কিন্তু কই স্বাধীনতা ফাইভে? বিশেষত মুকুল স্যারের ক্লাস, যার চশমা সবসময় নেমে আসতো নাকের ডগায়। চশমা নেমে যাওয়া ফাঁকা জায়গা দিয়ে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছড়িয়ে পড়তো ক্লাসময়। যার উপর স্থির হত সেই দৃষ্টি, সে সব মুখস্ত ভুলে যেত। মুকুল স্যার তখন কাছে ডাকতেন তাকে। ‘ ওহে বালক এদিকে এস। তারপর, পড়িসনি কেনও? কোথায় বাড়ি? বাবার নাম কি? বাবা কী করে? ইত্যাদি অহেতুক প্রশ্নের তালে তালে নির্দিষ্ট দুই জায়গায় (পিঠে ও পাছায়) বেত কষাতে থাকতেন। আমরা গুনতাম। ৪০টা হাইয়েস্ট। যে সেই ৪০ মারটা খেয়েছিল দুদিনের মাথায় ফের তার স্যারের কাছে যাওয়ার তলব এলে মুখফস্কে সে বলে ফেলেছিল,
-পৃথিবীতে স্যার আপনি আমার সবচেয়ে বড় শত্রু!
তারপর থেকে পেটানো বন্ধ না হলেও তাকে আর পেটাতেন না স্যার। যতদিনে বুঝেছিলাম, স্যার তাদেরই পেটাতেন যারা তাকে ভয় পেত, সাহস থাকলেই পার পাওয়া যায় । ততদিনে মগের মুলুক ক্লাসটারও সন্ধান পেয়েগেছিলাম। ফাইভে তখন নিয়মিত চতুর্থ পিরিয়ডের পরে ছুটি হত। চতুর্থ পিরিয়ডে কুমুদ স্যার ইতিহাস পড়াতেন। এমনিতে স্যার ছিলেন শান্ত। কিন্তু ক্লাসে শব্দ হলেই ক্ষেপে যেতেন। তখন খুব পেটাতেন শব্দকারীকে। ক্লাসে আমাদের আগের দিনের পড়া মুখস্ত লিখতে হত। দুপাতার কম লিখলে হবে না। যে আগে দেখাবে তার ছুটি। স্যার পড়েও দেখতেন না সে সব জমা পড়া খাতা, অথচ টিকচিহ্ন বসাতেন আর ছুটি দিতেন। আমরা তাই উত্তরের খাতায় প্রথম দু-তিন লাইন পড়া লিখতাম তারপর লিখতাম মুখস্ত হয়ে যাওয়া গান, কবিতা আর ইচ্ছাখুশির রচনা। আমার প্রথম ব্যাক্তিগত লেখালেখির ভাষাপাঠ হয়ত ওই মগের মুলুকের ক্লাস থেকেই। কুমদস্যার নাকি বিঘাত মেপে নাম্বার দিতেন পরীক্ষার খাতায়, অতীতে এক ছাত্র নাকি তার কাছে ১০০-র পরীক্ষায় ১১০ পেয়েছিল। কথাগুলো অমুলক লাগেনি। কুমুদস্যারের পুরো বিচার ব্যাবস্থাই ছিল মগের মুলুক। অথচ স্কুলে ক্লাসের বাইরে ছাত্রদের গণ্ডগোলের বিচারের ভার ছিল তার উপর। তার বিচার ব্যবস্থায় অন্যতম রুল ছিল, যে দুজন বা তিনজনকে নিয়ে বিচার তাদের প্রত্যেকের ব্যাক্তিগত অভিযোগ আলাদা আলাদা ভাবে শোনা হবে, কারো আভিযোগের ভিতর অন্য কোনো অভিযোগকারী কথা বলে ফেল্লেই তখন সেই অন্য অভিযোগকারীকে ক্যালান দিয়ে বিচার শেষ। আসলে কুমুদস্যার শাস্তিদানের সময় তুঘলকের মতোই অপরাধের গুরুত্বকে বিবেচনা করতেন না। তখন বাংলাদেশ থেকে বড় বড় ছেলেরা এসে এইট-নাইনে ভর্তি হত। কিন্তু বড় তারা গতরে, মোটেও চটপটে নয়, আদপ-কায়দা, কথাবলার ধরন যেনও কেমন ন্যতানো । আমরা স্কুলের দোতালার বারান্দা থেকে ওদের লক্ষ্য করে নিচে ঢিল ছুড়তাম। লেগেও যেত দুয়েকটা। কয়েক দিনের মাথায় তাড়া করে তারা ঠিক ধরেও ফেলল। কুমুদস্যার আগে তাদের কথা শুনলেন। আমি চুপচাপ। স্যার যখন আমাকে শুনতে চাইল, কেনও আমি ওদের রোজ ঢিল ছুড়ি? আমি হাত কচলে কাচা মিথ্যেকথা বলতে শুরু করেছিলাম, “ স্যার রোজ না, আজকে যখন সাইকেল চালিয়ে স্কুলে ঢুকছিলাম তখন ওই দাদাটা আমাকে থামিয়ে বলেছিল, সাইকেল নাকি তার গায়ে লেগেছে, তাই আমাকে ডান কানজুড়ে একটা চড় মেরেছে। স্যার, কানটা এখনও টনটন করে যাচ্ছে। তাই...’ আর এগতে হল না। এতটা টাটকা মিথ্যে কথা বাংলাদেশ থেকে আসা সরলসোজা ক্লাস এইটের দাদাটার সহ্য হয়নি। সে চিৎকার করে বলতে শুরু করেছিল, ‘স্যার ও সব মিথ্যে বলছে।’ ব্যাস আর যায় কোথায়। বিচার শেষ। কুমুদস্যারের তুঘলকি আইনে দাদাটির ক্যালান খাওয়া বেশ উপভোগ করেছিলাম বটে কিন্তু সাবধান হইনি। ফলত কয়েক দিনের মাথায় ফের ঢিল ছোড়া জারি হল। এবার তারা আর কুমুদ স্যারের কাছে নিয়ে গেল না। তারা বলল, চল তোকে পালসারে চাপাবো! নিয়ে গেল সহ প্রধান শিক্ষক নারায়ণ পালের কাছে। তাদের কাছে স্যার হয়ত আগেই শুনেছিলেন, তাই আমার সামনে আর তিনি নতুন করে কিছু শুনলেন না। কেবল তাদের একজনকে একটা নতুন ব্লেড কিনে নিয়ে আসার দায়িত্ব দিলেন। আমার ভেতর শুকিয়ে কাঠ। ব্লেড দিয়ে কী করবেন স্যার?! স্যার আমাকে একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বসতে বললেন। দশ...পনের...কুড়ি মিনিট যায় সেই দাদাটিও ব্লেড কিনে ফিরছে না! আর স্যারও আমাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলছেন না! আমার কান্না পেয়ে গেছিল। এবার স্যার এগিয়ে এলেন, পিঠে হাত বুলিয়ে মনে করিয়ে দিলেন বিদ্যাসাগরের বোধদয়ের ঢিল ছোড়ার সেই গল্পটা। আরও বললেন, আমার ঢিল ছোড়ায় যদি ওই দাদাটির চোখ নষ্ট হয়ে যেত তাহলে আমাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যেত, ডাক্তার আমার চোখ দুটো তুলে সেই দাদাটিকে পড়িয়ে দিত। তখন কোনও আয়নাতেও আমি আমাকে দেখতে পেতাম না! সেদিন সেই পুরনো গল্পকে ভাঙিয়ে কী অমাইক মন্ত্রের মতো ভাষাপাঠ দিয়েছিলেন।
সেই প্রথম পালস্যারকে বিস্তারে পেলেও ফাইভে তার ক্লাস পাইনি। সিক্সে ক্লাস পেলেও কোনো নিয়মিত রুটিনে পাইনি। সেভেনে পেয়েছিলাম বাংলার ক্লাসে। তার আগে সিক্সের এক টিফিন পার করা দুপুরে স্কুলের বাইরের রাস্তায় ‘বিচিত্রা’ দোকানের সামনের খেলা শেষ না হওয়া জনা কয়েক আমরা। হঠাৎ বুঝতে না দিয়ে বেত হাতে পেছনে উদয় হলেন পালস্যার। ধরেও ফেললেন আমার ডানা। বাকি সব বন্ধুগুলো স্কুল মুখো ধাঁ...। স্যার বেত উচু করতেই বিষন্ন আমি বলেছিলাম, ‘স্যার, আমার খুব খিদে পেয়েছে’। স্যার হাত ধরে বটতলার মিষ্টির দোকানটায় নিয়ে গেছিলেন। আমি বাড়ি থেকে টিফিন এনেছি কিনা জানতেও চাইলেন না। আমার টিফিন তৃপ্তি তার মুখে ফুটে উঠতে দেখেছিলাম। আমাকে নিয়ে তার স্কুলে ফেরায় কেমন একটা জড়িয়ে থাকা ছিল, বেতটাকে আর বদমেজাজি মনে হচ্ছিল না।
বেত স্যারের সঙ্গে এলেও ক্লাসে কোনো বেতবাজি ছিল না। রসিক মানুষ স্যার দারুন গলা বাজাতেন যা পুরো ক্লাসটাকেই চুপ রাখতো। তখন স্যার আমাদের পুরো অঞ্চলটার ভাষার উপর দিয়ে চোষে বেড়াচ্ছেন ভাষা খুঁজতে। নাংলার বিলের ইতিহাস লিখতে গিয়ে আমাদের গ্রামেরও ইতিহাস লিখে ফেলেছিলেন। আমার বাবা-দাদারাও জানতেন না, নাঙলার বিল অতীতের ব্যবসা বানিজ্যের সেই জলপথ, যা পদ্মানদী নামে উত্তর বঙ্গের সাথে যোগাযোগ রাখতো। রুদ্রপুরের উপর দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত সারবেঁধে প্রসারিত জোড়া পুকুরগুলো আসলে সেই পদ্মার শাখানদী, নাম ছিল সুতানটী। আমার ইতিহাস বই জানতো না, আকবর সেনাপতি মানসিংহ যোশর রাজ প্রতাপাদিত্যের কাছে জলপথে দুবার পরাস্ত হয়ে যে স্থলপথে যোশরে পৌঁছান, সে পথ রুদ্রপুরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গৌরবঙ্গ রোড। বইটা প্রকাশ পাবার পরে বিচিত্রায় পাওয়াও যেত দেখতাম। কিন্তু আমার ওই বয়সটা কমিক্স সংগ্রহে আরও বেশি উৎসাহী ছিল। অমনি মনেপড়ে গেলো, আমি আর মানস প্রতি কমিক্স দুটাকায় তিনদিনের মেয়াদে স্কুলে ভাড়া খাটাতাম । নতুন কমিক্স কেনার জন্য বাবার কাছে ঘ্যান ঘ্যান উধাওগুলো কী দারুন হাততালির মতো উপভোগ করতাম! সেই স্কুলবেলার অনেক বাদে ‘পুরতত্ত্বে নাংলা বিলের এপার ওপার’ বইটি পড়তে গিয়ে স্যার আমার প্রপিতামহ হয়ে উঠেছিলেন। অবশ্য তার প্রতি শ্রদ্ধা স্কুলবেলাতেই আমাকে পেয়েবসেছিল।
শ্রদ্ধার একটা ভয় আছে, বিবেচনা বোধ আছে। তাই আমার দুষ্টুমিরা স্যারকে এড়িয়ে চলত । ক্লাস এইটের স্কুলস্পোর্টের দিন হাতে একটা কালো রবারের বালা পড়ে এসেছিলাম স্কুলবন্ধুদের দেখাবো বলে । সেদিনের এদিক-সেদিক ছুটোছুটির ভেতর পালস্যারের মুখোমুখি হতেই দ্রুত হাতটাকে পেছনে লুকিয়ে নিলেও তার চোখ এড়াতে পারিনি। কড়া সুরে তিনি দেখতে চাইলে হাতটা সামনে এনে ‘খুলে ফেলব স্যার’ বলেই খুলতে যাচ্ছিলাম। তিনি বাঁধা দিয়ে নরম সুরে বললেন,’আমি কি বারন করেছি? আর আমার কথায় এখন খুল্লেও তুমি ফের পড়বে। তারচেয়ে তুমি ওটা পড়েই থাকো । তোমার যেদিন মনে হবে, ওটা তোমার যোগ্য না, একমাত্র সেদিনই খুলবে’। সেদিন কী বুঝেছিলাম ঠিকঠাক মনে নেই, তবে স্যারের চলে যাওয়ার পরেও বালাটা পড়ে থাকাতে খুউব অস্বস্তি হচ্ছিল।
আমার ক্লাস নাইনেই পালবাবু স্কুল ছাড়েন। সেই ছেড়ে যাওয়ার মনখারাপ মনে নেই। তবে এখনো তার সাথে দেখা হলেই স্কুলবেলার সেই ‘এড়িয়ে চলা’রা মনেপড়ে সান্তনা খোঁজে। বুঝতে পারি, তখন সময় হন্যে হয়ে আমার পেছন ঘুরতো। এখন আমি সময়ের পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে হাতড়ে বেড়াই সাদাজামা-নীলপ্যান্টের সেইসব দৈনন্দিন ভাষাপাঠ, যারা আমার মগের মুলুক তুলে এনে বাথরুমে সীমাবদ্ধ রাখতে শিখিয়েছিল। আমার দিনের অপ্রাপ্তমনষ্ক মগের মুলুক এখনও বাথরুমে কাটায়।