিল। যেভাবে খাতাগুলো হাত ঘুরে ঘুরে বরুণদার কাছে পৌঁছায়, ফিরে আসার পথও অনুরূপ। এই ফিরে আসার পথেই একদিন সে খাতার ভেতর চিঠি দিয়েছিল, চিঠিটিতে তার নাম ছিল না! নোটের জেরক্সের অক্ষর মিলিয়ে নাম আবিষ্কারে আনন্দ হয়েছিল খুব, নিজেকে তোপসে তোপসে লাগছিল। কেন না ফেলুদা ভাবতাম একমাত্র বাবাকেই। পড়ালাম চিঠিটা, এবার কী করণীয় আমার, জনতে চাইলাম। বাবা হেসে বললেন, 

—'তুমি বড় হয়েছ, নিজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী হয়েছ, এই যে তোমার মাধ্যমিকের ফলাফল, তোমার এই বড় সিদ্ধান্তের দাম আজীবনের। তাই এই চিঠির ব্যাপারে কয়েকটা পরামর্শ দিতে পারি বড়োজোর। তোমার আর ওই মেয়েটির বয়স প্রায় একই। যেখানে আমাদের সমাজে মেয়েদের তুলনামূলক আগেই বিয়ে দিয়ে দেয়, সেখানে তোমাদের সম্পর্কটা তৈরি হয়ে ভেঙে গেলে তোমাদের ভেতরকার বন্ধুত্ব বেঁচে থাকবে তো? এসব ছাপিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর বয়স পর্যন্ত এই সম্পর্ককে ধরে রাখতে পারবে তো? যদি মনে হয় সব টিকিয়ে রাখতে পারবে তাহলে আমি আর তোমার মা প্রয়োজনে তোমাদের ভেতরের পিওন হতেও রাজি। '

—এহেন আরও নানান ঘটনার মাধ্যমে বাবা হয়ত বারবার শেখাতে চেয়েছেন; তার বাচ্চারা চোখ খোলা রেখে স্বপ্ন দেখতে শিখুক। তিনি হয়ত চেয়েছেন; তার বাচ্চারা মাটিতে পা রাখুক, তাই বিশ্বাসী ভঙ্গিতে তাদের কাঁধে কিছু দায়িত্ব তুলে দিতে দ্বিধা পোষেননি। 

আমাদের উচিত শিশুদের আত্মবিশ্বাস জাগানো, তা ছোটোখাটো দায়িত্ব নিতে শেখানো হোক বা প্রশংসা। সে নিজেকে যতটা অপদার্থ মনে করছে, ততটা সে নয়, এ কথাটা তাকে বিশ্বাস করাতে হবে। 'বাঃ বেশ করেছ', 'আমি খুব খুশি হয়েছি' —এরকম শুনলে যেকোনও কারোই ইচ্ছে হবে একটা কাজ আর একবার করতে এবং আরও ভালভাবে। একটু বাহবা পেলে শিশুও সেই রকম আমাদের ওপর আস্থাবান হয়ে ওঠে। তবে তাকে উৎসাহ দিতে গিয়ে আমরা কখনও যেন মাত্রাতিরিক্ত আবেগ প্রকাশ না করি। আমাদের বড়দের কথার প্রতিক্রিয়া শিশুর মনে নানা রকম হতে পারে। একটা ভুল প্রশংসার ফলে আমরা মস্ত বড় সমস্যার সৃষ্টি করে ফেলতে পারি। তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, প্রশংসার ভাষা ব্যবহারে। 'লাল্টু কেমন সুন্দর হাতপাখা বানিয়েছে, বেশ হয়েছে'-একথা আমরা বলতেই পারি। কিন্তু 'লাল্টুর মতো সুন্দর ছেলে আর হয় না, এমন ছেলে আমি জগতে আর একটাও দেখিনি'—একথা কিন্তু বিপজ্জনক। লাল্টু যা করেছে তার বাহবা আমরা নির্ভয়ে প্রয়োজনীয় সময়ে দিতেই পারি, কিন্তু লাল্টু "কী" বা "কেমন", তার জন্যে তাকে প্রশংসা করে তার ক্ষতি সাধন নাইবা করলাম।


শিশুর প্রতি ভাষা ও প্রশ্নের ব্যবহার

জা ল্যুক গদরের একটা সিনেমা দেখেছিলাম, 'মেয়েটি সম্পর্কে আমি যা জানি'৷ একটা দৃশ্যে, বাচ্চা মেয়েটা তার মাকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলো, 'ভাষা কী?' উত্তরে মা বলেছিল,— 'আমরা যে বাড়িটায় থাকি, সেটাই ভাষা।' —কী অদ্ভুত, ভাষাই আমাদের অন্যতম আস্তানা! এই যে বাচ্চাটি প্রশ্ন করল বলেই তো এত দারুণ একটা উত্তর মায়ের মনে তৈরি হল। কেউ একজন বলেছিল, প্রশ্ন তৈরি হওয়াটাই আসল, একটা উত্তর যতটা প্রাসঙ্গিক, প্রশ্নটা তার হাজার গুণ বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রশ্ন তৈরি হলে যুগযুগান্তর পেরিয়ে এক সময় না এক সময় উত্তর ঠিকই পাওয়া যায়। প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে শিশুকে জ্ঞানের পথে নিয়ে যাওয়ার কথাটা অদ্ভুত মনে হলেও এই কৌশলটি সক্রেটিসের আমল থেকে চলে আসছে। তবে শিশুকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রেও ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে সর্তক থাকতে হবে। 
ধরুন, বাড়ি ফিরে দেখলেন আপনার অতিপ্রিয় সাদা জামাটায় কালার পেন্সিলে কাঁচা হাতের কেউ একজন অজস্র আঁকিবুঁকি করেছে। দেখেই আপনার খুব মাথা গরম হল। যে বাচ্চাটির কীর্তি, তাকে সামনে পেয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, এসব কে করেছে? কেন জামাটাকে নষ্ট করলে? আর কোনও দিন এরকম কাজ করবে?

এমন ধরনের রুক্ষ রূঢ় প্রশ্ন করলে শিশুদের মনে খুব ভয় জাগে, যা তাদের কোনও স্থায়ী উপকারে তো আসেই না, উপরন্তু যে-প্রশ্ন ছোটদের মনে উদ্বেগ আতঙ্কের সৃষ্টি করে, তারা সেই প্রশ্নের জবাবও ঠিকমতো দিতে পারে না। অনেক সময় ভাল-মন্দ বুঝতে না পেরে মিথ্যা কথাও বলে ফেলে। ছোটদের অভিজ্ঞতা অল্প এবং তারা কোনও ভাব বা চিন্তা গ্রহণ করে ধীরে ধীরে। মানুষের ভাষার মধ্যে যে প্রতীক ধ্বনি রয়েছে, তার সঠিক অর্থ বুঝতে তাদের সময় লাগে। তাই ছোটদের প্রতি প্রশ্ন করার ভাষাও তাই সহজ হওয়া চাই। প্রশ্নের বাক্য হবে সংক্ষিপ্ত, সরল। প্রশ্নের মধ্যে যেসব শব্দ ব্যবহার করা হবে, তার প্রত্যেকটি যেন ছোটদের শব্দভাণ্ডারের পরিধির মধ্যে থাকে। প্রশ্নটি সব সময়েই একটি সম্পূর্ণ বাক্যের আকারে ছোটদের সামনে আনতে হবে। অসম্পূর্ণ বাক্য কিংবা শুধুমাত্র  'কেন' দিয়ে প্রশ্ন করা ঠিক নয়। এর ফলে শিশুরা সম্পূর্ণ বাক্য বুঝতে পারার এবং সম্পূর্ণ বাক্য বলতে পারার অভ্যাসে পিছিয়ে পড়ে। তাছাড়া, এমন প্রশ্ন করা উচিত, যার উত্তরে ছোটদের সম্পূর্ণ বাক্য ব্যবহার করতেই হবে। যে-প্রশ্নের উত্তরে কেবল 'হ্যাঁ' কিংবা 'না' বললেই হয়, সেই প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে ছোটদের মনে উদ্দীপনা জাগানো শক্ত হয়ে পড়ে। তাছাড়া কেবলমাত্র হ্যাঁ বা না বলে প্রশ্নের জবাব দেবার সুযোগ পেলে ছোটরা অনেক সময়ে আন্দাজে জবাব দেবার আগ্রহ বোধ করে, অন্যমনস্কভাবে ভুল জবাব দিয়ে চিন্তার কর্মক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। প্রশ্ন আবার খুব সহজ, খুব মামুলী হলে ছোটরা মোটেই উৎসাহ পায় না; সেই ধরনের প্রশ্ন তাদের জানার আগ্রহকে দমিয়ে দেয়। ছেলে-ঠকানো প্রশ্ন ছোটদের খুব আনন্দ দেয় বলে অনেকে আবার এই ধরনের যথেচ্ছ প্রশ্ন করে থাকেন ছোট ছেলে-মেয়েদের। তাঁরা বলেন, এই ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হলে ছোটরা উপস্থিত বুদ্ধিবিকাশের সুযোগ পায়, মজা পায়। তবে একথাও ঠিক, যে-সব প্রশ্ন ছোটদের কেবল বোকা বানায়, অপদস্থ করে, সেই সব প্রশ্ন তাদের মধ্যে হীন মনোভাবের সৃষ্টি করতে পারে। উপস্থিত-বুদ্ধি বিকাশের কথা দূরে থাকুক, দুর্বল-মনের শিশুরা এর ফলে প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই ভয় পাবে, লজ্জা পাবে, এড়িয়ে যেতে চাইবে। সেই জন্যে, সব প্রশ্নই ছোটদের বয়সের উপযোগী বুদ্ধির অনুপাতে হওয়া উচিত। প্রশ্ন করতে হবে ঠকানোর চ্যালেঞ্জ দিয়ে নয়, আলোচনায় জয়লাভের আনন্দ আভাস দিয়ে।

অধিকাংশ ছোটদের মধ্যেই একটা সহজ অন্তর্দৃষ্টি এবং সরল বিবেচনা শক্তি আছে, একথাটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। উপযুক্ত স্নেহ, সহানুভূতি ও সহযোগিতা পেলে তারা এমন অনেক পরিস্থিতিকে অতিক্রম করতে পারে, যেখানে বড়দেরও দ্বিধাগ্রস্ত হতে হয়। এরকম দৃষ্টান্ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অহরহ ঘটে থাকে, একটু সজাগ থাকলেই তা দেখা যায়। যাঁরা ছোটদের এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে একে নিতান্তই ঘটনাচক্রের দৈবমিলন মনে করেন, তাঁরা শিশুকে তুচ্ছ মনে করে নিজেদের বয়স্কজনোচিত মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে চান মাত্র। একদিন মামা অন্তপ্রাণ আমার দুই বছরের ভাগ্নির সামনে মজা করে বাবা আমায় মারতে উদ্যত হলে  দেখি, ঝটপট সে তার জলের পট আমার মুখে তুলে দিয়ে বাবাকে উদ্যেশ্য করে বলছে, 
—'দাদু, আপনকে মেরো না, ন জল খাচ্ছে তো, জানো না, কেউ জল খেতে লাগলে তাকে মারতে নেই?'


উত্তেজনা মুখর শৈশব

শিশুর সরলতায় জগতে কোনও কুটিল ছবি সহজে ধরা পড়ে না, হয়ত এরই জন্যে তারা চরম নিষ্ঠুর। দেখা গেল, একটা বাচ্চা হাতের লাঠিখানা দিয়ে কাউকে অচানক জোরসে মেরে বসল বা হাতের ছুরি দিয়ে কারো গায়ে দিল এক কোপ বসিয়ে! কিংবা একটা পাগলের পেছনে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে পিছু নিলো! এইসব কাজ করার পরও দেখা গেল তার মুখে কোনও অপরাধবোধ নেই! বরং উচ্চস্বরে হেসে উঠেছে, যেন খুব মজা পেয়েছে। কেন এমন হয়? আসলে বাচ্চারা নিজেদের সেই কাজের অন্তর্গত মনে করে যে কাজে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। যা ছিল না, যা হওয়া সম্ভব নয় তার সম্ভাবনার দিকে যেতে চায় অর্থাৎ তারা জাদু দেখতে চায় এবং তার সন্ধান করে। তাই হয়ত আমার প্রাইমারি জীবনে ‘বড় হয়ে কী হতে চাই’ রচনায় লিখেছিলাম ম্যাজিসিয়ান হওয়ার ইচ্ছে। গোটা স্কুলবাড়িটাকে ভ্যানিশ করে দিয়েছিলাম। গভীর প্রচেষ্টায় টুকরোটাকরা ম্যাজিক আত্মস্থও করেছিলাম। তাক লাগাতে পারতাম বাবাকেও। সেই সব ম্যাজিকদের এখনও কাজে নামতে দেখি! বাচ্চারা খুব সহজে আমার সাথে মেশার আগ্রহ দেখায়। শুধু ঘটনা নয়, কথার উত্তরের মাধ্যমেও তারা এই মজা বোধ তৈরি করে।  একদিন একদল পোলাপান শোর করে যাচ্ছিল পথে, তাদের মুখে বারবার যে শব্দবন্ধ উচ্চারিত হচ্ছিল, তা হল, 

—এএএ জ্যোৎস্নার ফুল ফুটেছে, জ্যোৎস্নার ফুল ফুটেছে। 

এ শুনে জিজ্ঞেস করা হল,

—জোৎস্নার ফুল কোথায় ফুটেছে রে?

—"তোমার পোঁদে" বলেই তারা ঝমঝমিয়ে হেসে ওঠে।


নিষেধে আগ্রহান্বিত শৈশব

ওই পোলাপানদের মতোই এক ত্যাদোড় ইনফ্যান্টের বাচ্চাকে বহু আগে পড়াতে যেতাম ভোরে, যাকে কাবু করতে কালঘাম ছুটে যেত। পাত্তাই দিত না, চোখ পাকালে পালটা চোখ পাকাত৷ ফলত তার পড়াশুনায় মন বসাতে সঙ্গে নিয়ে যেতাম হরেক টফি, লজেন্স। একদিন সে পুরো ব্যঞ্জনবর্ণ স্লেটে একটানে লিখে ফেলায় আমি খুব খুশি, কাছে টেনে চুমু খেয়ে বলেছিলাম, 'আই লাভ ইউ'। এই কথাটি খোকার মায়ের কানে যায়, তিনি এসে ঝাঁঝের সাথে বলেন, "মাস্টার তুমি আর পড়াতে আসবা না, তুমি ওকে আকথা শেখাচ্ছো।" "আই লাভ ইউ" আকথা!? আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! আমার সব বোঝানোই সার! এখনও বুঝে উঠতে পারি না কোন পরিবেশে কোন কথা আসলেই আকথা। আজকাল বাবা-মায়েরা বাচ্চার মুখে একটা খিস্তি শুনেই তাকে প্রহার করেন, নিষেধ করেন এর সাথে মিশবি না ওর সাথে খেলবি না। কিন্তু তারা জানে না "নিষেধ" শব্দটার সঙ্গে বাচ্চারা সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়, হয়ত অভিকর্ষ বলের অধিক টানে বেশি ওদের।

একটা গল্প পড়ছিলাম, তাতে বোঝানো হয়েছে, মায়ের নিষেধ না মানার ফলে একটি ছেলেকে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বাবা-মায়ের কথা না শুনলে অনেক দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হয়, সে-কথা ছোটদের বোঝানোর জন্যে এমন কত যে গল্প আছে! সোহেলের সখ হল পাড়ার বন্ধু অতনুর মতো নিজের হাতে আতশবাজি পোড়াবে। কিন্তু তার মা কিছুতেই রাজি হলেন না, উপরন্তু তাকে বোঝালেন, বাচ্চাদের হাতে ওসব বাজি পোড়ানো খুবই বিপজ্জনক। সোহেল অনেক আব্দার, কাকুতি মিনতি করল। কিন্তু মায়ের হুকুম কিছুতেই নড়ল না।  ফলে সোহেল কোনও এক ফাঁকে বেরিয়ে পড়ে লুকিয়ে কিনে আনল ফুলঝুরি, লুকিয়েও রাখলো শোবার ঘরের কুলুঙ্গিতে। তারপর ফাঁকা সময় বুঝে সেগুলোকে নিয়ে গেলো স্নানের ঘরে, দরজা বন্ধ করে জ্বালালো ফুলঝুরি। জ্বালানোর পরে মনে মনে হয়তো তখন ভেবেও নিয়েছিল, তার মা মিছেই ভয় পেয়েছে। কিন্তু হঠাৎ দৈবক্রমে একটা জ্বলন্ত ফুলঝুরি থেকে কেমন করে যেন আগুন ধরে গেল সোহেলের জামায়। জামা থেকে প্যান্টে। কি যে হল বোঝবার আগেই ওর সর্বাঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। তার আকুল চিৎকারে বাবা ছুটে এলেন। সে ততক্ষণে প্রায় অর্ধদগ্ধ! — হয়তো এই কাহিনীর নীতিকথা : 'সব সময়ে মায়ের কথা শুনতে হয়; মা ভাল-মন্দ সব কিছু বোঝেন।' কিন্তু অবাক হয়ে ভাবতে হয়, এই ঘটনাটির প্রথমে মা কেন 'না' এই কথাটা বলে সোহেলকে সরিয়ে দিলেন? তিনি হয়তো বলবেন, বাচ্চা ছেলেকে তার মা তো চাইবেই সাবধানে রাখতে। কিন্তু প্রশ্ন আসে, কেমন করে সোহেল বাজী পোড়ালে বিপদ হবে না, সেটা হাতে ধরিয়ে শিখিয়ে দেবার ঝঞ্জাট টুকু তিনি কি নিতে চাননি?

অল্প বয়সে কবি রসিক সরকারের কবিগানে শুনেছিলাম, এক বাবা ঘাটে ছেলের হাতে পিদ্দুম ধরিয়ে দিয়ে, নাও নিয়ে মাঝ দরিয়ায় যাওয়ার আগে বারবার সতর্ক করেছিলেন, "খবরদার, আগুনে কিন্তু হাত দিবিনে"। নাও ঘাট ছেড়ে কিছুটা যেতেই ওই বাচ্চাটি প্রথম যে কাজটি করল, পিদ্দুমের আগুনে দিল আঙুল ঢুকিয়ে। তাই বারবার বারণ করে নাইবা বাড়ালাম শিশুর আগ্রহ, বরং খোদ তাকে দিয়েই যদি বারণ করানো সম্ভব হয় সেটাই একমাত্র কাজে দেয় দেখেছি। কবি সুমিতেশ সরকার খুব কাছের এক প্রিয়জন ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্বের তাঁরই এলাকায় একটা সাক্ষাতের দিনের কথা মনে পড়ল এই প্রসঙ্গে। সেদিন সঙ্গে ওনার বাচ্চাটি ছিল, সে এক সময় ফুটপাতের বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই রাজি হলেন তিনি, সেই মতো সেই বাচ্চা সকলকে নরম ভাষায় বুঝিয়েও বলেছিলেন, যে বাচ্চাগুলো একটু আগেও খেলার ভেতর গালাগাল-খিস্তি আওড়াচ্ছিল। অবাক হয়ে সে কথা স্মরণ করাতেই সুমিতেশদা বলেছিলেন, 'কয়েকটা গালাগাল যদি না শেখে তাহলে সেই গালাগাল যে খারাপ সেই বোধে নিজে থেকে উন্নীত হবে কীভাবে?' গালাগালি বা রুক্ষ আচরণ করলেই তো শিশু অপরাধী হয় না, তার এই স্বভাবের জন্য সে যতটা না দায়ী তার অধিক দায়ী পরিবার ও বাসস্থান।



অপরাধ প্রবণ শৈশব

এখন প্রশ্ন কোন শিশু অপরাধী হবে?

ক্লাস ফোরের যে ছেলেটি ক্লাসের সহপাঠির সঙ্গে ঝগড়া-মারামারির সময়ে পকেটে লুকিয়ে রাখা ব্লেড দিয়ে বন্ধুটির হাত লম্বা করে চিরে দিয়েছিল, তাকে দেখে স্কুলশুদ্ধ সব শিক্ষরা একবাক্যে রায় দিলেন, 'বড় হয়ে ছোঁড়াটা পাক্কা গুণ্ডা হবে।' কিন্তু ছোটোদের মধ্যে কারা অপরাধপ্রবণ হবে, তা বোধ হয় এত সহজে বলা যায় না। শিশু মনোবিদরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁচেছেন যে, স্নেহশীল পিতা এবং নির্বিকার পিতার সন্তানরা বিশেষ অপরাধপ্রবণ হয় না। বাবা-মা না থাকলে, কিংবা তাঁরা অত্যধিক কঠোর, নিষ্ঠুর হলে, বা সন্তানদের অবহেলা করলে, অধিকাংশ ছেলেই অপরাধপ্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। যে-সংসার ভেঙে গেছে, সেই সংসারের ছেলে-মেয়েরা বেয়াড়া হয়ে যায়, এটা খুব জোর দিয়েই বলা হয়। তবে, সংসার ভেঙে যাওয়াটাই বড় কথা নয়; ঝগড়াঝাঁটি খিটিমিটি অশান্তিটাই হল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা শিশুকে স্নেহ করুন বা না করুন, তাঁদের নিজেদের মধ্যেই যদি অহরহ কলহ লেগে থাকে, তা হলে অল্পবয়সী শিশুর মনে অপরাধপ্রবণতা জেগে ওঠা কিছুই অস্বাভাবিক নয়। সমাজের অধিকাংশ লোকই মানতে চান না যে, অপরাধপ্রবণতার গোড়া হল পরিবারের দুটি প্রধান মানুষ—মা আর বাবা।

কয়েকদিন আগের ঘটনা, হাবড়ার দেশবন্ধু নগরের ১৮-১৯ বছরের এক ছেলে আত্মহত্যা করেছিল। কারণ, সে পূজোয় বাবার কাছে একটা বাইকের আবদার করেছিল। খানিক অর্থনৈতিক সমস্যার দরুন বাবা বলেছিলেন, এই তো কয়েক দিন বাদের দীপাবলিতেই কিনে দেবেন। কিন্তু এইটুকু অপেক্ষা, এইটুকু ধৈর্য সে ছেলের সহ্য হয়নি। ফলত সেই মাবাবাকে অকালে হারাতে হয়েছিল তাদের একমাত্র সন্তান। হয়ত ছেলেটির বাচ্চা বয়সে যুক্তিবোধ জাগবার আগে থেকেই তার মাবাবা তার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মিয়ে দিয়েছিলেন যে, সে যা চাইবে তক্ষনি তাই তার প্রাপ্য। কেবলমাত্র আত্মহত্যার মতো আচরণ নয়, এই ধরণের অধিকাংশ বাচ্চারা বড় হলে, তাদের কোনও খেয়াল পূর্ণ না হলেই চুরি করার মতো সিদ্ধান্ত নিতেও পিছুপা হয় না।

শিশুদের চুরি করা বা না বলে নেওয়ার স্বভাবটি অহরহ চোখে পড়ে। এক শিক্ষক দিবসে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের দেখাদেখি ক্লাস ফোরের কিষানও একটি কলম গিফট করেছিল, যেটি ছিল মাস কয়েক আগে আমার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় একটি কাঠের কলম। কিছুতেই সে কথা তাকে স্বীকার করানো গেলো না, বরাবরই বলে যাচ্ছিল, তার বাবা কিনে দিয়েছে! ক্লাসে কখনও সহপাঠির স্কেলবক্স, খাতা, খেলনা সুযোগ পেলেই সে সরাতো। তাকে দিয়ে যদি জোর করে খাতায় এক হাজার বার লেখানো যায়, 'না বলিয়া অন্যের কিছু লইলে চুরি করা হয়', তাতে হয়ত তার হাতের লেখা আরও খানিক ভালো হত, কিন্তু তার হাতটান স্বভাব ন্যূনতম কি ঘুচত? ছোট ছেলে-মেয়েদের মধ্যে চুরি করার প্রবৃত্তি একটা সমস্যা এবং এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অনেকেই ছোটদের মধ্যে সরল অনভিজ্ঞ শিশুটিকে ভুলে যান। শাস্তি বিধানের সাথে দোষ দেন শিশুটির বস্বভাব এবং নীতিহীনতার। 

এই প্রসঙ্গে শ্রুতি নামের মেয়েটির কথা মনে পড়ছে, বড় হয়ে চাকরির সূত্রে ইচ্ছে করেই দূরে চলে গেছেন, পরিবারের সাথে নিতান্ত যোগাযোগ রাখতে হয় তাই রাখেন, যেন তেমন টানই অনুভব করেন না! কারণ জানতে চাইলে বলেছিলেন, তারা দুইভাইবোন, সে ছিল ছোটো, মেয়ে বলেই ছেলেবেলা থেকেই পরিবারের নিদারুণ অবহেলায় সে মানুষ হয়েছে। খাবারের বড় ভাগটা সবসময় দাদাকে দেওয়া হত।  তিনটে চকোলেট এলে দুটো পেত দাদা, আর বাকি একটা পেত সে। একাধিকবার দাদা বাড়ি থেকে টাকাপয়সা চুরি করে তাকে চুরির অপবাদ জড়ালে মাবাবা সহজে মেনে নিয়ে শাস্তি বিধান দিতেন। ফলত পরিবারকে কখনোই ক্ষমা করতে পারেনি শ্রুতি। তার দাদা যে বাড়ি থেকে মাঝেমধ্যেই চুরি করায় সিদ্ধহস্ত হয়েছিল, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই, কারণ তার মাবাবাই অজান্তে তাকে শিখিয়েছিলেন, অপরের জিনিসে ভাগ বসিয়ে নিজের তৃপ্তি সাধনে দোষ নেই। আত্মতৃপ্তি সাধনের এই স্বেচ্ছাচারিতার মনোভাব শিশুর মনে বড়রাই অজান্তে জাগিয়ে দিয়ে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে, আত্মতৃপ্তির স্বেচ্ছাচারিতা আর এই অসন্তোষের বোঝা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নানাভাবে ছোটদের চুরির পথে টেনে নিয়ে যায়।

এই যে শ্রুতির দাদা বা কিষাণকে দেখা গেলো চুরি করে অস্বীকার করতে বা মিথ্যা কথা বলতে, আসলে চুরির মতোই ছোটোদের মধ্য আরেকটি অন্যতম প্রবণতা হল মিথ্যে কথা বলা। ওদের দেওয়া অজুহাতের হাতেখড়ি আমাদের হাতেই,  মিথ্যে কথা বলার পাঠ আমরাই প্রথম দিই ওদের।  জাপানে শিশুরা মিথ্যে কথার অস্তিত্ব জানতে পারে না, তাদের শেখানো হয় তেমনই। অথচ আমাদের এখানে, 
বাচ্চাটি খেতে না চাইলে, তাকে বলা হয়, খেয়ে নাও বাবা, না হলে জুজু চলে আসবে। 


শিশুদের মোবাইল আসক্তি

কার্য উদ্ধারই হোক বা যথেষ্ট ধৈর্যের অভাববোধ হোক বা শৈশবের অনির্বচনীয় আচরণ থেকে নিস্কৃতি পেতে আমরা অবিভাবকেরা শিশুর সামনে পেশ করি জোড়ালো বাহানা। যেমন, শিশুটি যাতে অযথা বিরক্ত না করে সেজন্য তার হাতে এখন যত্রতত্র ধরিয়ে দিই স্মার্ট ফোনটি। এখন হামেশাই দেখা যাচ্ছে, স্মার্ট ফোনটি না চালিয়ে দিলে শিশুটি আর ভাতের গ্রাস মুখে তুলছে না। খেতে খেতে সে মোবাইল দেখছে।  তার কেবল আগ্রহ মোবাইল স্ক্রিন জুড়ে, সে কী খাচ্ছে তাতে তার কোনও আগ্রহ নেই! খাদ্যের প্রতি আগ্রহ থেকেই মুখের লালার (স্যালাইভা) ক্ষরণ হয়, যা থেকে খাদ্যের প্রাথমিক হজম ক্রিয়া শুরু হয়,  মুখকে যা রাখে ব্যাকটেরিয়া মুক্ত। কেবল খাওয়ার আগ্রহের দরুন স্যালাইভা ক্ষরণে অনেক কঠিন খাবারও সহজে হজম হয়। সেখানে শিশুটি দিনের পর দিন আগ্রহহীন খাদ্য গ্রহণে কতটা হজমে পৌঁছোবে? সে খাদ্য কতটাইবা পুষ্টি জোগাবে তার শরীরে?
আজকাল মোবাইল অ্যাডিকশন কে বলা হয় ডিজিটাল ডায়েট। আমরা যেমন খাই, মোবাইলটাও একটা ডিজিটাল ডায়েট হয়ে গেছে,  মানুষ খাচ্ছে। মোবাইল ছাড়া আমরাও আর এক পাও চলতে পারি না। নিজের দিদির বৌভাতে গিয়ে রাকেশের দেখি মুড অফ, কোনও আনন্দেই দেখি সে সামিল হতে পারছে না। শেষমেশ জানতে পেরেছিলাম, সে ভুল করে বাড়িতে তার স্মার্ট ফোনটি ফেলে এসেছিল বলেই সে যেন প্রাণহীন, আনন্দহীন! কিশোর কিশোরীরা এখন এই nomophobia-তে ভুগছে। দশ মিনিট ফোন থেকে দূরে গেলেই তাদের মনে হয় পৃথিবী যেন হারিয়ে গেছে। এই উত্তেজনাই হল 'NOMO (NO MOBILE) PHOBIA' ডিজিজ। ফলত আপনি চাইলে যেকোনও বাচ্চাকে মোবাইল ফ্রী করাতে পারবেন না। তাই মোবাইল দেখাবেন, কিন্তু সল্প সময় ধরে।   কেন? মোবাইল দেখতে বসে ওদের কল্পনা শক্তি কমে যায়।  দেখেই যায় কেবল, চিন্তা করে না ওরা। কিন্তু পড়া আর শোনার ক্ষেত্রে চিন্তা ও কল্পনাশক্তির পরিমাণ বাড়ে বহুগুণে। ধরাযাক, একটি পৃষ্ঠায় লেখা আছে, 'এরোপ্লেনটি আকাশের মাঝ বরাবর উড়ে গেলো'। এই বাক্যটি পড়ার পরে পাঠক নিজের ইচ্ছেমতো আকাশকে ভেবে নিতে পারছে, যেখানে তার ইচ্ছেমতো থোকাথোকা মেঘ ফুটে আছে, হয়তাবা চাতক পাখিটি উড়ছিল মাঝ আকাশে তার ঠিক উপর দিয়ে এরোপ্লেনটিকে উড়ে যেতে দেখতে পেল যেন মানস চক্ষে। কিন্তু মোবাইল স্ক্রিনে কেবল তার জন্য নির্ধারিত আকাশ। 
শিশু চায় পূর্ণবয়স্কের মর্যাদা

আগামীকাল একটি শিশু কী হবে তা নিয়ে আমাদের সমাজের অধিকাংশরাই উদ্বিগ্ন, তবুও তো সেই আমরাই ভুলে যাই যে সেই শিশুটি আজকের একজন কেউ। পদে পদে বোঝাই তার গুরুত্ব এখনও কী পরিমাণ মিহি। দেখা গেল একজন পিতা, তাঁর এক বন্ধুর সাথে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত।  সেই আলোচনার মাঝে  তার শিশুটা এসে কিছু বলতে চাইলে, তাকে প্রায়শই বলা হয়, "দেখছো না আমরা বড়রা কথা বলছি, পরে বলো, যাও এখন।" সেই পিতাটি বুঝতেও পারল না তার থেকে শিশুটির কী পরিমান ক্ষতি সাধিত হল। শিশুটি যে কম গুরুত্বের, তার বড় না হওয়ার আফসোসসহ তার মধ্যে তৈরি হল নানান হীনমন্যতা। এ প্রসঙ্গেও কয়েকদিন আগের একটা ঘটনা শোনাই। বাড়ির পাশের এক বৌদি বললেন, 

—'আমার ছেলে তোমার কথা কী সুন্দর শোনে! কই আমাদের কথা তো শোনে না!’

বৌদিটিকে বললাম,

—'দোষ তোমাদেরই, কেননা ওর গুরুত্ব পেতে চাওয়া তোমরাই বাচ্চা বলে ওর আচরণ বা কথাবার্তায় গুরুত্ব দাও না। এই একটু আগে আমি আর বুদ্ধির বাবা গভীর এক আলোচনায় ছিলাম, মাঝে বুদ্ধি এসে মামা বলে ডাকতেই দিলাম আলোচনা থামিয়ে, ওর কথা মন দিয়ে শুনে বললাম, 'ঠিক আছে মা, তাই হবে, আমি এক্ষুনি  যাচ্ছি, বাবার সাথে আগে একটু কথা বলে নিই, তুমি বরং একটু একা একা খেলতে লাগো'। কী অদ্ভুত! আর বিরক্ত না করে একাই খেলতে শুরু করে দিল। তাই বলি কী বৌদি তোমার ওই বাচ্চাটিকে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সমান গুরুত্ব দাও আগে। দেখবে সব যুতে এসে যাবে।

আপনারা অনেকে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, বাচ্চারা বড়দের কথোপকথন গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে, সম্ভবত যা শুনছে তার হয়ত একটি শব্দও বুঝতে পারছে না। তবু শোনে,  কিছু শব্দ ধরে রাখার চেষ্টাও করে, এবং তারা প্রায়ই আনন্দের সাথে কিছু শব্দ পুনরাবৃত্তি করে এই সত্যটি প্রদর্শন করে যা তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা বড়দের নির্দেশবোধক বাক্যে আমল দিতে ইচ্ছুক নয়। ইচ্ছুক বেশি, সেই বড়দের অনুকরণ করতে। শিশুদের মতো মহান অনুকরণকারী এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই, মহান কল্পনাপ্রবণ মনের অধিকারীও নেই। শিশুরা কেবল নির্দোষ এবং কৌতূহলী নয় বরং আশাবাদী,  আনন্দদায়ক, সুখী এবং জিনিয়াসই বটে।

"মানুষ জন্মায় জিনিয়াস হয়ে 
আর মরে ইডিয়ট হয়ে।" 

ঠিকই লিখেছিলেন চার্লস বুকাউস্কি। প্রতিটি শিশুই আসলে জিনিয়াস হয়ে জন্মায়। অথচ আমরা দিনকে দিন ইডিয়ট হয়ে যাওয়া মানুষগুলো একটা শিশুর সাথে আরেক শিশুর তুলনা করে আফসোস পুষি, শিশুটির খারাপ আচরণে তাকে কঠোর শাস্তির বিধান করি। আমাদের মতো এইসব ইডিয়ট অবিভাবকদের প্রতি গ্রীক দার্শনিক ডায়োজিনিস একটা বক্তব্যকে ছুড়ে দিয়েছিলেন সেই সূদুর অতীতে,

"ছাত্র খারাপ আচরণ করলে তার শিক্ষককে চাবকানো হবে না কেন?"

হ্যাঁ, চাবকানো হোক আমাদের, আমরাই দায়ী। এতকাল আমরাই অনুধাবন করতে পারিনি আমাদের শিশুকে। দেখেছি, একটা শিশুকে গুরুত্ব-শ্রদ্ধা-ভালবাসা দিলেই যেখানে মহান চুক্তিতেও সে কী অবলীলায় সম্মতি জানায়, সেখানে কেন জোরপূর্বক আদায়ের নিয়ম? সন্তানের আত্মার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সহানুভূতি, দয়া এবং উদারতার সম্পদ কেউ কেন সহজেই উপলব্ধি করতে পারি না? প্রতিটি সত্যিকারের শিক্ষার প্রচেষ্টা কী সেই সম্পদের দরজা খুলে দেওয়া নয়? আমরা যদি সত্যিই আমাদের বাচ্চাদের সুখী, উৎপাদনশীল, নৈতিক জীবন চাই, আমাদের কী উচিত নয় তাদের আউটডোর খেলার জন্য বেশি সময় দেওয়া? তাদের অনুকরণপ্রবণ মানসিকতার কাছে দুর্দান্ত কিছুর নাগাল পাইয়ে দেওয়া আমাদের কি আশু কর্তব্য নয়? তাদের বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য কল্পনাপ্রবণ মনের সীমানা বাড়াতে কেন তাদের রূপকথা, গল্প শোনাবো না বা পাঠে উৎসাহিত করব না?

আসুন প্রার্থনা করি, বাচ্চাদের মনের ওজন বুঝে মেলামেশায় আমরা যেন সতত সফল হই। ওদের প্রতি আমাদের আরও ধৈর্য বাড়ুক। “ওরা বড় নয়, ওরা যে নিতান্তই শিশু”— ওদের ভেতর এই আক্ষেপের পরিবেশ যেন বারংবার না তৈরি করি, কোনও ভাবেই যেন ওদের হীনমন্যতায় ভোগার কারণ না হই। অনুশাসন যেন আমাদের তার শাসক না বানায়, বন্ধুর ভুল ক্ষমা করা যায়, শাসকের ভুল এক জীবনে ক্ষমা করা যায় না। মোটকথা, ওদের কাছে বিশেষ এক আগ্রহের বিষয় যেন হই আমরা, যেন ওরা আমাদের প্রেমে পড়েছে! একজন প্রেমিক ডেডিকেশানে এসে অনেক বড় বড় চুক্তি (deal) অবলীলায় মেনে নেয় যেমন।  ঠিক তেমনই, দেখবেন, বাচ্চারা আমাদের ইমপ্রেস করতে কত কিছুই করছে তখন! এমন কী যে বাচ্চাটি মোটেও পড়াশুনায় বসতে চায় না, দেখতে পাবো, সেও পড়াশোনায় বসে আমাদের কী ভীষণ ইমপ্রেস  করতে চাইছে তখন!


লেখাটি প্রকাশিত কশেরুক পত্রিকা, শিশু সংখ্যা ১৪৩২


Monday, September 5, 2022

মগের মুলুকীয় স্বপ্নের বয়সের সেইসব ভাষাপাঠের অনেক শিক্ষক অথবা একজন ❑ ঋপণ আর্য

মহম্মদ-বিন-তুঘলকের রাষ্ট্রনীতিতে সবচাইতে চড়া মাপের মগের মুলুক নেমেছিল। এমনকী, ঐতিহাসিক বারনীর মতে, ‘প্রতিদিনই সুলতানের প্রাসাদ থেকে মৃতদেহ বের করা হত। তিনি বিদ্রোহী বাহাউদ্দিনের মাংস রান্না করে তার আত্মীয়দের খেতে বাধ্য করেছিলেন’... ভাবা যায়! বিশ্বের বাজারে হিটলার, ভারতের বাজারে প্রায় দুশো বছর ইংরেজ রাজত্ব, খানসেনা কবলিত বাংলাদেশে ৭১এর আগের অবস্থা, এমন কী মাতৃভাষাতেও চড়েবসেছিল মগের মুলুক। এই চড়েবসাটাকে ভাঙতে পারলেই স্বাধীন। ভাঙতে পারলেই শোক মুখেও ২১শে ফ্রেবুয়ারী হেসে ওঠে। এরূপ প্রতিবেশী নানান অভিজ্ঞতায় প্রতিকার না ভাবেই মগের মুলুককে পেলেও সরাসরি প্রথম সাক্ষাৎ ক্লাস ফাইভে। তখন ক্লাস ফাইভের আগে স্কুলে ইংরাজী আবশ্যিক পাঠ্য ছিল না। যারা বিত্তবান তারাই কেবল ওই বাড়তি সুবিধা নিতে পারত প্রাইভেট স্কুল মারফত। উক্ত বিষয়টায় তখনকার রাজ্য সরকার মগের মুলুক নামিয়েছিল আরকি। ওই ফাইভে অত্তোসব বুঝতাম না। দক্ষিণ নাংলা হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার আগের বছর সে হাইস্কুলের মীরির সাথে প্রাইমারি স্কুলের আমি স্বাধীনতা দিবসে প্রথম এসেছিলাম। মীরি ওদের ক্লাসের ঘরটায় নিয়ে গেছিল। আমরা বাদে পুরোটা ফাঁকা ছিল। মীরি দরজা, জানালার কপাটে, টেবিলে, চেয়ারে, হাইবেঞ্চে লাথি কাষাতে কাষাতে বলছিল, - ‘দেখছিস তো এখানে কত স্বাধীনতা, আমাদের স্কুল কত্ত শক্ত’। আমার ক্লাস ফোরেই জালবুনতে শুরু করেছিল হাইস্কুল।

কিন্তু কই স্বাধীনতা ফাইভে? বিশেষত মুকুল স্যারের ক্লাস, যার চশমা সবসময় নেমে আসতো নাকের ডগায়। চশমা নেমে যাওয়া ফাঁকা জায়গা দিয়ে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছড়িয়ে পড়তো ক্লাসময়। যার উপর স্থির হত সেই দৃষ্টি, সে সব মুখস্ত ভুলে যেত। মুকুল স্যার তখন কাছে ডাকতেন তাকে। ‘ ওহে বালক এদিকে এস। তারপর, পড়িসনি কেনও? কোথায় বাড়ি? বাবার নাম কি? বাবা কী করে? ইত্যাদি অহেতুক প্রশ্নের তালে তালে নির্দিষ্ট দুই জায়গায় (পিঠে ও পাছায়) বেত কষাতে থাকতেন। আমরা গুনতাম। ৪০টা হাইয়েস্ট। যে সেই ৪০ মারটা খেয়েছিল দুদিনের মাথায় ফের তার স্যারের কাছে যাওয়ার তলব এলে মুখফস্কে সে বলে ফেলেছিল,
-পৃথিবীতে স্যার আপনি আমার সবচেয়ে বড় শত্রু!
তারপর থেকে পেটানো বন্ধ না হলেও তাকে আর পেটাতেন না স্যার। যতদিনে বুঝেছিলাম, স্যার তাদেরই পেটাতেন যারা তাকে ভয় পেত, সাহস থাকলেই পার পাওয়া যায় । ততদিনে মগের মুলুক ক্লাসটারও সন্ধান পেয়েগেছিলাম। ফাইভে তখন নিয়মিত চতুর্থ পিরিয়ডের পরে ছুটি হত। চতুর্থ পিরিয়ডে কুমুদ স্যার ইতিহাস পড়াতেন। এমনিতে স্যার ছিলেন শান্ত। কিন্তু ক্লাসে শব্দ হলেই ক্ষেপে যেতেন। তখন খুব পেটাতেন শব্দকারীকে। ক্লাসে আমাদের আগের দিনের পড়া মুখস্ত লিখতে হত। দুপাতার কম লিখলে হবে না। যে আগে দেখাবে তার ছুটি। স্যার পড়েও দেখতেন না সে সব জমা পড়া খাতা, অথচ টিকচিহ্ন বসাতেন আর ছুটি দিতেন। আমরা তাই উত্তরের খাতায় প্রথম দু-তিন লাইন পড়া লিখতাম তারপর লিখতাম মুখস্ত হয়ে যাওয়া গান, কবিতা আর ইচ্ছাখুশির রচনা। আমার প্রথম ব্যাক্তিগত লেখালেখির ভাষাপাঠ হয়ত ওই মগের মুলুকের ক্লাস থেকেই। কুমদস্যার নাকি বিঘাত মেপে নাম্বার দিতেন পরীক্ষার খাতায়, অতীতে এক ছাত্র নাকি তার কাছে ১০০-র পরীক্ষায় ১১০ পেয়েছিল। কথাগুলো অমুলক লাগেনি। কুমুদস্যারের পুরো বিচার ব্যাবস্থাই ছিল মগের মুলুক। অথচ স্কুলে ক্লাসের বাইরে ছাত্রদের গণ্ডগোলের বিচারের ভার ছিল তার উপর। তার বিচার ব্যবস্থায় অন্যতম রুল ছিল, যে দুজন বা তিনজনকে নিয়ে বিচার তাদের প্রত্যেকের ব্যাক্তিগত অভিযোগ আলাদা আলাদা ভাবে শোনা হবে, কারো আভিযোগের ভিতর অন্য কোনো অভিযোগকারী কথা বলে ফেল্লেই তখন সেই অন্য অভিযোগকারীকে ক্যালান দিয়ে বিচার শেষ। আসলে কুমুদস্যার শাস্তিদানের সময় তুঘলকের মতোই অপরাধের গুরুত্বকে বিবেচনা করতেন না। তখন বাংলাদেশ থেকে বড় বড় ছেলেরা এসে এইট-নাইনে ভর্তি হত। কিন্তু বড় তারা গতরে, মোটেও চটপটে নয়, আদপ-কায়দা, কথাবলার ধরন যেনও কেমন ন্যতানো । আমরা স্কুলের দোতালার বারান্দা থেকে ওদের লক্ষ্য করে নিচে ঢিল ছুড়তাম। লেগেও যেত দুয়েকটা। কয়েক দিনের মাথায় তাড়া করে তারা ঠিক ধরেও ফেলল। কুমুদস্যার আগে তাদের কথা শুনলেন। আমি চুপচাপ। স্যার যখন আমাকে শুনতে চাইল, কেনও আমি ওদের রোজ ঢিল ছুড়ি? আমি হাত কচলে কাচা মিথ্যেকথা বলতে শুরু করেছিলাম, “ স্যার রোজ না, আজকে যখন সাইকেল চালিয়ে স্কুলে ঢুকছিলাম তখন ওই দাদাটা আমাকে থামিয়ে বলেছিল, সাইকেল নাকি তার গায়ে লেগেছে, তাই আমাকে ডান কানজুড়ে একটা চড় মেরেছে। স্যার, কানটা এখনও টনটন করে যাচ্ছে। তাই...’ আর এগতে হল না। এতটা টাটকা মিথ্যে কথা বাংলাদেশ থেকে আসা সরলসোজা ক্লাস এইটের দাদাটার সহ্য হয়নি। সে চিৎকার করে বলতে শুরু করেছিল, ‘স্যার ও সব মিথ্যে বলছে।’ ব্যাস আর যায় কোথায়। বিচার শেষ। কুমুদস্যারের তুঘলকি আইনে দাদাটির ক্যালান খাওয়া বেশ উপভোগ করেছিলাম বটে কিন্তু সাবধান হইনি। ফলত কয়েক দিনের মাথায় ফের ঢিল ছোড়া জারি হল। এবার তারা আর কুমুদ স্যারের কাছে নিয়ে গেল না। তারা বলল, চল তোকে পালসারে চাপাবো! নিয়ে গেল সহ প্রধান শিক্ষক নারায়ণ পালের কাছে। তাদের কাছে স্যার হয়ত আগেই শুনেছিলেন, তাই আমার সামনে আর তিনি নতুন করে কিছু শুনলেন না। কেবল তাদের একজনকে একটা নতুন ব্লেড কিনে নিয়ে আসার দায়িত্ব দিলেন। আমার ভেতর শুকিয়ে কাঠ। ব্লেড দিয়ে কী করবেন স্যার?! স্যার আমাকে একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বসতে বললেন। দশ...পনের...কুড়ি মিনিট যায় সেই দাদাটিও ব্লেড কিনে ফিরছে না! আর স্যারও আমাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলছেন না! আমার কান্না পেয়ে গেছিল। এবার স্যার এগিয়ে এলেন, পিঠে হাত বুলিয়ে মনে করিয়ে দিলেন বিদ্যাসাগরের বোধদয়ের ঢিল ছোড়ার সেই গল্পটা। আরও বললেন, আমার ঢিল ছোড়ায় যদি ওই দাদাটির চোখ নষ্ট হয়ে যেত তাহলে আমাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যেত, ডাক্তার আমার চোখ দুটো তুলে সেই দাদাটিকে পড়িয়ে দিত। তখন কোনও আয়নাতেও আমি আমাকে দেখতে পেতাম না! সেদিন সেই পুরনো গল্পকে ভাঙিয়ে কী অমাইক মন্ত্রের মতো ভাষাপাঠ দিয়েছিলেন। 

সেই প্রথম পালস্যারকে বিস্তারে পেলেও ফাইভে তার ক্লাস পাইনি। সিক্সে ক্লাস পেলেও কোনো নিয়মিত রুটিনে পাইনি। সেভেনে পেয়েছিলাম বাংলার ক্লাসে। তার আগে সিক্সের এক টিফিন পার করা দুপুরে স্কুলের বাইরের রাস্তায় ‘বিচিত্রা’ দোকানের সামনের খেলা শেষ না হওয়া জনা কয়েক আমরা। হঠাৎ বুঝতে না দিয়ে বেত হাতে পেছনে উদয় হলেন পালস্যার। ধরেও ফেললেন আমার ডানা। বাকি সব বন্ধুগুলো স্কুল মুখো ধাঁ...। স্যার বেত উচু করতেই বিষন্ন আমি বলেছিলাম, ‘স্যার, আমার খুব খিদে পেয়েছে’। স্যার হাত ধরে বটতলার মিষ্টির দোকানটায় নিয়ে গেছিলেন। আমি বাড়ি থেকে টিফিন এনেছি কিনা জানতেও চাইলেন না। আমার টিফিন তৃপ্তি তার মুখে ফুটে উঠতে দেখেছিলাম। আমাকে নিয়ে তার স্কুলে ফেরায় কেমন একটা জড়িয়ে থাকা ছিল, বেতটাকে আর বদমেজাজি মনে হচ্ছিল না।

বেত স্যারের সঙ্গে এলেও ক্লাসে কোনো বেতবাজি ছিল না। রসিক মানুষ স্যার দারুন গলা বাজাতেন যা পুরো ক্লাসটাকেই চুপ রাখতো। তখন স্যার আমাদের পুরো অঞ্চলটার ভাষার উপর দিয়ে চোষে বেড়াচ্ছেন ভাষা খুঁজতে। নাংলার বিলের ইতিহাস লিখতে গিয়ে আমাদের গ্রামেরও ইতিহাস লিখে ফেলেছিলেন। আমার বাবা-দাদারাও জানতেন না, নাঙলার বিল অতীতের ব্যবসা বানিজ্যের সেই জলপথ, যা পদ্মানদী নামে উত্তর বঙ্গের সাথে যোগাযোগ রাখতো। রুদ্রপুরের উপর দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত সারবেঁধে প্রসারিত জোড়া পুকুরগুলো আসলে সেই পদ্মার শাখানদী, নাম ছিল সুতানটী। আমার ইতিহাস বই জানতো না, আকবর সেনাপতি মানসিংহ যোশর রাজ প্রতাপাদিত্যের কাছে জলপথে দুবার পরাস্ত হয়ে যে স্থলপথে যোশরে পৌঁছান, সে পথ রুদ্রপুরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গৌরবঙ্গ রোড। বইটা প্রকাশ পাবার পরে বিচিত্রায় পাওয়াও যেত দেখতাম। কিন্তু আমার ওই বয়সটা কমিক্স সংগ্রহে আরও বেশি উৎসাহী ছিল। অমনি মনেপড়ে গেলো, আমি আর মানস প্রতি কমিক্স দুটাকায় তিনদিনের মেয়াদে স্কুলে ভাড়া খাটাতাম । নতুন কমিক্স কেনার জন্য বাবার কাছে ঘ্যান ঘ্যান উধাওগুলো কী দারুন হাততালির মতো উপভোগ করতাম! সেই স্কুলবেলার অনেক বাদে ‘পুরতত্ত্বে নাংলা বিলের এপার ওপার’ বইটি পড়তে গিয়ে স্যার আমার প্রপিতামহ হয়ে উঠেছিলেন। অবশ্য তার প্রতি শ্রদ্ধা স্কুলবেলাতেই আমাকে পেয়েবসেছিল।

শ্রদ্ধার একটা ভয় আছে, বিবেচনা বোধ আছে। তাই আমার দুষ্টুমিরা স্যারকে এড়িয়ে চলত । ক্লাস এইটের স্কুলস্পোর্টের দিন হাতে একটা কালো রবারের বালা পড়ে এসেছিলাম স্কুলবন্ধুদের দেখাবো বলে । সেদিনের এদিক-সেদিক ছুটোছুটির ভেতর পালস্যারের মুখোমুখি হতেই দ্রুত হাতটাকে পেছনে লুকিয়ে নিলেও তার চোখ এড়াতে পারিনি। কড়া সুরে তিনি দেখতে চাইলে হাতটা সামনে এনে ‘খুলে ফেলব স্যার’ বলেই খুলতে যাচ্ছিলাম। তিনি বাঁধা দিয়ে নরম সুরে বললেন,’আমি কি বারন করেছি? আর আমার কথায় এখন খুল্লেও তুমি ফের পড়বে। তারচেয়ে তুমি ওটা পড়েই থাকো । তোমার যেদিন মনে হবে, ওটা তোমার যোগ্য না, একমাত্র সেদিনই খুলবে’। সেদিন কী বুঝেছিলাম ঠিকঠাক মনে নেই, তবে স্যারের চলে যাওয়ার পরেও বালাটা পড়ে থাকাতে খুউব অস্বস্তি হচ্ছিল।

আমার ক্লাস নাইনেই পালবাবু স্কুল ছাড়েন। সেই ছেড়ে যাওয়ার মনখারাপ মনে নেই। তবে এখনো তার সাথে দেখা হলেই স্কুলবেলার সেই ‘এড়িয়ে চলা’রা মনেপড়ে সান্তনা খোঁজে। বুঝতে পারি, তখন সময় হন্যে হয়ে আমার পেছন ঘুরতো। এখন আমি সময়ের পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে হাতড়ে বেড়াই সাদাজামা-নীলপ্যান্টের সেইসব দৈনন্দিন ভাষাপাঠ, যারা আমার মগের মুলুক তুলে এনে বাথরুমে সীমাবদ্ধ রাখতে শিখিয়েছিল। আমার দিনের অপ্রাপ্তমনষ্ক মগের মুলুক এখনও বাথরুমে কাটায়।


Monday, August 22, 2022

জানালা, নিভৃত উপার্জন... ❑ ঋপণ আর্য

ছেলেবেলায় ভাবতাম, সবচেয়ে বড় জানালা বুঝি জেলখানায় থাকে। সিনেমায় দেখেছিলাম, মানুষের পরিবারে বেড়ে ওঠা গোরিলাটা কয়েদ হবার পর সেলের দেওয়ালে বেড়েওঠার প্রিয় সঙ্গী সেই জানালাটা এঁকেছিল, যে জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তার সারাবেলার সজাগ দেখে আনন্দে কাটাতো। সেদিন তার জানালার জন্যে আমার ভেতরটাও হু হু করেছিল।

আদতে জানালার ভেতরের মানুষটি কখনোসখনো জানালা দিয়ে তাকিয়ে থেকে ঘটমান কোনও দৃশ্য দ্যাখে না, এমনকী বাইরের জগৎটাও দ্যাখে না! কী দেখে সে?...স্রেফ নিজেকে দ্যাখে। তখন তার হৃদয়ের ছবিটি ফুটে ওঠে জানালার ঠিক বাইরে।

জানালা, বাইরেটা প্রকাশ্যে রেখে ভেতরকে খানিক অপ্রকাশ্যে রাখে বরাবর। একদিন টালিগঞ্জের বাসায়, তিন তলার ছাদের ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল পাশের দোতলার ছাদে শীতের রোদে চুল শুকোচ্ছে ছাদওয়ালী। আমি তার গান দেখতে পাচ্ছিলাম। ছাদওয়ালী নামটা জ্যাঠতুতো ভাই অনুপের দেওয়া। বিগত কয়েক মাস ধরে অনুপ ছাদওয়ালীর ‘ছুটফুটন্ত’ দেখে আসছিল। ছাদওয়ালী জানে না তার ব্যক্তিগত খেয়াল এভাবে বেঘোরে চুরি যাচ্ছে। জানালা নির্বিকার, যার শুধু নির্দিষ্ট আকার নিয়ে কেবল থেমে থাকা আছে। কিন্তু জানালা নির্ভর মানুষদের মনোবিকারে পাল্টিখাওয়ার কোনও থেমে থাকা নেই। তাই হয়ত যাকেই জানালা ভাবতে শুরু করা হয় প্রায়ই দেখা যায়,  সে হয় দরজা না হলে ঘুলঘুলি হয়ে যাচ্ছে!!

জানালা মানে কেবল কোনও বিশেষ পরিস্থিতির দরজা নয়, প্রকৃতির যাতায়াত নয়, অমল ও দইওয়ালার মতো আরও কত কিছু। বাংলায় একটা জ্যান্ত প্রবাদ আছে, দেওয়ালেরও কান আছে। জানালার বাইরে থেকে উঁকির ইচ্ছেটা যখন প্রবল হয়, ঠিক তখনই দেওয়ালের কান জানালা হয়ে ফোটে । তখন ক্লাস ফাইভ, রুদ্রপুর বাজারের পাশে সবিতানেম্বরের বাগানওয়ালা মাঠে ছুটির দুপুরে ক্রিকেট খেলতাম। কোনও একদিন লেগে ফিল্ডিং দিচ্ছিলাম। উজ্জলের বলে ঘন্টু হাকিয়ে ছয় মেরেছে। বাগান পেরিয়ে হারিয়ে গেছে বল। অনেকের মতো আমিও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আর পাচ্ছিলাম না বলেই খুঁজতে খুঁজতে দুলাল দের ঘর পর্যন্ত পৌঁছতেই ঘরের ভেতরের একটা হাল্কা গোঙানি জানালা দিয়ে ভেসে আসছিল। আমি জানালায় উঁকি দিতেই সদ্যবিবাহিত দুলাল দে বিষম খাওয়ার ঢঙে বলল, ‘তুই রবীনদার ছেলে না? দাঁড়া তোর বাবাকে বলে দিচ্ছি’... মনে আছে, অজ্ঞাত একটা অপরাধের ভয়ে, বাজার ফেরত বাবার হাতে মার খাওয়ার ভয়ে কেটেছিল কয়েকটাদিন। আর দুলালকাকারাও জানালাটাকে নিজেদের ইচ্ছেয় নিয়ে গেছিল, পর্দা লাগিয়ে।

জানালার নিজস্ব কোনও ইচ্ছে নেই। জানালা সান্নিধ্যদের ইচ্ছে আছে নানান। হাবড়া হাইস্কুলের ক্লাস এইটের A সেকশান ছিল দোতালায়, নীচের রাস্তার গা বরাবর। রাস্তার ওপাশে গার্লসস্কুলের পাঁচিল আর পাঁচিল অতিক্রম করা গার্লসস্কুলের দোতালার জানালারা। টিফিন পিরিওডে ক্লাসমেট রাজীবের দুর্ধর্ষ ইচ্ছাপূরণ তার পাশে দাঁড়িয়ে ক্লাসের অধিকাংশের উপভোগের। আক্কেল ভোগে গেলে যা হয়। রাজীব জানালা দিয়ে গার্লস স্কুলের জানালা তাক করে হিসি করতো। সে হিসি নীচের মাঝ রাস্তাও অতিক্রম করতো না। তবুও তার সেই ক্যালমা বহুদিনের। আর এই বহুদিনের একদিনে সে পাশ ফিরে দেখেছিল আমরা কেউ নেই, ক্লাসরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন সহপ্রধান শিক্ষক সুবলবাবু। বীভৎস জান্তব লাগছিল স্যারকে। পেটাতে পেটাতে নিয়ে গেছিলেন। তারপর থেকে স্কুলজীবনে রাজীবের সাথে দেখা হয়নি। দেখা হয়েছিল বহুদিন পরে। শুনে অবাক হয়েছিলাম, তার নাকি গ্রিলের দোকান! তাহলে তো হরেক মাপের জানালা তৈরি হয় তার কারখানায়!! তার দ্বারা জানালার সৎ না অসৎ ব্যবহারে নিয়তি তাকে এই জীবিকা দিল?! আমার ঘরের ছ’ফুট বাই ছ’ফুটের একমাত্র জানালায় বসে আছে রাজীবের কারখানার গ্রিল। এটা ধরে নেওয়া ঠিক না / জানালার গ্রিলে রদ্দুর বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। জানালা জানে রদ্দুর, মেঘ, বৃষ্টির ছাট একনাগারে টিকে থাকার নয়। কিন্তু যে জানালা কখনও রদ্দুর দেখেনি তার  কাছে মেঘের খবর আসবে কীভাবে? ফলত সে  জানালার ভেতরের দিকটা স্যাঁতসেঁতে থাকে আজীবন। দরজা ভেঙে ফেলার আগেই রিপারা হোস্টেলের ওই রকম একটা স্যাঁতসেঁতে জানালা দিয়ে প্রথম দেখেছিল, মৌ-এর শরীর সিলিং ফ্যানে ঝুলছে!!

আমার ঘরের জানালায় সে স্যাঁতসেঁতে নেই, সব মরশুমই আসে। বছরের দুটো ঈদে অশ্বত্থ তলায় হাজার মানুষ নামাজ পড়তে বসে। আমি জানালা দিয়ে সমবেত প্রার্থনা দেখি। ঈদের সুবাদে জানার বাইরের রাস্তায় মাত্র দু’ঘন্টার মেলা বসে। জানালা দিয়ে তার গন্ধ আসে, আমিন-সাবির-কবির-মিজানুরদের ঈদের নিমন্ত্রন আসে। পিচ  পড়বে বলে পুরনো রাস্তাকে আকার ও অবস্থান বদলাতে দেখি, দুপুরের রোদে না হাঁপানো তুহিনের নতুন শেখা সাইকেলিং, সমীরনের নিখুত মার্বেলগুলির টিপ, ইদানিং রাস্তার গা ঘেঁষে  উদ্দেশ্য না জানা একটা পাতাল ঘরকে তৈরি হতে দেখি। ভোকাট্টা ঘুড়িকে অশ্বত্থ গাছের মটকায় ঝুলতে দেখি, হাওয়া এলে  অশ্বত্থকে সে ঘুড়ি ওড়াতেও দেখি।  সবই জানালার সুবাদে। জানালা আমার নিভৃত উপার্জন। জানালার সুবাদে আমাকে টিমু, চন্দন, শুভ দেখে ফেললেই বলে ওঠে, ‘এ কাকা আসবো?’ ওদের ঘরে ডাকি। ওরা গেম খেলার চাইতে গেম খেলা দেখতে বেশি উৎসাহী। ওদের উৎসাহে আমার ঘর ভরে ওঠে। জানালার ঝাপ নামানো থাকলে অবশ্য অশ্বত্থের তলা ওদের ডেকে নেয়। জানালার ঝাপ নামানো থাকলে সকাল ১১টা’কেও আমার ঘরে গভীর রাতের মতো লাগে। আর ঝাপ খুল্লেই মনে হয়, জানালা দিয়ে পৃথিবী ঘরের ভেতর ঢুকছে আর আমার ঘর ক্রমশ বড়ো হয়ে যাচ্ছে।


 

Tuesday, August 16, 2022

ইমোজি সম্পর্কে দু-চার কথা; যা আমি ভাবি ❑ ঋপণ আর্য

খুবই ছেলেবেলা, যখন ডিডি7-এ রোববার চারটে নাগাদ সিনেমা হত। একদিন প্রসেনজিতের কোনও সিনামা দেখছি, বাবাও পাশে ছিলেন। দেখি, প্রসেনজিৎ ট্রেন থেকে একটা ডিগবাজি খাওয়া জাম্প মারলেন, আর মেরেছেন তো মেরেছেন; একটুও না টলে কী সুন্দর বন্ধুর জমিনে দাঁড়িয়ে গেলেন! খুব অবাক হয়ে বাবাকে বললাম, এত সুন্দর কী ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল? বাবা বললেন, নায়করা এসব পারে। শুনে নায়ক হওয়ার বাসনা জেগেছিল কি না মনে নেই। অত অত অবাক হয়ত হতাম না যদি জানতাম গতিজাড্যের কথা, যদি জানতাম 'সিনেমায় জীবন থাকতে পারে, কিন্তু জীবন তো সিনেমা না।' বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের অবাক বা বিস্মিত হওয়ার পরিধি, ব্যথা পাবার পরিধি, পাপ বোধের পরিধি হয়ত সংকুচিত হতে শুরু করে, একপেশে হতে শুরু করে। নইলে ওইসব সময়ের পাশাপাশিতে যে সব বিষয়ে অবাক হতাম তা তো আর হই না, নিদেনপক্ষে একটা পিঁপড়ে মেরে যে ব্যথাবোধ ও পাপবোধ জাগত তা তো আর জাগে না! তবু টের পাই, আর পাঁচজন সমবয়সী গড় মানুষের চেয়ে আমি একটু আলাদা, ধরনধারণে যেন আরও কম বয়সী, বিস্ময় বেশি আর আবেগ তো নিশ্চিত মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বা তারও কম বয়সী কোনও ছেলের। এইজন্যই হয়ত যে কোনও শিশুর আমাকে তার সহজেই সমবয়সী ভেবে নিয়ে আপজন হয়ে উঠতে সময় নেয় না। আর এসবের সাথে আমি টিউওবলাইটও (এখনকার এলিডি টিউব নয়)। ওই যে সুইচ টিপলেই সঙ্গে সঙ্গে জ্বলত না, তেমনই। তাই আমার হাসি তিন প্রকারের। প্রথমে না-বুঝে সকলের সঙ্গে হেসে উঠি, তারপর বিষয়টা বুঝে হাসি, আর শেষে প্রথমে যে না বুঝে হেসেছিলাম; সেটার কথা ভেবেই আরেকবার হাসি। এমনই ট্যালা। কতকত বার যে উপহাসের পাত্র হয়েছি, বইমেলার মাঠে কারো নিদারুণ ধমকে প্রকাশ্যে হুহু করে কেঁদে ফেলেছি, এইফেসবুকেই এমন অনেক বন্ধু আছে সে ঘটনা সহজেই মনে করতে পারবে। স্প্যানিশ কবি বিওলেতা মেদিনা সেদিন আমাকে দেখে তার একটি বইতে স্প্যানিশ ভাষায় লিখে দিয়েছিলেন,—
" ছেলেটি কাঁদছিল, 
কেননা সে হাসতে জানে"

নানান ক্ষেত্রে আমার কম বোঝা থেকে গেছে বলেই হয়ত এখনও ঠিকঠাক সামলে উঠতে পারি না নিজেকে। নইলে '২৪ ঘন্টা' চ্যানেলে সার বেঁধে যশোর রোডের হাত-পা কাটা গাছগুলো দেখে কেন এত লাউড কেঁদে ফেলবো? চোখ বুজে কেন ভেবে ফেলবো, দু-আড়াইশো বছর বয়সের সাড়ে চার হাজার গাছ পরপর দাঁড়িয়ে বলছে; 'এই দেখো আমরা কী সুবিশাল অরণ্য!' সে কী যে আকুলতা, সে কী যে কান্নার ঢেউ! মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে, এই গন মাধ্যমে ডাক দিয়ে; শতশত মানুষের সারা পেয়ে; প্রাথমিক অবস্থায় পৌঁছে যখন দেখি; আমরা মাত্র দশ জন! গাছগুলোকে বাঁচাতে কেন ফের গনমাধ্যমে এসে ভিক্ষে চাইছিলাম, কেন প্রদর্শন করেছিলাম; 'দেখো আমারা এই জনা দশেক ওই গাছগুলোর মতো কত অসহায়, কেন তোমরা সারা দিয়ে কথা রাখোনি?' ওইসব কথা হয়ত অনেকের আতে লেগেছিল। পরের সপ্তাহে জমায়েতে প্রায় পাঁচশো জন। আসতে লাগলো অজস্র মিডিয়ার কভারেজ, অনেক সেলিব্রিটি।  আমি লিডিংয়ের কী বুঝি? পার্টিফার্টি করা কোনও সমাজ সংস্কারকও তো নই।  যে কমিটি তৈরি হল, হলাম না তার কনভেনার, যাদের অ্যাক্টিভিটি ভাল লেগেছিল প্রাথমিক, তাদেরই সাজেস্ট করলাম ওইসব পদে। ভেবেছিলাম, আমার কাজ লেখালেখি, আমার কাজ ডাকাডাকির। তবু আর পাঁচজন সাধারণ আন্দোলনকারীর মতোই সঙ্গে ছিলাম শারিরীক, চাইতাম না গাছ বাঁচাও আন্দোলন কোনও পার্টির ব্যানার পাক, গাছের চেয়ে কোনও মানুষ বা কমিটি বড় হোক, আমি নয় আমরার প্রতিষ্ঠা হোক, গাছের আমারা, কাছের আমরা। কিন্তু একসময় যখন দেখলাম 'গাছ বাঁচাও'-এর ব্যানার চলে যাচ্ছে ভাঙ্গুর আন্দোলনে, যখন দেখলাম সেই আন্দোলনের প্রথম দিকের একদিনে একটি ছেলে একাই গাছ কাটার নীরব প্রতিবাদ করতে করতে বনগাঁ থেকে হেঁটে হেঁটে পৌঁছায় হাবড়ায়; আমার বাড়ি। সেই রাহুল; কমিটির ছেলেদের কাছে কতকত দিন যাচ্ছেতাই রকমের অপমান হয়েও থেকে যেতে চেয়েছিল, শেষমেশ থাকতে পারেনি। ওদের পাশ থেকে সেদিন আমিও মানসিক ভাবে সরে এসেছিলাম, তবু তারপরেও তো গাছগুলোর কথা ভেবে ফের বড় বড় লিফলেট লিখে দিয়েছি কতদিন, লিখেছি কত কত ট্যাগ লাইন,  "যশোর রোডের গাছ বাঁচাও/ ডাক এসেছে পা মেলাও"। যাই করুক তারা, তাদের প্রতি ভালবাসা আছে এখনও জীবন্ত, ঘটনার দুঃখ থাকলেও তাদের প্রতি ক্ষোভ নেই কোনও, তারা ছুটোছুটিতে থেকে গেছিল বলেই না; সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গাছগুলো এখনও বেঁচে আছে।

এমনই ট্যালা, এক কথার প্রসঙ্গে অন্য কথায় ঢুকে যাই। যা হোক যে কথা বলছিলাম, আমি সেই টিউব লাইট, যে কোনও কোনও সময়ে এই ফেসবুকে কারও কারও কমেন্টের রিপ্লাইয়ে কথা খুঁজে পাই না। যারা একটু কাছের তারা জানে; তাদের কমেন্টে কেমন বিভোর থেকে রিপ্লাইয়ে বহু পরে যাই। কিন্তু ফেসবুকে এমন মানুষজন তো আমার সবাই নয়, তাই নাগাল হারাতে পারে ভেবে কোনও পোস্টে শুধু ইমোজি কমেন্ট করি। আজও তেমনই এক বর্ষীয়ান সাহিত্যিকের একটি ছবিতে কমেন্ট করেছিলাম; পরপর চারটে বিষ্ময় বাচক চিহ্ন বা তিনটে প্রশ্ন বাচক চিহ্ন সাইজের নাদান; আপ্লুত ভালবাসা বাচক ইমোজি। তার উত্তরে তিনি যা লিখলেন এবং তার প্রতুত্তরে আমি যা লিখলাম হুবহু তুলে দিলাম।

তিনিঃ "বলার কথা মুখের ভাষায় বলাই কি ভালো না? ছাঁচে ঢালা একঘেয়ে ছবি বা স্টিকার বা ইমোজি দিয়ে মন্তব্য বাঞ্ছনীয় নয়। সময়ের অভাব হলে মন্তব্য না করাই তো ভালো।"

আমিঃ "সেটা হয়ত সার্বিক হিসাবে ঠিকই বলেছেন। কিন্তু 'ভালো লাগলো'-এর চেয়ে কখনও কখনও এই ছোটো খাটো ইমোজি অনেক বেশি বাঙ্ময় হয়ে ওঠে আমার কাছে। বিস্ময়বোধক চিহ্ন যেমন আছে; তদরূপ 'ভালো লাগার' আপ্লুত বাচক চিহ্ন তো নেই কোনও, তাই করেই যখন ফেলেছি মন্তব্যটি;  এই বেলায় তারই চিহ্ন হিসাবে গ্রহণ করুন। পরের বেলায় আপনার ক্ষেত্রে মন্তব্যের আগে বিষয়টি নিশ্চিত পূর্ণ বাক্যে মাথায় রাখবো। ভাল থাকবেন। শারিরীক সুস্থতা কামনা করি।"

হয়ত আমি রিপ্লাই করতাম না। "দাদা, ভুল হয়ে গেছে" বলে এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু যখন মনে হল, তার দৃষ্টিভঙ্গির সাপেক্ষে তাকে খুব বিরক্ত করেছি, আমার ভাল লাগা বোধ তাকে খারাপ লাগা দিয়েছে, তখন আমার দৃষ্টিভঙ্গিটা খোলসা করে জানাতেই তো পারি। তাই লিখেছিলাম।

আজ সকালেই দেখি, বোন প্রফাইল পিকচার বদলেছে। ছবিটিতে  পরী-Prabirদার মাঝে বুদ্ধি বসে আছে। 

কমেন্ট করলাম, "🌿❤️🌿"

এক বন্ধু দেখি এসে লাভ রিয়াক্ট করে গেছে। সে নিশ্চিত বুঝেছিল, দুই সবুজ প্রিয়জনের মাঝে আমার তুমুল ভালবাসা বসে আছে। বা, এরকম গোছেরই অন্যকোনও উপমা ভেবে ভালবাসা জানিয়েছিল কমেন্টটিকে। আমি ভাষায় লিখলে ওই ইমোজিগুলোর মতো অত ভাল কি লিখতে পারতাম? 

আজ দুপুরেই হোয়াটসঅ্যাপে কথা হচ্ছিল কুন্তলদার  সাথে। তার একটা কথার তুমুল সমর্থনে আমি ধুকপুকানি হার্টবিট পাঠিয়েছিলাম, ওই যাকে মনে হয় চলমান বা প্রবাহমান একটা ভালবাসাকে পাঠানো, যার থেমে থাকা নেই। যদি কুন্তলদা মুখোমুখি থাকতো, তখন তার ওই  কথার প্রতুত্তরের আমার উজ্জ্বল সমর্থনের মুখটি দেখতে পেত, সেটা কী ইমোজি নয়? সে কি বুঝে যেত না; আমি যদি কোনও কিছু নাও বলতাম?

এই যে কতকত ইমোজি আছে, ওদের আমার টাইপে কথাবলার প্রসঙ্গে কবিতাই তো লাগে। এক একটা ইমোজিকে প্রসঙ্গ বিশেষে এক একটা আস্ত কবিতা। কবিতার প্রসঙ্গ এল যেই মনে হল, উদাহরণই ভাল ব্যাখ্যা হতে পারে।  একদিন শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে হাবড়ায় ফিরছি, সঙ্গে বন্ধু অভিজিৎ। দু'জনেই জানালার কাছে, দুই বেঞ্চে এবং মুখোমুখি। বিধাননগর ছাড়তেই ভিড় বাড়ল।  আমার আর তার কথার মাঝে একজন ভদ্রলোক বারবার এসে দাঁড়াচ্ছিলেন। কথা বলার সময় তার সাইড দিয়ে মুখ বের করে কথা বলতে হচ্ছিল। আচ্ছা, কথা বলার সময় মুখ দেখাটা কি খুব জরুরি? ওই ট্রেনের আলোয় মুখখানি আসলেই যে জীবন্ত ইমোজি বুঝিনি তখন, এখন প্রসঙ্গ বিশেষে মনে হল। কিন্তু এটাও সত্যি যে; সেদিন সেই মুহূর্তে  শমীকদা একটি কবিতাকে প্রমাণ হতে দেখেছিলাম,— 

     লাইটা 
     জ্বেলে দাও 
     কথাগুলো দেখতে পাচ্ছি না।

🌿

Friday, May 27, 2022

মিথ্যেকথা ফেয়ার করতে বসে ❑ ঋপণ আর্য

ছেলেবেলায় একবার ‘ঘোড়ার ডিম’ দেখার শখ বাবাকে জানিয়েছিলাম। বাবা বাজার থেকে সেদিনই একটা কুমড়ো কিনেছিল। বলেছিল, ঘোড়ার ডিমটা নাকি সেই কুমড়োর মধ্যেই আছে। হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলাম, কই আগে তো কোনো কুমড়োতে দেখিনি। বাবা বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে বলেছিলেন, সব কুমুড়োতে থাকে না রে। সেদিনভর কত কতবার যে কুমড়োটা কাটতে তাগাদা দিয়েছিলাম। যতক্ষণ পর্যন্ত কুমড়োটা কাটেনি, ততক্ষণ পর্যন্ত ঘোড়ার ডিমের সাইজ, রং ও তার অবাক আমার ভেতর আনন্দময় ভাবনায় ছিল। সত্যিটা দেখার পরে ভাবনারা স্থির হলো... বেকুফ হলো... বোবা হলো।

আসলে সত্যির কোনো বানানো ব্যাপার নেই, যেমন খুশি সাজো নেই, রোদ বা রঙের চড়ে বসা নেই, কাসুন্দি নেই, কুয়াশা মাখানো নেই, পরিণামহীনতা নেই। কিন্তু মিথ্যের এসব আছে। মিথ্যে তাই সত্যির মতো একঘেয়ে নয়।

জীবনে যা হতে চেয়েও, বোঝাতে চেয়েও পারিনি, সেই সব হোঁচট খাওয়াদের মিথ্যে এসে একলহমায় জিতিয়ে দিল। এখান থেকে এখনো দিব্বি দেখা যাচ্ছে, সুখেনের বৌকে কেউ বোঝাতে পারছে না এক পাড়াভর্তি সংশয়, তার শাখা-সিঁদুর সুখেনের পাঁচ বছরের অনুপস্থিতিকে মিথ্যেই প্রতিরাতে সান্ত্বনা দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

মিথ্যের অভ্যাস একটা গোটা মানুষকে খেয়ে ফেলে, গোটা রাষ্ট্রকে খেয়ে ফেলে। যেভাবে জেহাদের নামে দক্ষিণী দুনিয়াকে তিলেতিলে খেয়ে ফেলেছে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী সম্প্রদায়। যে মানুষটা রাষ্ট্রীয়/ধর্মীয়/আর্থিক ক্ষমতায় সমৃদ্ধ, তিনি মিথ্যেয় জড়ালে তার মিথ্যেরা নাদুস-নুদুস সেই কালোমিথ্যে, যার কখনো সখনো অমরত্বও জুটে যায়। যেভাবে যুধিষ্ঠিরের মুখে ‘অশ্বত্থামা হত’ অমরত্ব পেয়েছে, মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাও পিছিয়ে নেই।

তেমনি আবার যে ম্যাজিশিয়ান নিছক আনন্দদানেই মিথ্যে খরচ করে চলেছেন নিয়ত, তার মিথ্যেকে আমি সাদামিথ্যে বলব। কেননা এই মিথ্যে কারো ক্ষতিসাধন তো করে না। আমি তাই সেই ম্যাজিশিয়ান সেজে চারপাশের হাসিগুলোকে আরও চওড়া দেখতে চাই, দুঃখগুলোয় মিথ্যে মাখিয়ে দুঃখের ওজন কমাতে চাই। শান্তির বাবা মরে যাওয়ার পরও বিদেশের শান্তি মণ্ডলকে ফোন করে জানাই, তার বাবা অসুস্থ খুব, সে যেনও যত দ্রুত সম্ভব চলে আসে। আমি কোনোমতেই চাই না, সত্যিকথা শান্তির ঘরে ফেরার জার্নির ব্রেকফেল করুক। চাই না, শান্তি জীবন্ত লাশ হয়ে ঘরে ফিরুক।

সত্যি স্থির হলে যদি মানুষ লাশ হয়, মিথ্যে স্থির হলে সেই মিথ্যেটা ধীরে ধীরে সত্যি হয়ে ওঠে। কলেজে এ ওর ডাকনাম জানতে চাইলে নিজেই নিজের একটা ডাকনাম দিয়েছিলাম। কত্তদিন কলেজ ছেড়েছি। অথচ কলেজের সেই সময়কার বন্ধুদের বা স্যারদের সাথে দেখা হলেই সেই নাম ফিরে আসে। এমনকি ওই ডাকনামের অন্য কেউকে শোনার পরিধির মধ্য থেকে কেউ একজন ডাকলেই আমারও সারা দেওয়ার প্রবণতায় মুখ ফিরে যায়।

ডাকতে ডাকতেই একলব্য একদিন মিথ্যের মধ্যে সত্যিকে সাধনায় পেয়েছিল। সেই মিথ্যের দোহাইয়ে নিজের বুড়ো আঙুল খসিয়ে হাসতে হাসতে দ্রোণাচার্যের চাহিদাও মিটিয়েছিল। দ্রোণাচার্যের ছল একলব্যকে মহৎ করেছে। কিন্তু অর্জুনকে কি খাটো করেনি একটুও? সেই ছলচাতুরীই কি যুধিষ্ঠির মাধ্যমে কুরুক্ষেত্রের ময়দানে দ্রোণাচার্যের সম্মুখে ফিরে এসেছিল? এই যে সমর্থন খুঁজতে, মিল খুঁজতে বসে গেলাম। মনের সমর্থনে মিলেও গেলাম বন্ধু যত। আবার মিল ভাঙিয়ে ছেড়েও গেলাম অনেকে। অথচ তাদের তো শেকড়ওয়ালা বন্ধু ভাবতাম, যাদের সাথে কতদিনকার কত কত সত্যি-যাপন। সেসব সম্পর্ক একলহমায় মিথ্যে হয়ে গেল! তাহলে কি অনেকগুলো সত্যি দিয়ে একটা মিথ্যে রচিত হলো? অথবা, মিথ্যের এতটাই জোড় যে জোরালো সত্যিদের খাটো করে দিল নিমেষে!

সক্রেটিসের সমাজে, গ্যালিলিওর সমাজে উভয়ে মিথ্যে ছিল। মানবধর্মের চোখে জাতপাত, বর্ণভেদ, শুচিবাই মিথ্যে। অপির চোখে আমি মিথ্যে। আমার চোখে অনুপম মিথ্যে। অনুপমের চোখে মলিনা মিথ্যে। মলিনার চোখে অতনু মিথ্যে। অতনুর চোখে ভূত মিথ্যে। কিন্তু এক পূর্ণিমার মধ্যরাতে দূর গ্রাম থেকে ফেরার পথে মাঠের আলের পাশের গাছে একটা গোটা শরীরকে ঝুলতে দেখে অতনুরও ভূত খেয়ালে এসেছিল। ঝুলন্ত শরীরটা যখন কেঁপে কেঁপে উঠছিল দূর থেকে ভূত ভাবনারা সত্যি হয়েছিল। অতনুর একার তখন সাহস ছিল না। আমরা সঙ্গে থাকায় সত্যি-মিথ্যে যাচাই জোট বেঁধেছিল। তাই গাছটির কাছাকাছি যেতেই বোঝা গেল, নাদুসনুদুস একটা কলাগাছ। যার একটা শুকনো পাতা ডগা মচকে ঝুলে আছে। জ্যোৎস্না যাকে সাদা কাপড়ে জড়িয়েছে। আর হাওয়া এসে দোলাচ্ছে জ্যোৎস্নার সেই ছলনা।

সুন্দরী ছলনা জানে। সুন্দর সে ছলনা ধুমধাম পালন করে। আলোবাজিসহ কেক কাটে। আমিও তার দেখাদেখি দোকান থেকে কয়েক ছটাক মিথ্যে কিনে আনি। সতেজ গুচ্ছ ফুলের ভেতর প্লাস্টিকের ফুল গুঁজে এনে সে তোড়া প্রিয়জনের হাতে তুলে দিয়ে বলি, এই সমস্ত ফুলের শেষ ফুলটা যতদিন না শুকোবে ঠিক তত দিন পর্যন্ত সঙ্গে থাকব। প্লাস্টিক, যা ফুলের স্বভাবধর্মের মিথ্যে। আর এই মিথ্যের কোনো শুকিয়ে যাওয়া নেই। আর শুকিয়ে যাওয়া নেই বলেই পপ গায়িকা বিটনিস্পিয়ারের চিবোনো চিকলেট নিলামে বিক্রি হয়। অদ্ভুত! মিথ্যে সান্ত্বনায় মিছিমিছি কত খরচ! মিথ্যে সান্ত্বনায় আমিও মূল্যবান খরচ ভেবে নেটডেটা রিচার্জ করে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে মুখ গুঁজছি... প্লাস্টিকের ফুলে মুখ গুঁজছি। বাবা বলেন, ‘এসব আসলে মনে মনে কথা বলার সময় ও সুযোগগুলোকে হরণ করেছে। আগে তোর মাকে কত দীর্ঘ অদর্শনের ফাঁকফোকরে পথে-ঘাটে, চিঠিতে সত্যি-মিথ্যের জাল বুনতাম, আর এখন...’

আমার দাদুকে মনে রাখার মতো বয়সে কখনও মুখোমুখি দেখিনি। কিন্তু বাবাকে লেখা তাঁর সেই চিঠি দেখেছি, যেখানে ছোট্ট আমাকে নিয়ে কয়েক লাইন লেখাছিল। সেই যাপনের বড় পুরস্কার, স্পর্শ অর্জন, যার কলম বদলালেও, রিফিল বদলালেও হাতের লেখার স্পর্শরা একটুও বদলায়নি... বদলায় না। অথচ আমার চারপাশ আমাকে নিয়ে কত্ত বদলেছে! তোমার সঙ্গে মনে মনে কথা বলায় তোমার উত্তরদেরও ইচ্ছেখুশি ভেবে নেওয়া আর যাচ্ছে না। তাই ভিড় বাসেও তোমার থেকে বিদায় নেবার পরেও তোমার কণ্ঠের অনুযোগ, হাসিতে মনটাকে ফোনে তুলে রাখি। তুমি সত্যি-মিথ্যে যাই বোঝাও, আমি সত্যি-মিথ্যে যাই বোঝাই অবিশ্বাসের আর কোনো উপায় দেখতে পাই না। দেখতে পাই সুমিতেশ দা’র সেই কবিতাটিকে,

'আজ এমন একটা মিথ্যের শহরে ঢুকে পড়ছি

যেখানে গাছপালা, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট

মিল্কবুথ, পেট্রলপাম্প, রেস্তোরাঁ... জাগতিক সমস্ত কিছুই মিথ্যে :

তো এমন একটা মিথ্যের শহরে

আমার মতো এক মিথ্যে বিকেলের সাথে

তোমার মতো এক মিথ্যে সন্ধ্যার দেখা হলে

আমরা যে সেইসব মিথ্যে কথাই বলব

        এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।'

Monday, April 5, 2021

অশ্রুতরবার, ফুলেল অনুভূতি ❑ ঋপণ আর্য


গাছের পল্লব শীর্ষ যেভাবে এক একটি ফুলকে ব্যক্ত করে, আর আমরা পাঠক-শ্রোতা-দর্শক যে যার মনমাধুরী মিশিয়ে সেই ফুলের সৌন্দর্যের ব্যাখ্যায় মুখরিত হই। তেমনি কবিতায় কবির কাজ ব্যাখ্যা নয়, ব্যক্ত করা। ব্যাখ্যা করা একজন সমালোচক বা গদ্যকারের কাজ। ইনার বা আত্মিক একটা উপলব্ধি করানােই কবির কাজ। বিষয়বস্তুর রহস্য আবিষ্কার করাই কবিতা পাঠকের কাজ। সবাইকে সব কবিতা সব সময়ে ধরা নাই দিতে পারে। স্প্যানিশ কোনও গানের ভাষা না বুঝেই সুরের দুয়েন্দে দেখা গেল বুদ হয়ে হয়ে মাথা দোলাচ্ছি। মানে না বুঝেই ভাষা মাধুর্যের সুর মুগ্ধতার ব্যাখা কী জানি না, অথচ বুদ হয়ে আছি! আমার ক্ষেত্রে এমন অনেক হয়েছে। কবির অক্ষমতা নয়, নিজের অক্ষমতাকেই এক্ষেত্রে বেশি প্রেফার করি। দেখাগেল, পাঠেও ধরা দিল না যে কবিতা বা পংক্তিমালা, পরে কখনও কোনও এক ঘটনার অনুভূতি প্রসঙ্গে হঠাতই নিজ বােধগম্যে প্রামান হতে দেখে ফেললাম তাকে। 

অনুভূত হয়, এমন স্পর্শ নিয়েই ধরা দিয়েছেন কবি মণিশঙ্কর বিশ্বাস তার অশ্রুতরবার কাব্যগ্রন্থে। এই গ্রন্থ প্রাপ্তির আগে কবি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ভাবে ধরা দিলেও, আমার কাছে প্রথম বিস্তার পেয়েছে এই গ্রন্থে এসে। কেন না কবির সমাদৃত পূর্ব ও প্রথম কাব্যগ্রন্থ  'চন্দনপীড়ি' নাগালে আসতে তখনও একটু দেরি। 'আশ্রুতরবার'ই সেই অনুঘটক যা আমাকে কবির হৃদয়ের প্রতিবেশী হতে প্রবল উৎসারিত করেছে। অনুভব করি, আমিও তো আসলে সেই প্রার্থনা সঙ্গীতের— "বৃক্ষের সহজতা দাও"। চেয়ে দেখি, অতি সামান্য আমিও কেবল জল-বাতাসা, ছায়াটুকু নিয়ে ফিরে যেতে চাই,  ওটুকু যে দিনান্তেরও গৃহ সঞ্চয়। কেন কবি কাব্যগ্রন্থের নাম রাখলেন অশ্রুতরবার? আমাদের যাপনের মুহূর্মুহু অশ্রুবিন্দু রাশির অসিতে নিরন্তর ক্ষতবিক্ষত হয় বলে? ‘অশ্রুতরবার’ শীর্ষক দীর্ঘ কবিতাটির পায়েপায়ে কবির সাথে এই তো পাচ্ছি খুঁজে,— “এত জল জমা ছিল তোমার স্বদেশে/ আমি তার নিচে, প্রাচীন পলির ‘পরে/ দাগ কেটে কেটে আঁকি হরতন, ইস্কাপন, তাসঘর—/ শরণার্থী তাঁবু হতে ধাতুর শিখায়”। আজকের তারিখটি যতই দাগ কাটুক, যতই উল্লেখযোগ্য হোক না কেন আর কোনও দিন ফিরে আসবে না! এ যেন ঝরে পড়া অশ্রু দানা, কিছুতেই চোখে ফিরে আসবে না। যে নেই, সে আছে তবু জেগে থাকা স্মৃতিচারণায়। "যেন দুঃখ চলে গেছে/ রয়ে গেছে তার সন্তানসন্ততি"। 

কবিতা রচনার ক্ষেত্রে নতুন নতুন উপমা আবিষ্কারের কথা বলতেন বিনয় মজুমদার। এই বইয়ের কমবেশি প্রতিটি লেখায় আবিষ্কারের মতো নাগাল পেয়েছি উপমার, যা শব্দ ছাপিয়ে, পঙতি ছাপিয়ে কবিতাকে সমুদ্র বানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে উথলে উঠে আসতে চাইছে "বাংলাদেশ" কবিতাটি,— "আমাকে আলাদা করো দুপুরের নির্জনতা থেকে— / দুপুরে শ্যামল ঘেরা পুকুর পাড়ের থেকে— / যেখানে তোমাকে ভাবি। / ভাবি, হয়তো তুমিও দূরে গিয়ে /ভেবেছো আলাদা হবে, আমার মনের থেকে—/ যেন সংখ্যালঘু মনস্তত্ত্ব—/ যেন বৃষ্টির ভিতর ফুটে আছে / শাপলার ফুল, একটু খয়েরি, একা। / # /ফাঁকা মাঠের ভিতর গরু চরে নিরুত্তেজিত। / কাঁটাতার ধ'রে বালক দেখেছে দূরে, / অন্য দেশে সূর্য অস্ত যায়।/ হয়তো তুমিও ওরকম দূরে গিয়ে /ভেবেছো আলাদা হবে / # /আমার রক্তের থেকে।” কী অমোঘ আর্তির এই কবিতাটি। মোহাবিষ্ট হই বারেবারে। ব্যথা টের পাই। আচ্ছা কবির ব্যথায় ভেতরটা এই যে চিনচিন করে উঠল, এর উৎস তো আমার শরীর নয়, তাও টের পাচ্ছি কীভাবে? অশ্রুতরবার গ্রন্থের ব্যাক কভারের কবিতাটির কিছু পঙতি আঙুল ধরে উৎস চেনায়, " শারীরবিদ্যা সম্পর্কে অপ্রতুল জ্ঞানের কারণে / ব্যথা অন্যস্থানে অনুভূত হতে পারে, / প্রকৃত ব্যথার থেকে দূরে।"

তাও প্রকৃত ব্যথা এতই আপন, দূরত্ব মানে না। এই কাব্যগ্রন্থের পরতে পরতে অশ্রুবারি রাশি তরবার সম, গেঁথে আছে এমন, কবিরও কোনো উদ্যেগ নেই যেন ছাড়ানোর।  কবি "মায়া" কবিতার শেষ স্তাবকে লিখেছেন,— “সেই একটি পলক বিঁধে আছে— অস্ত্র বের করে/ নিতে ভয় হয়; গাঁথা-অস্ত্র, ব্যথার অংশের মতো/ ব্যবহার করি— তাকে চেপে রেখে দিই সশরীরে/ রক্তক্ষরণ যেন না হয় আর, ব্যথা পাই যত।” —ব্যথা বড় ছায়াঘন। কবি মণিশঙ্কর বিশ্বাস করেন যতটুকু ছায়াময় ততটুকু পেতে রাখা বুক, আমার মতো পাঠকের তার বাতাস দামে এসে বসতেই যেন এই পেতে রাখা। মন পাতলেই যেন টের পাবো 'রুমি' নামের সংগোপনকে,— “ ঘুমোতে পারি না/ সারা রাত/ আলো/ জ্বলে থাকে/ মনে” । কান পাতলেই যেখানে শুনতে পাবো কবির স্বগতোক্তিকে,— “ যদি আরো স্থির হও, চূড়ান্ত ব্যাধের মতো—”। কবি এখানে থেমে থাকার কথা বললেও স্থির লক্ষ্যকে কিন্তু হারানোর কথা বললেন না। কেন বললেন? এই পলকহীন স্থিরতায় সজাগ থেকেও জগতে অনেক বেশি মিশে থাকা যায় বলে? টের পাওয়া যায় বেশি জগতকে? গাছ যেমন গমনহীন চলন চঞ্চলতায় টের পায় সব? এ স্থিরতা কেবল থেমে থাকা নয় বলেই হয়ত কবিকে চলন সর্বস্ব ফুল গাছ হয়ে উঠতে দেখি,— “ তোমাকে পাইনি আমি—/এই কথা খুব বড় কথা নয়/ তোমাকেই ভালোবাসি— এই কথা ভেবে,/ নিজেকে ফুলের গাছ মনে হয়”। 

কবি মনিশঙ্কর বিশ্বাসের  কবিতার পরম সম্পদ হল সহজতা। একটু বোধগম্যি মানুষ মাত্রেই সহজেই রিলেট করতে পারবে পঙতি থেকে বিচ্ছুরিত অনুভূতিদের। চার ফর্মারএই অশ্রুতরবার কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি মূলত দুটি পর্বে বিন্যস্ত। "বিনিসুতোর মালা" আর "অশ্রুতরবার"। প্রথম পর্বে কুড়িটি ও দ্বিতীয় পর্বে আছে ষোলোটি কবিতা, যার ভেতর আছে আরও একাধিক সিরিজ কবিতা। বইয়ের ব্যাক কভার ব্লার্ব ও বিভাব কবিতাটি খুবই উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও প্রথম পর্বের মায়া, বিনিসুতোর মালা, বাংলাদেশ, নিদাঘ, প্লেজ্যারিজম এবং দ্বিতীয় পর্বের সবকটি কবিতাই উল্লেখযোগ্য। বিশেষত লেখা, শ্যামাগ্নি, ইছামতী, শ্রীচরণেষু, বিন্দু, বাবা কবিতাদের কথা চলেই আসে। কবি কী অনায়াসে ব্যক্তিগত শোকের সরিক করে নেন অভূতপূর্ব দৃশ্য ব্যঞ্জনায়। অমনি কবির 'বাবা'র প্রসঙ্গে লিখেফেলা দৃশ্য ব্যঞ্জনায় আটকে যাই,— 
“এখন তোমার হাতে নেই বাজারের থলি।/ শীতের প্রথম ফুলকপি টম্যাটো হাঁসের ডিম/ ইলেকট্রিক বিল কিষান বিকাশ পত্র----/ কিছু নেই ওই হাতে। / বুকের বাঁ-দিকে শুধু ফাঁকা এক মাঠ/ রোদ্দুর সেখানে তার খেলা দেখায়,/ শিরীষ গাছের মাথায় নামিয়ে রাখে গহনার বাক্স।/ যে পথ নদীর দিকে চলে গেছে / তুমি তার জানালায় দাঁড়ানো মেঘ—/ বৈকুণ্ঠের মত নীল আকাশের নিচ দিয়ে/ হেঁটে যাচ্ছ এখন--- / সম্ভবত ফরিদপুরের দিকে”। 

কবি মণিশঙ্কর বিশ্বাস সেই বিস্মিত বালক, যা আমার কাছে এক অপার বিস্ময়। যে আপনজন হয়ে উঠেও বোঝায়, "মনে করো আমি কোনো প্রশ্নের আগে ইতস্তত-করাটুকু।" এহেন থেকে যাওয়া আমারও তো! লক্ষ্যকরি, "অজান্তে নিজেকে ছোঁয়ার মতো" সঙ্গে হেঁটে চলেছে "অশ্রুতরবার"। 
প্রকাশিতঃ সুখপাঠ ওয়েবজিন (ফেব্রুয়ারী ২০২১) || আলোচিত কাব্যগ্রন্থঃ অশ্রুতরবার || কবিঃ মণিশঙ্কর বিশ্বাস || প্রকাশনাঃ ভাষালিপি || প্রকাশকালঃ ২০১৯

Sunday, November 15, 2020

ব্যথার সংসার,কী বুঝতে যে কী বুঝলো! ❑ ঋপণ আর্য

এক নিষ্ঠুর গরমকালের ছেলেবেলায় হিমুদের পুকুরের জলে একটা শুকনো বাদামপাতায় কিছু পিঁপড়ে তুলে ভাসিয়েছিলাম। পাতাটা ছিল জাহাজ আর পিঁপড়েগুলো সেই জাহাজের নাবিক। সে এক মজাদার খেলা। জাহাজ ভাসছে তার উপর নাবিকরা এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছে। বাবার তাড়া খেয়ে জাহাজটি না তুলেই স্কুলে চলে গেছিলাম। ভেবেছিলাম, বাড়ি ফিরে বিকালের স্নানে আমার সেই নাবিকদের উদ্ধার করবো। কিন্তু কোথায় সেই নাবিক! কোথায় সে জাহাজ আমার! সারা পুকুর দাপিয়েও খুঁজে পাইনি। ভীষণ মনখারাপ, কাউকে বলতেই পারিনি আমার কারণে তাঁরা নেই, মা-কেও না, কেবল পাপের ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বেরিয়েছি। এমনকি যখনই সেই ঘটনা মনে পরতো তখনই ব্যথা পেতাম। এই যে লিখছি এখনও যেন ব্যথারা হুহু করে জাগছে । জানি সেইরকম পাপবোধ আর জীবিত নেই আমার ভেতর, তবু সেই ঘটনার মনে পড়ায় ব্যথা কিন্তু আছে। এখন প্রশ্নটা হল, সেইরকম কিংবা তার চেয়েও বড় ঘটনায় ব্যথা পাই না কেন? কেনই বা পাপবোধ জাগে না আর? সেই সরলতা ভেঙে কি অনেক বেশি কুটিল হয়ে গেছি? এই কারণেই কি মানুষসহ সমস্ত প্রাণীদের শিশুরা অনিন্দ্যসুন্দর দেখতে হলেও পরবর্তী জীবনে নানান ব্যথার ভার এসে, মিথ্যের ছাপ এসে তাদের চেহারাদের বদলে দেয় এমন?

      চেহারা নয় শুধু যাপনের প্রসঙ্গও বদলে দেয়। পুরোনো অনেক ব্যথাই তখন নিছক মজার প্রসঙ্গ হিসাবে পালিত হয়।  তবু সে ছেড়ে যায় না, সব সময় পাই, হরদম তার ইভেন্ট তৈরিতে ব্যস্ত হই। একজনকে আনন্দ দিয়ে অন্যের ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াই। ধরা যাক, ভারত-পাকিস্তানের খেলা হচ্ছে। ভারত জিতল যেই পাকিস্তান ব্যথা পেল। উল্টোটাও হতে পারে। আসলে আনন্দ দানের ঐ খেলাটাই যে কারো না কারো ব্যথা ছিল। এতটাই প্রশ্রয় দিতে ভালবাসি বলেই তো আনন্দের গান ছাপিয়ে ব্যথার গান অনেক বেশি জনপ্রিয়, আপন হয়ে ওঠে। তার রেখে যাওয়া দাগে রোজ আঙুল বুলোই। তাই হয়ত 'কালোর চেয়ে বেশি সত্যি, ঘা-খাওয়া মানুষ আমরা সন্দেহের চোখে দেখি আলো।'

     আলো ভেবে যে সমস্ত গুণকে একটা মানুষের ভেতর পেয়ে আরেকটা মানুষ জীবনসঙ্গী হিসাবে যাপনে জড়ায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরবর্তীতে দেখা যায় সেই প্রিয় গুণটাই ব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমার মায়ের সরলতাই বাবার পছন্দের অন্যতম কারণ ছিল, কিন্তু এখন দেখা যায় মায়ের সেই সরল ব্যবহার বহুক্ষেত্রেই বাবাকে ব্যথা দেয়। আমার বন্ধুপ্রীতিকে পছন্দ করে যে মেয়েটি যাপনে জড়ালো, আমার সেই গুণটিই তার একসময়ের বেদনার কারণ হল। এমন ঘটনা আরো নানান প্রসঙ্গেই দেখেছি।

      আপাতদৃষ্টিতে একটা সামান্য কথা একটা মানুষ থেকে আরেকটা মানুষে গেলে রূপ বদলে যায়, ওজন বদলে যায়, হিসাব বদলে যায়। ধরাযাক, সেই কথাটা যখন প্রেমিকা বলল, হেসে উড়িয়ে দিলাম। বোন বলল, ধমকি দিলাম। বাবা বললেন, উপদেশ হিসাবে নিলাম। কিন্তু সেই কথাটা যখন একজন বন্ধু প্রসঙ্গ বিশেষে বলল, ভেতরে কোথাও নিদারুণ এক ব্যথা পেয়ে পালটা আঘাতে তাকেই ব্যথা দিয়ে ভারমুক্ত হতে চাইলাম। কিংবা দিলাম না তাকে পালটা আঘাত, সেই বেদনার ঝোপ-জঙ্গল বয়ে বেরালাম কিছুকাল, তাকে দিয়ে বন্ধুটির সাথে মানসিক দূরত্ব গড়লাম। কিংবা খুব কাছের কেউ, যেমন মা, মায়ের খুব সামান্য এক দোষে সেই বয়ে আনা ব্যথার ভার প্রকাশ হল নিদারুণ আঘাতে। এই যে কাউকে পালটা আঘাত হেনে নিজের ব্যথার ভার কমাতে চাইলাম, এমনই তো মানুষ আমরা, নিঠুর পাষাণপুরী। আমরা কেবল পালটা আঘাতেই ব্যথা ছাটি না, একটা ব্যথাকে ঢাকতে আরেকটা ব্যথাকে আঁকড়েও ধরি। আমার হাত কেটে গেছে, হাতে সহ্যাতীত ব্যথা। কিন্তু দেখা গেল পরমুহূর্তে প্রেমিকা আমার, সম্পর্ক ভেঙে চলে গেল। তো কী হল? মুহূর্তে হাতের ব্যথার শোক গেলাম ভুলে। দেখি, প্রেমিকা হারানোর বেদনা তখন আমাকে ফাঁকা ড্রামের মতো কী তুমুল বাজাচ্ছে! তখন আমার এই পরিস্থিতির সমব্যথী কোনো বন্ধু এসে মলম হতে চাইছে। আবার কোনো বন্ধু এই ঘটনায় ঠিক তেমনটাই চরম আনন্দিত, যেভাবে কোনো শোকসভায় কারো কারো নাচার ইচ্ছে হয় খুব। এই যে আরেক বন্ধু এমন ঘটনায় সমব্যথী না হয়ে উপেক্ষা করল, তাকে দেখে যেন আমার কষ্ট বেড়ে গেল হুহু। এমন অনেক চেখে দেখেছি সহ্যাতীত উপেক্ষার বেদনাকে। শিখেছি, কাউকে ব্যথা দিতে হলে তাকে উপেক্ষা করাই অন্যতম পন্থা। হিন্দি একটা সিনেমায় দেখেছিলাম, নায়ক এক একটা মেয়ের সাথে প্রেম করে ধোকা দিয়ে উপেক্ষা করে চলে যাচ্ছিল আরেকটা প্রেমে। কিন্তু শেষে যখন নিজেই উপেক্ষিত হল কারো কাছে, বুঝেছিল আগের প্রেমিকাদের সে কী ব্যথা দিয়ে এসেছে। সে তখন সেই সমস্ত পুরোনোয় ফিরে এসে ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছিল। 

      কিন্তু এই ক্ষমা চাওয়ার সময় আমরা যদি পার করে ফেলি? তখন কী হবে? প্রলয় অনিবার্য? এই আমরা যেমন নিজেদের ব্যথার নিজেরাই কারণ, তেমনি পরিণাম বুঝেও তো প্রকৃতির ব্যথার কারণ আমরা। প্রকৃতি কিন্তু কখনোই নিজের ব্যথা নিজে তৈরি করেনি, অন্যের ব্যথারও কারণ হতে চায়নি । ধরা যাক, ঘোরপাপী আমি, জল যখন পিপাসায় পান করবো তখন সে তার যে যে চরিত্রগুলো বহন করবে, একজন শুদ্ধ মানুষের পিপাসার ভেতর গিয়ে একই তো পরিচয় দেবে। তার কাছে চোর, গুন্ডা, সাধু-অসাধুর কোনও ভেদাভেদ নেই। প্রকৃতি আসলে এতটাই মহান, দীর্ঘকাল তার ক্ষমা ধর্ম দেখে তার ব্যথাকে পাত্তা দিতে ভুলে গেছি আমরা। শুধু প্রকৃতি কেন, শূন্য অচেতন পাত্রেরও তো সহ্য ক্ষমতার একটা সীমা আছে। আমরা কি এখনও টের পাচ্ছি না, প্রকৃতির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা? এরপরেও জীবন্ত বৃক্ষদের হত্যা করে যাবো এমন?

      কথিত আছে আফ্রিকার কঙ্গো উপতক্যা অন্তর্গত বিশেষ এক অঞ্চলের অধিবাসীরা জীবন্ত বৃক্ষকে হত্যা করে না কখনও। কিন্তু তাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকায় তো কাষ্ঠ সংগ্রহের একান্ত প্রয়োজন। তাই তারা কোনো বৃক্ষকে নির্বাচন করে প্রত্যেকেই সেই বৃক্ষের চারপাশে ঘুরে ঘুরে সকাল-সন্ধে গালাগাল দেয়, কষ্টের কথা শোনায়। এভাবে ক্রমাগত চলে কিছু দিন। ব্যথার ভার সইতে না পেরে একসময় বৃক্ষটি শুকিয়ে যেতে আরম্ভ করে এবং মারা যায়।

      মানুষেরও এমন এক ব্যথার মর্মান্তিক তথ্য রেখে গেছেন বিশ্ববিখ্যাত অভিযাত্রী ডক্টর ডেভিড লিভিংস্টোন তার লেখায়। তিনি লিখেছিলেন,  'আশ্চর্য যে অসুখটি আফ্রিকাতে স্বচক্ষে দেখেছি, তা হল হৃদয় ভাঙনের অসুখ। স্বাধীন কোনো মানুষ ক্রীতদাস হওয়ার পরে, দাস-প্রভুদের খোঁয়াড়ে জন্তুর মতো আচরণে পৌঁছে কয়েক সপ্তাহের মাথায় মারা যেত'। লিভিংস্টোন তাঁদের সাথে কথা বলেও জেনেছিলেন, ব্যথা বলতে তাঁরা বুকে হাত দিয়ে দেখাতো, হৃদয়ের অবস্থান যেখানে। ঠিক এই প্রসঙ্গটি তুলেই কবি রণজিৎ দাশ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিকে আঙুল তুলে তার একটি কবিতায় লিখেছিলেন, 'কয়েকশো বছর আগেও মনঃকষ্ট বা শোক মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসাবে চিকিৎসা জগতে স্বীকৃত হত। কিন্তু এখন আর তা হয় না। এখন আর কোনো মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হবে না এই মন্তব্য, ভগ্নহৃদয়ের অসুখে এই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে'।

      আমরা যারা এখনো অ-মৃত তাদের কাছে প্রিয় চরিত্রের মৃত্যু যে কী নিদারুণ বেদনার। অথচ ওই মৃত্যুকে নিয়েই গল্প করতে আমরা যে কী ভালবাসি। এত প্রিয় গল্প আমাদের জীবনে আর কিছু নেই। কর্ণের মৃত্যুর গল্প... ভীষ্মের মৃত্যু... তরুণ কবি অভিমন্যুর মৃত্যু... লোরকার মৃত্যু... বাইশে শ্রাবণ এমন কত যে সঞ্চিত গল্প আমাদের! যেন কোনো শোক নেই... বেদনা নেই... বিষাদ নেই, সবই জ্যোতির্ময় চিরদিনের গল্প আজ। 

      আসলে ব্যথা নিয়েই জন্ম আমাদের, আর মা হচ্ছে সেই ব্যথার আধার, যিনি তিলে তিলে অসম্ভব এক সহ্যশক্তিকে গর্ভে সঞ্চয় করেছেন। এই প্রসঙ্গে মাকড়সা মায়ের কথা মনে পড়ে, তিনিও তার জালে সন্তানদের খাদ্য হিসাবে নিজের শরীরটাকেই বিছিয়ে দেন, সন্তানদের ফালা ফালা করে খাওয়া তিনি সহ্য করে মৃত্যুবরণ করেন। সমগ্র মা জাতিটাই এমন। সেই মায়ের প্রসব যন্ত্রণা অতিক্রম করেই তো জন্ম আমার  কেঁদে উঠেছিল। যতই আমরা ব্যথাকে নানান রঙের হাসি-খুশি-সুখী পোশাক পড়াই না কেন, আনন্দযজ্ঞে ডাকি না কেন, সে হেসে বলবে, 'ঠিক আছে তুমি পালন করো ওসব, আমি বরং তোমার জন্য দরজার বাইরে অপেক্ষা করি'।

      তাই বুঝি রাধা আগাম ব্যথাকে বুঝে কৃষ্ণের সাথে অভিসারে যাওয়ার আগে নিজেকে তৈরি করতে চেয়েছিল? ওঁঝার কাছে মন্ত্র শিখে, সখীদের দিয়ে নিজের চোখ বাঁধিয়ে, উঠোনে জল ঢেলে, কাঁটা বিছিয়ে ব্যথা সহ্যের আগাম পরীক্ষায় হেঁটেছিল সে। যাতে করে গভীর ঝড়-জলের  রাতে পিচ্ছিল কাঁটা বিছানো পথ, সাপ-খোপেরা অভিসারের বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। রাধা মিলনানন্দ পেয়েছিল,  বিরহ ব্যথাও অতিক্রম করে আনন্দ অশ্রুতে ভেসেছিল। কিন্তু 'মাথুর পর্যায়'-কে তো অতিক্রম করতে পারেনি কিছুতে। কৃষ্ণশূন্য সবকিছুই যেন তখন হাহাকার তাঁর, দৃশ্যমান সব কিছুই যেন শূন্য তখন। তাই তো বিদ্যাপতির কবিতায় কী নিঠুর ব্যথায় রাধাকে ডুকরে উঠতে দেখি- 
     'সূন ভেল মন্দির, সূন ভেল নগরী/ 
     সূন ভেল দসদিস, সূন ভেল সগরী'

      আমরা ৯৯ শতাংশ মানুষ 'মাথুর পর্যায়'কে মেনে নিতে পারি না। সেই যে প্রেমিকা ছেড়ে গেল আমায়। একদা দেখা গেল সময় সহ্যের প্রলেপ মাখিয়েছে তাতে।  আমিও হেঁটে চলে গেছি অন্য কোনো প্রেমে। কিন্তু সত্যি ঘটনা এই যে, 'মাথুর পর্যায়'-কে আজও কোনো সমাজ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। সে কোনো মনুষ্যজাতি নয়,  সে হল নেকড়েদের সমাজ। একটি নেকড়ের জীবনসঙ্গী কখনো যদি মারা যায়, তাহলে বেঁচে থাকা নেকড়েটি বাকী জীবনে কখনোই আর কোনো নেকড়েকে জীবনসঙ্গী করে না। হয়ত সঙ্গী হারিয়ে ফেলার ব্যথাটাকে বাকি জীবনটুকু বইবে বলেই এমন তার যাপন।

      আমাদের যাপনে ব্যথাকে সাধারণত দুই পথে পাই, একটি দৃশ্যমান অর্থাৎ শারীরিক, অন্যটি অদৃশ্যমান অর্থাৎ মানসিক। কিন্তু এই দুটির অনুভূতি এক জায়গাতেই তো হয়, মস্তিষ্কে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা অন্যের দৃশ্যমান ব্যথাগুলোয় উতলা হই। এই প্রসঙ্গে একদিন এক দাদা বলেছিলেন, 'দেখবে একটা অ্যাকসিডেন্টে তোমার এক বন্ধুর পা ভেঙে গেলে তুমি বা তোমরা উতলা হয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে ছুটলে, বারবার তাকে দেখতেও গেলে। কিন্তু সেই বন্ধুটি যখন মানসিক গোলযোগে মস্তিষ্কের তার কেটে ফেলল, খারাপ লাগা পেলেও তাকে তো কই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে না? একসময় পাগল আখ্যা দিয়ে কেবল পাশে সরিয়ে রাখলে। ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে তোমার উতলাটুকুও গেল ফুরিয়ে!  ' কী অদ্ভুত!!  এটা কেন হল?! এ কেমন ধাঁধা? আসলে কেউ আর এই শত সহস্র কর্মের সংসারে সহ-কর্মী ঈশ্বরকে ডেকে মনের কথা বলি না যে, তাঁর মনের কথাও তো শুনি না।  যদি শুনতাম একটু সময় নিয়ে এসব বেদনা, তাহলে স্টেশনে যে ভিখিরিটাকে এক টাকাও দিলাম না, তার  ব্যথার গল্পে মনোযোগী নিজেই হয়ত গোটা পকেটটাই উজাড় করে দিতে একটুও পিছপা হতাম না।

      'কেন এমন হয়' ভাবতেই যেন ভেতরে গোপন এক কান্না বেজে ওঠে। যেন এই নিভৃত গোপন অশ্রুপাতের পর কিছুতেই আর বলা যাবে না,--  'এই অশ্রু আমারই সবটুকু!' এর মধ্যে যে এই জগৎ সংসারের কার কতটুকু কীভাবে এসে জড়ো হয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা কারও সাধ্য নয়। এ হল আসলে এক মহা-মিলন। কে এই মিলনের ঈশ্বর, যিনি এমন মেলালেন আমায় জগত সংসারে? সেই মিলন কি পূর্ণ হল আমার ভেতর এসে? বড়ো সংশয় জাগে। এ সংশয় যেন পৃথিবী দাপানো বর্ষার রাতে নিঃঝুম বেদনায় নিজেকে খোঁজার সংশয়। যেন মনে হয়, 'আমি আর পারছি না, কিছুতেই পারছি না, এক্ষুনি হয়ত ফেটে যাবো'। আর তক্ষুনি মা এসে যেন বলেন আমায়, 
 'তুই কষ্টে থাকলে জানবি,/
 অন্য কোনো কেউ তোর অধিক কষ্ট নিয়ে/
 রাস্তা পার হচ্ছে'। 
কী অদ্ভুত! চোখ তুলে দেখি, নিজের জন্য কোনো শোক নেই, ব্যথা নেই আর। ব্যথা যত রাস্তার দুপাশে সার বেঁধে, হাত নেড়ে ডাকছে আমায়। সত্যিই তো, এই বেদনাঘোর জগতে কারণে অকারণে কত কত ব্যথা দিয়ে ফেলেছি প্রিয়জনে! কত কত অখুশি করেছি! কী নিদারুণ তার ভার! সেই দায়ভারই এখন উপলব্ধির মালিক আমার, আগে জানলে হয়ত গুরুত্বটা এমন হুহু করে মরম ছুঁতো না, কাঙালের মতো মনে হত না, 'ব্যথার এই সংসারে আমাকে বাঁচতে গেলে যে করেই হোক আমার চারপাশের মনগুলো ভাল রাখতে হবে'। নাগালের জল-মাটি, গাছ-পাখি, মানুষ-রাস্তা একবার হাসতে শুরু করলেই যেমন হাসিয়ে ছাড়ে গোটা মরশুমকেই, মন ভালর এমন সংক্রমণ চাই। মানসিক বিচলিত পাশের মানুষটিকে শুনতে শুনতে এই যে বুঝতে পারছি, ব্যথারও তো জ্বর হয়। আমি আমার সমস্ত অন্তঃকরণ ঢেলে তাঁর জলপট্টি হতে চাই। আর সন্ধ্যা শেষে সেই বিছানায় পৌঁছাতে চাই যেখানে ব্যথা এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলবে, এই তো, দ্যাখ, এখন তোর আর কোনো অসুখ নেই।

Sunday, November 8, 2020

এতো আবেগ ক্যা রে! ❑ ঋপণ আর্য

—সিকান্দার বক্সের মতো আমি নিজেরে এই একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি। আবেগে গদগদ দেখে নিজেরে শাসাই, 'ভালোবেসে ফেলিস যারে খুব, তার কাছে এতই সহজলভ্য, ঠুনকো কেন হয়ে যাস বারেবারে তুই! এত এত ঘটনায় অন্তে এসে এবার তো শুধরে যা বাপ!'

ভালোবেসে সহজে অন্যের আবেগের অংশীদার হই। আক্রন্ত হই। কিন্তু অন্যের আবেগে জড়িয়ে তার আবেগ হয়ে ওঠা বহু ক্ষেত্রেই ভালো কথা নয়। কালো কথা, কাজ-কম্ম, প্রতিবাদ, কান্না, ভালোবাসা আবেগে নামলেই বেগ বেড়ে যায়। আবেগ তখনই ন্যাকামো লাগে, যখন ভালবাসায় বাস্তবজ্ঞান জাগে। মাতাল, আবেগে বালিশটিকে ক্রমাগত চুমু খেয়ে জাগাতে চায়। বালিশ তো সেই থেকে মাটি, আবেগ তুচ্ছ করা মাটি।

তুচ্ছ আবেগেও গান আসে। আবেগ একবার গানের নাগাল পেলে আরও মজে যায়। আবেগ বেশি সংযত হলে গান হবে না,  কিন্তু সংযত আবেগ হবে কবিতার!  তাই সব গান কবিতা নয়। আলোক সরকারের 'উতল নির্জন' বইটি প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশ চিঠিতে লিখেছিলেন,-- 'প্রীতিভাজনেষু, আপনার কবিতায় এত আবেগ কেন... আবেগকে সংযত করুন'।

আসলে আবেগের ভিতর থাকলে তার গান হওয়া যায়, কিন্তু আবেগকে চিনতে পারা যায় না। তাই খানিক দূরত্ব। নারী থেকে ফুলের দূরত্বে, নারী থেকে চাঁদের দূরত্বে তবু যাবো না। তারা তো প্রাকৃতিক নিয়মের, তারা এসব পারে না, নারী পারে চাঁদ-ফুল দুটোই সাজতে। তৈরি করা সৌন্দর্যের তো মৃত্যু নেই।  যা নেই তাকে আবেগ অধিকার করলেও মৃত্যু কী করে অধিকার করবে?

Thursday, July 23, 2020

কবিতার সত্যি... কবিতার মদ... ❑ ঋপণ আর্য

'আমি বৃষ্টিমুখর দিনে প্রায়ই সাহেববাঁধের পাড় ধরে হাঁটি, গান গাই, আর পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করি কোথাও। কিন্তু পারি না। একজন শিল্পী কোথাও পৌঁছোতে পারেন না। তিনি শুধু রওনা দেন মাত্র। '

❑ 

কে বা কারা যেন আমার ভিতরে রোজ বাজার বসায়। অনেক কিছুর সঙ্গে তারা আমাকেও একটু একটু করে বিক্রি করে। তবু এখনও যেকোনও সম্পর্কের শুরুর আগে স্পর্শের কথাই ভাবি, কবিতা লেখার ক্ষেত্রেও। ছেলেবেলা থেকে পড়াশুনার অভ্যাসটা ঢোকে কমিকস থেকে। কতদিন যে বাবার পকেট থেকে টাকা ঝেড়েছি গল্পের বই কেনার জন্য...ইয়ত্তা নেই। বাবা আমার ধীরে ধীরে বন্ধুজন। তিনি বলতেন, তার সময়-অসময়কে আমার বুঝতে হবে। বুঝেছি যতটা শিখেছি মাত্রাতিরিক্ত। মন্দরাও হুড়মুড়। আমার পড়াশুনা একেবারে পাতি লেবেল থেকে উঠে আসা। অখাদ্য পেলেও গিলতাম। তবে পাঠ্যের বাইরে বিস্তারিত ভাবে প্রথম কবিতাপাঠের ঘটনা অদ্ভুত, তখন ক্লাস সেভেন, লক্ষ্মীপূজার দিন বাবা আমাকে ১০টাকা দিয়েছেন বাজি কেনার জন্যে, আমি বাজারের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে ৩টাকা দিয়ে জীবনানন্দের ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ কিনে ফেললাম। বাকি টাকাগুলো খরচের সঙ্গে মনে থাকার মতো আরও কতকিছুই যে মনে নেই অথচ কী অদ্ভুত সেই ৩টাকা খরচের কথা এখনো মনে আছে!

          ক্লাস নাইনে হুমায়ুনের ‘হিমু’ পড়েই হিমু অ্যাডিক্টেড হয়ে যাই। হিমুর মতো গভীর রাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তাম, ভালো লাগাদের মুখস্ত করতাম। অনেকে বাবার কাছে নালিশ করেছিল। একবার তো পুলিশে ধরেছিল, হয়ত চেহারার মায়ায় পড়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছিল। ঝাড়টা দিয়েছিল বাবাকে। তবুও বাবা আমাকে কিছু বলেননি। বাবাকে মাঝে মাঝে আমার ঈশ্বর মনে হয়। তারপর থেকে বাবার সঙ্গে আমি আমার স্বপ্নদোষ সহ সমস্ত দোষ শেয়ার করি। ইলেভেনেও বরুণদার কাছে ইংরাজি পড়তাম, লেখালেখির উৎসাহে কত বই যে পড়াতেন! বরুণদার প্রতি শ্রদ্ধা আমার ভয় বরাবর। তাই পড়ার ব্যাচে দাদার খানিক দূরে এককোনায় চুপচাপ থাকতাম। আমার চুপথাকা একজনকে পেয়ে বসেছিল। যেভাবে খাতাগুলো হাত ঘুরে ঘুরে বরুণদার কাছে পৌঁছায়, ফিরে আসার পথও অনুরূপ। এই ফিরে আসার পথেই একদিন সে খাতার ভেতর চিঠি দিয়েছিল, চিঠিটিতে তার নাম ছিল না! নোটের জেরক্সের অক্ষর মিলিয়ে নাম আবিষ্কারে আনন্দ হয়েছিল খুব, নিজেকে তপসে তপসে লাগছিল। কিন্তু কোন ফেলুদাকে শোনাই?... বাবাকে বলেছিলাম।  না, সেই চিঠির সম্পর্কে আর জড়াইনি। মনের সমর্থন না এলে কীসের মীমাংসা? ‘মদ ও জুয়ার চেয়ে ঢের বেশি নেশা হয় মন ছুঁয়ে দিলে ’। মনটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রাধান্যে যায়, প্রাধান্য চায়। যে ছোঁয়াগুলোয় ভেতরটা শীত শীত করে, তাদের দিকে এগোয় ভালো থাকা। ‘সবাই নয়, /কেউ কেউ ভালোবেসে হাত ধরলে চোখে জল আসে। ’

          আদতে চোখের নিশপিশ জুড়ে যাচাই... যা চাইও বটে। আমাদের বাড়ির পাশে বল্টু নামের একজনের দু’বছর যাবৎ খোঁজ ছিল না। তাকে নিয়ে তার বাড়ি ও আমাদের বহুত গল্প জমত। যেই দু’সপ্তাহ আগে জানা গেল সে ছ’মাস হল মারা গেছে অমনি তার বউ বিধবা হল। সবাই ভুলে গেলাম... মাত্র দু’সপ্তাহে! কী অদ্ভুত জোকস! অমনি হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এল, ‘নিরাশার কোনও মায়া নেই ’। —‘নিরাশা’ এখানে যেন সেই নির্দিষ্ট বয়স্ক মানুষ, যার মৃত্যুতে কারও কোনও শোক থাকে না। অথচ জেগে থাকায় ইচ্ছের মৃত্যু নেই! তাই না-থাকা রঙে রেঙে উঠতে লাগল যাপন। আসতে লাগল অজস্র প্রশ্ন। কে যেন বলেছিল, একটা উত্তর যতটা প্রাসঙ্গিক, প্রশ্নটা তার হাজার গুণ বেশি প্রাসঙ্গিক। তখন থেকেই যাপনের প্রশ্নগুলো টোকা শুরু। প্রচুর চিঠি লিখতাম বন্ধুদের। তাদের হিসাবে চিঠিগুলো নাকি কবিতার আদল। কবিতা লেখা তাহলে সেই থেকে। সেই থেকেও কবিতা আমি বহুক্ষেত্রে বুঝি না, তুমি আমার সঙ্গে আছ জেনেও যেমন বুঝি না তোমাকে। পরে যাপনের আপনে মিলে গেলে আবিষ্কারের আনন্দ। অনেক সময় পাঠ সঙ্গে-সঙ্গেই মুগ্ধতা হেতু আক্রান্ত হই। অনেক সময় মুগ্ধতার ব্যাখ্যা নেই, অন্তরযাপনে জাড়িত। অন্তরযাপন কি বড্ড ছায়াকেন্দ্রিক? আমাদের সব পাঠ্যকে ছাপিয়ে যাচ্ছে আলো আর অন্ধকার। যাপনের তাহলে দোষ কই?... ‘যে আলোটার জন্য আমার ছায়া ছুঁয়ে আছে / তোমাকে,  ছায়াটা ঠিক কতখানি তার? / এই যে আমরা সূর্যের ছায়া বলি, চন্দ্রের ছায়া বলি / তা সত্ত্বেও দীর্ঘ প্ল্যাটফর্ম জুড়ে ট্রেনের ছায়াই তো বলি। '

          ছায়াটা সঙ্গ দেয় বলেই বছর বছর এত স্যাডগান হিট হয়। ছায়াটা সঙ্গ দেয় বলেই এত বিষাদ পদাবলি। নিজেকেও মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো মনে হয়। আমার সঙ্গে তখন দিনও কথা বলে না... রাতও না। পৃথিবীটা জমাটবাঁধা চোট হয়ে যায়। যদিও নিঃসঙ্গ কাজ করে যাওয়ার মধ্যে এক ধরনের মদ আছে... শক্তি আছে, একা থাকার শক্তি... একা লেখার শক্তি। ‘একটা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মানেই / আরো একবার নিজের কাছে ফেরা। ' —এই ফেরাটা কখনও বুঝে ফেরা, কখনও না বুঝে। আমারও মনে হয় সব বোঝাগুলো আসলে সময় নির্ভর। ঠিক সময়ের আগে পর্যন্ত সেগুলো ভারি বোঝা হয়ে টেকে। উদাহরণই ভাল ব্যাখ্যা হতে পারে।  সেদিন শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে হাবড়ায় ফিরছি, সঙ্গে শিমুল। দু'জনেই জানালার কাছে এবং মুখোমুখি। বিধাননগর ছাড়তেই ভিড় বাড়ল।  আমার আর শিমুলের কথার মাঝে একজন ভদ্রলোক বারবার এসে দাঁড়াচ্ছিলেন। কথা বলার সময় তার সাইড দিয়ে মুখ বের করে কথা বলতে হচ্ছিল। আচ্ছা, কথা বলার সময় মুখ দেখাটা কি খুব জরুরি? মুহূর্তে একটি কবিতাকে সত্যি হতে দেখলাম,— ‘লাইটা /জ্বেলে দাও কথাগুলো দেখতে পাচ্ছি না। '

❑ 

গত রাতে সম্বিতকে sms করেছিলাম,— ‘কবিতার ক্লাইমেক্স বলতে কী বুঝিস?’। উত্তর এল,— ‘এই বাঞ্চোত, ঘুমো’। উত্তরের এই অংশটুকু ভাস্কর চক্রবর্তীর ‘ঘটনা’ কবিতার সেই অন্তিম লাইন যখন রাত্তিরবেলা আলো জ্বালিয়ে কবি লিখছিলেন ছোট্ট ঘরে বসে। ঠিক তখন ‘রাস্তা থেকে কে যে বললো;/এই বাঞ্চোত, ঘুমো ’। এরকম চমকে যাওয়ার মতো শেয়ার যাদের কান ঝাঁজিয়ে দিল, তাদের বিশেষ ভাবে বলব, মুহূর্তের উপর চোখ রাখতে। আমরা ভীষণ মুহূর্ত নিয়ে বাঁচি। আমার এক বন্ধু বলত, সময় ও ঈশ্বর সমানুপাতিক। অমনি ভাবতে শুরু করেছিলাম, মুহূর্ত ভিন্ন অন্য কিছুতে ঈশ্বর দর্শন নেই তাহলে!!! ‘সময় বলতে সত্যি কিছু কি বোঝায় ! / মুহূর্ত দিয়ে তোমায় ধরে রাখি / জানালা আমার নিভৃত উপার্জন / তোমার তুলনায় তাই বারবার জানালা এসে যায়। '

          ‘তোমার তুলনা তুমি’র মতো জানালার তুলনায় জানালাওয়ালা সেই শোনা শর্টফিল্মের গল্প এই মুহূর্তে আমার কাছে ভাবানুবাদ হয়ে এল। একটা বেশ পুরনো বাড়ির একটি কক্ষে দেওয়ালের যে দিকটায় জানলা সেখানে আরামকেদারায় আধাশায়িত একজন ৮২, চোখে গাঢ় পর্দার চশমা, সময় তবু ঝাপসা যেখানে। কাছাকাছি বিছানায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে ২৫-এর যুবক। এইমাত্র জানালাটিতে একটি কবিতা এসে বসলো। বৃদ্ধ চেল্লালেন,— ‘কী ওটা?’। ছেলেটি পেপার থেকে চোখ তুলে বলল,— ‘চড়ুই’। এবার কবিতাটি জানলা থেকে ঘরে ঢুকেই টেবিলে এসে বসল। বৃদ্ধ ফের চেল্লালেন,— ‘কী ওটা?’। ফের নিজস্ব মনোযোগ থেকে চোখ সরিয়ে গাঢ় স্বরে ছেলেটি বললো,— ‘বললাম তো, ওটা চড়ুই, চড়ুই পাখি’। কবিতাটি টেবিল থেকে কিচিরমিচির শব্দ করতে করতে বন্ধ সিলিংফ্যানের একটি ডানায়। বৃদ্ধ হাঁ করে তাকিয়ে— ‘কী ওটা?’। ছেলেটি বিরক্তিতে— ‘কী সমস্যা! বললাম না ওটা চড়ুই, তুমি একটু চুপ করবে?’। এবার হয়ত কবিতাটি নিজে এই বিবাদের বিষয় বুঝতে পেরে বৃদ্ধের খুউব কাছে, আরামকেদারার ডালে একটু বসেই ফের উড়লো— ‘কী এটা?’...। পেপারটা রোল করে বিছানায় সজোরে কোপ বসাল ছেলেটি এবং চেল্লাল— ‘সেই থেকে বারণ করছি, বারবার একই কথা, যাও বাইরে যাও... যাও...’। কবিতাটিকে আর দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে; বৃদ্ধ কক্ষ থেকে বেরিয়ে পাশের কক্ষে ঢুকছেন। ঘরভর্তি বৃদ্ধের বিভিন্ন কালের কেনা বই ডাই দেওয়া। তাদের মধ্য থেকে লাল মলাটের একটি পুরনোকে তুলে নিলেন। ফের পূর্বের কক্ষে ফিরে এলেন। ছেলের বিরক্তি উপেক্ষা করে বৃদ্ধ পিতা একটি নির্দিষ্ট পাতা মেলে এগিয়ে দিয়ে বললেন,—  ‘পড়ো তো...। পড়ে আমাকে শোনাও...’। ছেলে দেখল, পুরনো ডাইরির সেই পাতাটাই খোলা যেটা তার জন্ম দিনের তিন বছরে পা। পড়তে আরম্ভ করল,— ‘আজ খুউউব আনন্দের দিন। নানান মাপের মজাদার কান্ড ঘটেছে। সবচাইতে মজাদার হল, আজ খোকা একটা চড়ুই পাখি দেখে বাইশ বার জিজ্ঞাসা করেছে,  আমি হাসি মুখে প্রতি উত্তরের সঙ্গে একটি কারে চুমু খেয়েছি।’—এখানেই গল্পটা শেষ। বিক্রিয়াটা শুরু। চড়ুইটি জানলায় বসার পর থেকেই কবিতা হয়েগেছে। ছেলে বুঝতে পারেনি। বাবা বুঝতে পেরেছে স্রেফ অনুঘটক হিসাবে। কবিতা কি তাহলে অনুঘটক? ...কিন্তু গতি যার কোথাও কোথাও প্রধান লক্ষ্য নয় তো! অনেকটা ম্যাজিকের সরব উপস্থিতি। যাতে করে উপলব্ধির সজাগে ধাক্কা খায় মন কেমন করা হাওয়া।

          আমার প্রাইমারি জীবনে ‘বড় হয়ে কী হতে চাই’ রচনায় লিখেছিলাম ম্যাজিসিয়ান হওয়ার ইচ্ছে। গোটা স্কুলবাড়িটাকে ভ্যানিশ করে দিয়েছিলাম। গভীর প্রচেষ্টায় টুকরোটাকরা ম্যাজিক আত্মস্থও করেছিলাম। তাক লাগাতে পারতাম বাবাকেও। সেই সব ম্যাজিকদের এখনো কাজে নামতে দেখি! বাচ্চারা খুব সহজে পটে যায়, কাঁধে চড়ে। তাদের কেউ কেউকে নতুন ডাকনাম দিই, কার্যকরও হয়। সেই সব কেউ কেউ বড় হলে সেই সব ডাকনামে ডাক শুনবে না?! আমারও ডাকনাম জুটেছে বিস্তর। কলেজে প্রথমের এক আড্ডায় বন্ধু সাইরুল (যার ডাকনাম সিন্টু) আমার ডাকনাম জানতে চাইলে তৎক্ষণাৎ নিজের একটা ডাকনাম দিয়ে বললাম, দুষ্টু। নামটা আমাদের ছোটখাটো কলেজটায় ছড়িয়ে গেল। এখন যে কেউ আমার শোনার পরিধির মধ্য থেকে দুষ্টু নামে ডাকলে আমার খেয়াল তো সেদিকে দৌড়াবেই। একটা মিথ্যে কী করে সত্যি হল!?... ভাবতে গিয়ে এক পঙতি হলাম,— ‘মিথ্যে মানতে মানতে এখন পুরোটাই সত্যি !'

          ‘আছে’ অর্থে যতটুকু সত্যি বাঁচে, ‘ছিল’ অর্থে তার অধিক বেঁচে থাকছে। পাঁচ বছর আগে বিধান নগর স্টেশনের কাছেই একটি চায়ের দোকানে তখনকার একটি টিফিন ক্যারিয়ার হারিয়েছিলাম। আজ কোনও এক কারণে মায়ের বকুনিতে উঠে এল সেই টিফিন ক্যারিয়ার! সঙ্গে মায়ের আফসোস, ‘আমি কেন এত হারাই?!’ অথচ টিফিন ক্যারিয়ারটি না হারালে বড়জোর আর এক বছর টিকত। হারিয়ে যাওয়ায় তার আয়ু যেনও বৃদ্ধি পেল। সেই হিসাবে বছর সাতেক আগে দিঘায় হারানো রিপার প্রিয় গামছাটাকে এখানও চোখের সামনে ঝুলতে দেখি। ‘হারানোর আপসোসে জীবন খানিক রুচি নির্ভর হল / হারানোর পুণ্যে কোনও কিছুই আর জরুরি থাকছে না !’

          তবুও আপসোসটাকে জরুরি ভাবছি কেউ কেউ। হাবড়া স্টেশনে সন্দীপদা চায়ের ভাঁড়টি তুলতে তুলতে সেদিন বলেছিল, ‘তোদের কবিতা বুঝি না কেন রে? রবীন্দ্রনাথকে তো বেশ বুঝতে পারি’। পরিহাসে না গিয়ে তার কাছে ‘গীতাঞ্জলি’র দুটো লাইন বুঝতে চাই,— ‘তোমায় আমার প্রভু করে রাখি / আমার আমি সেইটুকু থাক বাকি ’। তার চুপ থাকায় আমি গল্পসহ মজাদার খেলা বসাই। বলি, ‘চলো, তোমার কাছে একটা কবিতা সহজ করি। এই যে তুমি মাটির খুরিতে চা খাচ্ছো; কাচের ছোটো-ছোটো গ্লাসে চা খেয়েছো কখনও?’ সন্দীপদার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ানোতে ফের শুরু করলাম,— ‘ধরো এই মাটির খুরির উপরে সেই ছোট্ট একটি কাচের গ্লাস রাখা হল তার উপরে আবার মাটির খুরি...তার উপরে ফের কাচের গ্লাস… আবার মাটির খুরি… কাচের গ্লাস… মাটির খুরি… কাচের গ্লাস… মাটির খুরি...। এই ভাবে একটার উপর একটাকে বসিয়ে যেতে যেতে বিরক্তি সন্দীপদার মুখে খিস্তিসহ বাক্য গঠন করল—‘ধুর বাল, এটা কি কোনও কবিতা হল নাকি?!’ এবার ধরনাটাতে সেই খেলাটাই খেল্লাম যেটা আমার সাথেও অনেকে খেলেছে। বল্লাম— ‘সন্দীপদা, তুমি শুধু গ্লাস আর খুরিগুলোকে দেখলে?? এই যে এতক্ষণ ধরে একটার উপর একটা কী দারুন সুনিপুণভাবে একত্রে সাজালাম তার ব্যালান্সটুকু দেখলে না!!

          ‘তোমার সাপেক্ষে আমি ঢেউ / তোমার সাপেক্ষে আমি কেউ নই / ভায়োলিন ছাড়া ’  —আসলে বাইরের রূপের সাথে অন্তরের বুঝের মিল হওয়া খুব মুশকিল। বাইরের রূপের গায়ে বুদ্ধি খুব সহজে এসে জড়ায় আর ভেতরে থাকে আধ্যাত্মিকতা। এ বেটা এমনই যে জয় পরাজয় মানে না। কিন্তু সন্দীপদা যে পরাজয়টা মেনে নিতে পারেনি তা তার তর্কে পরিস্কার হল। তর্কে ট্রিপ পাবনা বলে হেরে গেলাম। জ্যোতিষ শাস্ত্রে বলা হয় যে, ‘মানুষের পাওনা তার উপর সময়ের প্রভাব দ্বারা সূচিত’। সেই হেতু সন্দীপদার আদলে নয়, নিজের আদলের মধ্যেও আলো পরিমাণ আধার আছে। আছে আমার পুরনোর সঙ্গে নতুনের এক অপরাধ বোধের ফারাক— ‘এসেছি খুনির মত চুপচাপ কতবার কত /পুরনো লেখার কাছে নতুন লেখার গায়ে দেখ আজ / অপরাধী অশ্রু লেগে আছে। ’

          এই চিরাচরিত আমরা পুকুরের সাথে টুকুরকে আনি। সেই হিসাবে পথের সঙ্গে ঘাট। আমরা মিলে গেলে যে কী আনন্দ পাই! আমিও লক্ষ্য করে দেখেছি, যাপনের মিলেরা বরাবর বন্ধুনির্বাচন করে আসছে। অনুপম রায়, চাঁদপাড়া আর্ট কলেজে তুষারের ক্লাসমেট ছিল, থাকত অশোকনগর। বোধহয় তুষারের পাল্লায় পড়ে কবিতা ভালবাসতে শুরু করেছিল। আমিও শোনাতাম মাঝেমাঝে। একদিন তার আঁকা পাঁচ ফুট বাই পাঁচ ফুটের একটা ছবি স্টেশনে নামাতে গিয়ে ভেঙে গেছিল। তারপর আরেকদিন একটি কবিতা শুনতে গিয়ে চমকানো আনন্দ পেয়েছিল খুব,— ‘ছবি ভাঙে না, কাচ ভেঙে যায়।’ 

          এই যে কাঁচ ভেঙে গেল; ফলত ছবিটি সুবিধেহীন হল। সংকটমূলক আপসোস এল। মূলত আমাদের সুবিধের প্রয়োজন, আমাদের সকল কিছুই সুবিধার পানে। আমাদের যারা রক্ষক তারাও এই মহান সুবিধা-কর্মে আমাদের রেখেছেন। আমাদের কাল ফুরলে সুবিধার বহুবর্ন ইউনিফর্মটি অন্যের গায়ে তাঁরাই চড়িয়ে দেবেন, দেরি করবেন না। ‘সুবিধে’ কখনও ফেলে রাখতে নেই, বিস্ফোরণের সম্ভাবনা।  সম্ভাবনা প্রসঙ্গে বরাবর দেখেছি অনুমান দায়ী,— ‘ঐ শিশুটি কি জানে, / পৃথিবীর কোনও সত্যই শেষ সত্য নয় /শব্দ লেখা হয় অনুমানে। ’

          অনুমান; তবু তা নিয়ে কত দাপট আসছে, কত দম্ভ! অথচ জীবন মানেই তো জল, তাই হয়ত লেখালেখিকে বরাবর ঐ জলে দ্রবীভূত ডাঙা ভেবে আসছি। তৃষ্ণা মিটেছে কারো শুনিনি এখনও। অথচ আয়ু থেকে বয়স বসার সাথে সাথে জীবনের নানান নাচ, গান, ভায়োলিন বাজানো, ছবি আঁকা, ভালো রাখার কিছু সম্পর্ক সব ছেড়েছে আমায়। কী অদ্ভুত, কবিতা লেখা বহুত লক্ষ্য বদলেও সঙ্গে! আসলে কষ্টটা নিজের হলে কাউকে বিশেষ বোঝাবার থাকে না। প্রত্যক্ষ করি,— ‘নিজেকে নিজের থেকে বেশি আর পাব না কাউকে ’। তাই তার ঝাঁজ কমানোর জন্য লেখাতে উগরাই। আমার নাকাল যত বাড়ে তার ঠেকনায় নামাই আমার নকলকে। আমাকে নকল করে লেখা...।  তারা আমার এমন সব সন্তান তাদের ক্ষমতাকে বাড়তে দেওয়া জারি থাকে ।

          কবিতার ক্ষমতা প্রসঙ্গে কেন জানি না সেই ঘটনাটি উঠে এল। একদিন বাড়িতে এক সন্ন্যাসী এলে বাবা জিজ্ঞাসা করলেন,— ‘আপনার  সন্ন্যাস জীবন কত দিনের?’  সন্ন্যাসী বললেন,— ‘২০ বছরের’। বাবা বললেন,— ‘এমন শক্তি কি অর্জন করতে পেরেছেন যে ওই দূরের লাঠিটা এখানে বসে থেকেই এখানে হাজির করবেন?’...সন্ন্যাসী মাথা নড়ালেন  ।  —‘আমি পেরেছি, দেখবেন?’ বলেই বাবা ডাক দিলেন আমাকে।  আমি তার একমাত্র পুত্র । কবিতার এহেন ক্ষমতার কথা শুনে প্রিয় সুকুমার খিক করে ফিসফিসালেন,— ‘ফুল ফোটে? তাই বলো ! / আমি ভাবি পটকা!’

          লেখালেখি আদতে অপেক্ষার পটকা। ফোটার পুরোটা তো ক্লাইমেক্সেই ঘেঁটে আছে। এই যেমন, আমার ফোনে কনফারেন্সে পিকা, সম্বিত পাক্কা এক ঘন্টার উপরে! কোনও মেয়ে নেই! ভাবা যায়?! পিকা বলছে, ‘কথাগুলো রেকর্ড করা দরকার ছিল’। সম্বিত বলছে, ‘চূড়ান্তটা এখানে চূড়োন্ত হবে’। কেয়া বাত।  চূড়োন্ত আসতেই মাথায় ক্যাপ্টেন তন্ময়ের মামাবাড়ি এলাকায় জীবনের প্রথম সরব বুদ্ধপূর্ণিমা যাপনে পুকুর সংলগ্ন মাঠের চুড়োয় ভ্যানগগের ছবির নিচে বসে থাকা সেই সব ক্লাইমেক্স মুহূর্তরা এল। ক্যাপ্টেন, পিকা, পার্থ, অনুপ,আমি। পরের দিন ঝাড় খাবে জেনেও পিকার বোলপুর ফেরা হল না। অথচ যাপনের এই ক্লাইমেক্সকে পাত্তা না দিয়েই ভাস্কর আমাকে পরামর্শ দিচ্ছেন,— ‘লিখুন: বন্ধু  বন্ধু  বন্ধু। আমরা হতভাগা। বন্ধুত্ব দিয়ে আমাদের সম্পর্ক শুরু হয় / শেষ হয় খিস্তিখেউরে। ’



উদাহরনের পঙক্তিতে সঙ্গে আমার এলেন যারা,— রাণা রায়চৌধুরী, দেব মাইতি, আবীর সিংহ, শমীক শণ্ণিগ্রাহী, রবি ঠাকুর,সুমিতেশ সরকার, বিভাস রায়চৌধুরী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, শায়ক মুখোপাধ্যায়, সুকুমার রায়, ভাস্কর চক্রবর্তী। 

❑ গদ্যটি পূর্ব প্রকাশিত, তাহলে ওই কথাই রইল, ২০১৪ 


আমাদের শৈশবখানা ❑ ঋপণ আর্য

Anyone who does anything to help a child is a hero to me. ”    —Fred Rogers প্রায় দুই দশক ধরে আমার অন্যতম একটি শখ হল চাইল্ডহুড ফ...