Sunday, November 15, 2020

ব্যথার সংসার,কী বুঝতে যে কী বুঝলো! ❑ ঋপণ আর্য

এক নিষ্ঠুর গরমকালের ছেলেবেলায় হিমুদের পুকুরের জলে একটা শুকনো বাদামপাতায় কিছু পিঁপড়ে তুলে ভাসিয়েছিলাম। পাতাটা ছিল জাহাজ আর পিঁপড়েগুলো সেই জাহাজের নাবিক। সে এক মজাদার খেলা। জাহাজ ভাসছে তার উপর নাবিকরা এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছে। বাবার তাড়া খেয়ে জাহাজটি না তুলেই স্কুলে চলে গেছিলাম। ভেবেছিলাম, বাড়ি ফিরে বিকালের স্নানে আমার সেই নাবিকদের উদ্ধার করবো। কিন্তু কোথায় সেই নাবিক! কোথায় সে জাহাজ আমার! সারা পুকুর দাপিয়েও খুঁজে পাইনি। ভীষণ মনখারাপ, কাউকে বলতেই পারিনি আমার কারণে তাঁরা নেই, মা-কেও না, কেবল পাপের ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বেরিয়েছি। এমনকি যখনই সেই ঘটনা মনে পরতো তখনই ব্যথা পেতাম। এই যে লিখছি এখনও যেন ব্যথারা হুহু করে জাগছে । জানি সেইরকম পাপবোধ আর জীবিত নেই আমার ভেতর, তবু সেই ঘটনার মনে পড়ায় ব্যথা কিন্তু আছে। এখন প্রশ্নটা হল, সেইরকম কিংবা তার চেয়েও বড় ঘটনায় ব্যথা পাই না কেন? কেনই বা পাপবোধ জাগে না আর? সেই সরলতা ভেঙে কি অনেক বেশি কুটিল হয়ে গেছি? এই কারণেই কি মানুষসহ সমস্ত প্রাণীদের শিশুরা অনিন্দ্যসুন্দর দেখতে হলেও পরবর্তী জীবনে নানান ব্যথার ভার এসে, মিথ্যের ছাপ এসে তাদের চেহারাদের বদলে দেয় এমন?

      চেহারা নয় শুধু যাপনের প্রসঙ্গও বদলে দেয়। পুরোনো অনেক ব্যথাই তখন নিছক মজার প্রসঙ্গ হিসাবে পালিত হয়।  তবু সে ছেড়ে যায় না, সব সময় পাই, হরদম তার ইভেন্ট তৈরিতে ব্যস্ত হই। একজনকে আনন্দ দিয়ে অন্যের ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াই। ধরা যাক, ভারত-পাকিস্তানের খেলা হচ্ছে। ভারত জিতল যেই পাকিস্তান ব্যথা পেল। উল্টোটাও হতে পারে। আসলে আনন্দ দানের ঐ খেলাটাই যে কারো না কারো ব্যথা ছিল। এতটাই প্রশ্রয় দিতে ভালবাসি বলেই তো আনন্দের গান ছাপিয়ে ব্যথার গান অনেক বেশি জনপ্রিয়, আপন হয়ে ওঠে। তার রেখে যাওয়া দাগে রোজ আঙুল বুলোই। তাই হয়ত 'কালোর চেয়ে বেশি সত্যি, ঘা-খাওয়া মানুষ আমরা সন্দেহের চোখে দেখি আলো।'

     আলো ভেবে যে সমস্ত গুণকে একটা মানুষের ভেতর পেয়ে আরেকটা মানুষ জীবনসঙ্গী হিসাবে যাপনে জড়ায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরবর্তীতে দেখা যায় সেই প্রিয় গুণটাই ব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমার মায়ের সরলতাই বাবার পছন্দের অন্যতম কারণ ছিল, কিন্তু এখন দেখা যায় মায়ের সেই সরল ব্যবহার বহুক্ষেত্রেই বাবাকে ব্যথা দেয়। আমার বন্ধুপ্রীতিকে পছন্দ করে যে মেয়েটি যাপনে জড়ালো, আমার সেই গুণটিই তার একসময়ের বেদনার কারণ হল। এমন ঘটনা আরো নানান প্রসঙ্গেই দেখেছি।

      আপাতদৃষ্টিতে একটা সামান্য কথা একটা মানুষ থেকে আরেকটা মানুষে গেলে রূপ বদলে যায়, ওজন বদলে যায়, হিসাব বদলে যায়। ধরাযাক, সেই কথাটা যখন প্রেমিকা বলল, হেসে উড়িয়ে দিলাম। বোন বলল, ধমকি দিলাম। বাবা বললেন, উপদেশ হিসাবে নিলাম। কিন্তু সেই কথাটা যখন একজন বন্ধু প্রসঙ্গ বিশেষে বলল, ভেতরে কোথাও নিদারুণ এক ব্যথা পেয়ে পালটা আঘাতে তাকেই ব্যথা দিয়ে ভারমুক্ত হতে চাইলাম। কিংবা দিলাম না তাকে পালটা আঘাত, সেই বেদনার ঝোপ-জঙ্গল বয়ে বেরালাম কিছুকাল, তাকে দিয়ে বন্ধুটির সাথে মানসিক দূরত্ব গড়লাম। কিংবা খুব কাছের কেউ, যেমন মা, মায়ের খুব সামান্য এক দোষে সেই বয়ে আনা ব্যথার ভার প্রকাশ হল নিদারুণ আঘাতে। এই যে কাউকে পালটা আঘাত হেনে নিজের ব্যথার ভার কমাতে চাইলাম, এমনই তো মানুষ আমরা, নিঠুর পাষাণপুরী। আমরা কেবল পালটা আঘাতেই ব্যথা ছাটি না, একটা ব্যথাকে ঢাকতে আরেকটা ব্যথাকে আঁকড়েও ধরি। আমার হাত কেটে গেছে, হাতে সহ্যাতীত ব্যথা। কিন্তু দেখা গেল পরমুহূর্তে প্রেমিকা আমার, সম্পর্ক ভেঙে চলে গেল। তো কী হল? মুহূর্তে হাতের ব্যথার শোক গেলাম ভুলে। দেখি, প্রেমিকা হারানোর বেদনা তখন আমাকে ফাঁকা ড্রামের মতো কী তুমুল বাজাচ্ছে! তখন আমার এই পরিস্থিতির সমব্যথী কোনো বন্ধু এসে মলম হতে চাইছে। আবার কোনো বন্ধু এই ঘটনায় ঠিক তেমনটাই চরম আনন্দিত, যেভাবে কোনো শোকসভায় কারো কারো নাচার ইচ্ছে হয় খুব। এই যে আরেক বন্ধু এমন ঘটনায় সমব্যথী না হয়ে উপেক্ষা করল, তাকে দেখে যেন আমার কষ্ট বেড়ে গেল হুহু। এমন অনেক চেখে দেখেছি সহ্যাতীত উপেক্ষার বেদনাকে। শিখেছি, কাউকে ব্যথা দিতে হলে তাকে উপেক্ষা করাই অন্যতম পন্থা। হিন্দি একটা সিনেমায় দেখেছিলাম, নায়ক এক একটা মেয়ের সাথে প্রেম করে ধোকা দিয়ে উপেক্ষা করে চলে যাচ্ছিল আরেকটা প্রেমে। কিন্তু শেষে যখন নিজেই উপেক্ষিত হল কারো কাছে, বুঝেছিল আগের প্রেমিকাদের সে কী ব্যথা দিয়ে এসেছে। সে তখন সেই সমস্ত পুরোনোয় ফিরে এসে ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছিল। 

      কিন্তু এই ক্ষমা চাওয়ার সময় আমরা যদি পার করে ফেলি? তখন কী হবে? প্রলয় অনিবার্য? এই আমরা যেমন নিজেদের ব্যথার নিজেরাই কারণ, তেমনি পরিণাম বুঝেও তো প্রকৃতির ব্যথার কারণ আমরা। প্রকৃতি কিন্তু কখনোই নিজের ব্যথা নিজে তৈরি করেনি, অন্যের ব্যথারও কারণ হতে চায়নি । ধরা যাক, ঘোরপাপী আমি, জল যখন পিপাসায় পান করবো তখন সে তার যে যে চরিত্রগুলো বহন করবে, একজন শুদ্ধ মানুষের পিপাসার ভেতর গিয়ে একই তো পরিচয় দেবে। তার কাছে চোর, গুন্ডা, সাধু-অসাধুর কোনও ভেদাভেদ নেই। প্রকৃতি আসলে এতটাই মহান, দীর্ঘকাল তার ক্ষমা ধর্ম দেখে তার ব্যথাকে পাত্তা দিতে ভুলে গেছি আমরা। শুধু প্রকৃতি কেন, শূন্য অচেতন পাত্রেরও তো সহ্য ক্ষমতার একটা সীমা আছে। আমরা কি এখনও টের পাচ্ছি না, প্রকৃতির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা? এরপরেও জীবন্ত বৃক্ষদের হত্যা করে যাবো এমন?

      কথিত আছে আফ্রিকার কঙ্গো উপতক্যা অন্তর্গত বিশেষ এক অঞ্চলের অধিবাসীরা জীবন্ত বৃক্ষকে হত্যা করে না কখনও। কিন্তু তাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকায় তো কাষ্ঠ সংগ্রহের একান্ত প্রয়োজন। তাই তারা কোনো বৃক্ষকে নির্বাচন করে প্রত্যেকেই সেই বৃক্ষের চারপাশে ঘুরে ঘুরে সকাল-সন্ধে গালাগাল দেয়, কষ্টের কথা শোনায়। এভাবে ক্রমাগত চলে কিছু দিন। ব্যথার ভার সইতে না পেরে একসময় বৃক্ষটি শুকিয়ে যেতে আরম্ভ করে এবং মারা যায়।

      মানুষেরও এমন এক ব্যথার মর্মান্তিক তথ্য রেখে গেছেন বিশ্ববিখ্যাত অভিযাত্রী ডক্টর ডেভিড লিভিংস্টোন তার লেখায়। তিনি লিখেছিলেন,  'আশ্চর্য যে অসুখটি আফ্রিকাতে স্বচক্ষে দেখেছি, তা হল হৃদয় ভাঙনের অসুখ। স্বাধীন কোনো মানুষ ক্রীতদাস হওয়ার পরে, দাস-প্রভুদের খোঁয়াড়ে জন্তুর মতো আচরণে পৌঁছে কয়েক সপ্তাহের মাথায় মারা যেত'। লিভিংস্টোন তাঁদের সাথে কথা বলেও জেনেছিলেন, ব্যথা বলতে তাঁরা বুকে হাত দিয়ে দেখাতো, হৃদয়ের অবস্থান যেখানে। ঠিক এই প্রসঙ্গটি তুলেই কবি রণজিৎ দাশ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিকে আঙুল তুলে তার একটি কবিতায় লিখেছিলেন, 'কয়েকশো বছর আগেও মনঃকষ্ট বা শোক মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসাবে চিকিৎসা জগতে স্বীকৃত হত। কিন্তু এখন আর তা হয় না। এখন আর কোনো মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হবে না এই মন্তব্য, ভগ্নহৃদয়ের অসুখে এই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে'।

      আমরা যারা এখনো অ-মৃত তাদের কাছে প্রিয় চরিত্রের মৃত্যু যে কী নিদারুণ বেদনার। অথচ ওই মৃত্যুকে নিয়েই গল্প করতে আমরা যে কী ভালবাসি। এত প্রিয় গল্প আমাদের জীবনে আর কিছু নেই। কর্ণের মৃত্যুর গল্প... ভীষ্মের মৃত্যু... তরুণ কবি অভিমন্যুর মৃত্যু... লোরকার মৃত্যু... বাইশে শ্রাবণ এমন কত যে সঞ্চিত গল্প আমাদের! যেন কোনো শোক নেই... বেদনা নেই... বিষাদ নেই, সবই জ্যোতির্ময় চিরদিনের গল্প আজ। 

      আসলে ব্যথা নিয়েই জন্ম আমাদের, আর মা হচ্ছে সেই ব্যথার আধার, যিনি তিলে তিলে অসম্ভব এক সহ্যশক্তিকে গর্ভে সঞ্চয় করেছেন। এই প্রসঙ্গে মাকড়সা মায়ের কথা মনে পড়ে, তিনিও তার জালে সন্তানদের খাদ্য হিসাবে নিজের শরীরটাকেই বিছিয়ে দেন, সন্তানদের ফালা ফালা করে খাওয়া তিনি সহ্য করে মৃত্যুবরণ করেন। সমগ্র মা জাতিটাই এমন। সেই মায়ের প্রসব যন্ত্রণা অতিক্রম করেই তো জন্ম আমার  কেঁদে উঠেছিল। যতই আমরা ব্যথাকে নানান রঙের হাসি-খুশি-সুখী পোশাক পড়াই না কেন, আনন্দযজ্ঞে ডাকি না কেন, সে হেসে বলবে, 'ঠিক আছে তুমি পালন করো ওসব, আমি বরং তোমার জন্য দরজার বাইরে অপেক্ষা করি'।

      তাই বুঝি রাধা আগাম ব্যথাকে বুঝে কৃষ্ণের সাথে অভিসারে যাওয়ার আগে নিজেকে তৈরি করতে চেয়েছিল? ওঁঝার কাছে মন্ত্র শিখে, সখীদের দিয়ে নিজের চোখ বাঁধিয়ে, উঠোনে জল ঢেলে, কাঁটা বিছিয়ে ব্যথা সহ্যের আগাম পরীক্ষায় হেঁটেছিল সে। যাতে করে গভীর ঝড়-জলের  রাতে পিচ্ছিল কাঁটা বিছানো পথ, সাপ-খোপেরা অভিসারের বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। রাধা মিলনানন্দ পেয়েছিল,  বিরহ ব্যথাও অতিক্রম করে আনন্দ অশ্রুতে ভেসেছিল। কিন্তু 'মাথুর পর্যায়'-কে তো অতিক্রম করতে পারেনি কিছুতে। কৃষ্ণশূন্য সবকিছুই যেন তখন হাহাকার তাঁর, দৃশ্যমান সব কিছুই যেন শূন্য তখন। তাই তো বিদ্যাপতির কবিতায় কী নিঠুর ব্যথায় রাধাকে ডুকরে উঠতে দেখি- 
     'সূন ভেল মন্দির, সূন ভেল নগরী/ 
     সূন ভেল দসদিস, সূন ভেল সগরী'

      আমরা ৯৯ শতাংশ মানুষ 'মাথুর পর্যায়'কে মেনে নিতে পারি না। সেই যে প্রেমিকা ছেড়ে গেল আমায়। একদা দেখা গেল সময় সহ্যের প্রলেপ মাখিয়েছে তাতে।  আমিও হেঁটে চলে গেছি অন্য কোনো প্রেমে। কিন্তু সত্যি ঘটনা এই যে, 'মাথুর পর্যায়'-কে আজও কোনো সমাজ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। সে কোনো মনুষ্যজাতি নয়,  সে হল নেকড়েদের সমাজ। একটি নেকড়ের জীবনসঙ্গী কখনো যদি মারা যায়, তাহলে বেঁচে থাকা নেকড়েটি বাকী জীবনে কখনোই আর কোনো নেকড়েকে জীবনসঙ্গী করে না। হয়ত সঙ্গী হারিয়ে ফেলার ব্যথাটাকে বাকি জীবনটুকু বইবে বলেই এমন তার যাপন।

      আমাদের যাপনে ব্যথাকে সাধারণত দুই পথে পাই, একটি দৃশ্যমান অর্থাৎ শারীরিক, অন্যটি অদৃশ্যমান অর্থাৎ মানসিক। কিন্তু এই দুটির অনুভূতি এক জায়গাতেই তো হয়, মস্তিষ্কে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা অন্যের দৃশ্যমান ব্যথাগুলোয় উতলা হই। এই প্রসঙ্গে একদিন এক দাদা বলেছিলেন, 'দেখবে একটা অ্যাকসিডেন্টে তোমার এক বন্ধুর পা ভেঙে গেলে তুমি বা তোমরা উতলা হয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে ছুটলে, বারবার তাকে দেখতেও গেলে। কিন্তু সেই বন্ধুটি যখন মানসিক গোলযোগে মস্তিষ্কের তার কেটে ফেলল, খারাপ লাগা পেলেও তাকে তো কই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে না? একসময় পাগল আখ্যা দিয়ে কেবল পাশে সরিয়ে রাখলে। ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে তোমার উতলাটুকুও গেল ফুরিয়ে!  ' কী অদ্ভুত!!  এটা কেন হল?! এ কেমন ধাঁধা? আসলে কেউ আর এই শত সহস্র কর্মের সংসারে সহ-কর্মী ঈশ্বরকে ডেকে মনের কথা বলি না যে, তাঁর মনের কথাও তো শুনি না।  যদি শুনতাম একটু সময় নিয়ে এসব বেদনা, তাহলে স্টেশনে যে ভিখিরিটাকে এক টাকাও দিলাম না, তার  ব্যথার গল্পে মনোযোগী নিজেই হয়ত গোটা পকেটটাই উজাড় করে দিতে একটুও পিছপা হতাম না।

      'কেন এমন হয়' ভাবতেই যেন ভেতরে গোপন এক কান্না বেজে ওঠে। যেন এই নিভৃত গোপন অশ্রুপাতের পর কিছুতেই আর বলা যাবে না,--  'এই অশ্রু আমারই সবটুকু!' এর মধ্যে যে এই জগৎ সংসারের কার কতটুকু কীভাবে এসে জড়ো হয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা কারও সাধ্য নয়। এ হল আসলে এক মহা-মিলন। কে এই মিলনের ঈশ্বর, যিনি এমন মেলালেন আমায় জগত সংসারে? সেই মিলন কি পূর্ণ হল আমার ভেতর এসে? বড়ো সংশয় জাগে। এ সংশয় যেন পৃথিবী দাপানো বর্ষার রাতে নিঃঝুম বেদনায় নিজেকে খোঁজার সংশয়। যেন মনে হয়, 'আমি আর পারছি না, কিছুতেই পারছি না, এক্ষুনি হয়ত ফেটে যাবো'। আর তক্ষুনি মা এসে যেন বলেন আমায়, 
 'তুই কষ্টে থাকলে জানবি,/
 অন্য কোনো কেউ তোর অধিক কষ্ট নিয়ে/
 রাস্তা পার হচ্ছে'। 
কী অদ্ভুত! চোখ তুলে দেখি, নিজের জন্য কোনো শোক নেই, ব্যথা নেই আর। ব্যথা যত রাস্তার দুপাশে সার বেঁধে, হাত নেড়ে ডাকছে আমায়। সত্যিই তো, এই বেদনাঘোর জগতে কারণে অকারণে কত কত ব্যথা দিয়ে ফেলেছি প্রিয়জনে! কত কত অখুশি করেছি! কী নিদারুণ তার ভার! সেই দায়ভারই এখন উপলব্ধির মালিক আমার, আগে জানলে হয়ত গুরুত্বটা এমন হুহু করে মরম ছুঁতো না, কাঙালের মতো মনে হত না, 'ব্যথার এই সংসারে আমাকে বাঁচতে গেলে যে করেই হোক আমার চারপাশের মনগুলো ভাল রাখতে হবে'। নাগালের জল-মাটি, গাছ-পাখি, মানুষ-রাস্তা একবার হাসতে শুরু করলেই যেমন হাসিয়ে ছাড়ে গোটা মরশুমকেই, মন ভালর এমন সংক্রমণ চাই। মানসিক বিচলিত পাশের মানুষটিকে শুনতে শুনতে এই যে বুঝতে পারছি, ব্যথারও তো জ্বর হয়। আমি আমার সমস্ত অন্তঃকরণ ঢেলে তাঁর জলপট্টি হতে চাই। আর সন্ধ্যা শেষে সেই বিছানায় পৌঁছাতে চাই যেখানে ব্যথা এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলবে, এই তো, দ্যাখ, এখন তোর আর কোনো অসুখ নেই।

Sunday, November 8, 2020

এতো আবেগ ক্যা রে! ❑ ঋপণ আর্য

—সিকান্দার বক্সের মতো আমি নিজেরে এই একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি। আবেগে গদগদ দেখে নিজেরে শাসাই, 'ভালোবেসে ফেলিস যারে খুব, তার কাছে এতই সহজলভ্য, ঠুনকো কেন হয়ে যাস বারেবারে তুই! এত এত ঘটনায় অন্তে এসে এবার তো শুধরে যা বাপ!'

ভালোবেসে সহজে অন্যের আবেগের অংশীদার হই। আক্রন্ত হই। কিন্তু অন্যের আবেগে জড়িয়ে তার আবেগ হয়ে ওঠা বহু ক্ষেত্রেই ভালো কথা নয়। কালো কথা, কাজ-কম্ম, প্রতিবাদ, কান্না, ভালোবাসা আবেগে নামলেই বেগ বেড়ে যায়। আবেগ তখনই ন্যাকামো লাগে, যখন ভালবাসায় বাস্তবজ্ঞান জাগে। মাতাল, আবেগে বালিশটিকে ক্রমাগত চুমু খেয়ে জাগাতে চায়। বালিশ তো সেই থেকে মাটি, আবেগ তুচ্ছ করা মাটি।

তুচ্ছ আবেগেও গান আসে। আবেগ একবার গানের নাগাল পেলে আরও মজে যায়। আবেগ বেশি সংযত হলে গান হবে না,  কিন্তু সংযত আবেগ হবে কবিতার!  তাই সব গান কবিতা নয়। আলোক সরকারের 'উতল নির্জন' বইটি প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশ চিঠিতে লিখেছিলেন,-- 'প্রীতিভাজনেষু, আপনার কবিতায় এত আবেগ কেন... আবেগকে সংযত করুন'।

আসলে আবেগের ভিতর থাকলে তার গান হওয়া যায়, কিন্তু আবেগকে চিনতে পারা যায় না। তাই খানিক দূরত্ব। নারী থেকে ফুলের দূরত্বে, নারী থেকে চাঁদের দূরত্বে তবু যাবো না। তারা তো প্রাকৃতিক নিয়মের, তারা এসব পারে না, নারী পারে চাঁদ-ফুল দুটোই সাজতে। তৈরি করা সৌন্দর্যের তো মৃত্যু নেই।  যা নেই তাকে আবেগ অধিকার করলেও মৃত্যু কী করে অধিকার করবে?

Thursday, July 23, 2020

কবিতার সত্যি... কবিতার মদ... ❑ ঋপণ আর্য

'আমি বৃষ্টিমুখর দিনে প্রায়ই সাহেববাঁধের পাড় ধরে হাঁটি, গান গাই, আর পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করি কোথাও। কিন্তু পারি না। একজন শিল্পী কোথাও পৌঁছোতে পারেন না। তিনি শুধু রওনা দেন মাত্র। '

❑ 

কে বা কারা যেন আমার ভিতরে রোজ বাজার বসায়। অনেক কিছুর সঙ্গে তারা আমাকেও একটু একটু করে বিক্রি করে। তবু এখনও যেকোনও সম্পর্কের শুরুর আগে স্পর্শের কথাই ভাবি, কবিতা লেখার ক্ষেত্রেও। ছেলেবেলা থেকে পড়াশুনার অভ্যাসটা ঢোকে কমিকস থেকে। কতদিন যে বাবার পকেট থেকে টাকা ঝেড়েছি গল্পের বই কেনার জন্য...ইয়ত্তা নেই। বাবা আমার ধীরে ধীরে বন্ধুজন। তিনি বলতেন, তার সময়-অসময়কে আমার বুঝতে হবে। বুঝেছি যতটা শিখেছি মাত্রাতিরিক্ত। মন্দরাও হুড়মুড়। আমার পড়াশুনা একেবারে পাতি লেবেল থেকে উঠে আসা। অখাদ্য পেলেও গিলতাম। তবে পাঠ্যের বাইরে বিস্তারিত ভাবে প্রথম কবিতাপাঠের ঘটনা অদ্ভুত, তখন ক্লাস সেভেন, লক্ষ্মীপূজার দিন বাবা আমাকে ১০টাকা দিয়েছেন বাজি কেনার জন্যে, আমি বাজারের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে ৩টাকা দিয়ে জীবনানন্দের ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ কিনে ফেললাম। বাকি টাকাগুলো খরচের সঙ্গে মনে থাকার মতো আরও কতকিছুই যে মনে নেই অথচ কী অদ্ভুত সেই ৩টাকা খরচের কথা এখনো মনে আছে!

          ক্লাস নাইনে হুমায়ুনের ‘হিমু’ পড়েই হিমু অ্যাডিক্টেড হয়ে যাই। হিমুর মতো গভীর রাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তাম, ভালো লাগাদের মুখস্ত করতাম। অনেকে বাবার কাছে নালিশ করেছিল। একবার তো পুলিশে ধরেছিল, হয়ত চেহারার মায়ায় পড়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছিল। ঝাড়টা দিয়েছিল বাবাকে। তবুও বাবা আমাকে কিছু বলেননি। বাবাকে মাঝে মাঝে আমার ঈশ্বর মনে হয়। তারপর থেকে বাবার সঙ্গে আমি আমার স্বপ্নদোষ সহ সমস্ত দোষ শেয়ার করি। ইলেভেনেও বরুণদার কাছে ইংরাজি পড়তাম, লেখালেখির উৎসাহে কত বই যে পড়াতেন! বরুণদার প্রতি শ্রদ্ধা আমার ভয় বরাবর। তাই পড়ার ব্যাচে দাদার খানিক দূরে এককোনায় চুপচাপ থাকতাম। আমার চুপথাকা একজনকে পেয়ে বসেছিল। যেভাবে খাতাগুলো হাত ঘুরে ঘুরে বরুণদার কাছে পৌঁছায়, ফিরে আসার পথও অনুরূপ। এই ফিরে আসার পথেই একদিন সে খাতার ভেতর চিঠি দিয়েছিল, চিঠিটিতে তার নাম ছিল না! নোটের জেরক্সের অক্ষর মিলিয়ে নাম আবিষ্কারে আনন্দ হয়েছিল খুব, নিজেকে তপসে তপসে লাগছিল। কিন্তু কোন ফেলুদাকে শোনাই?... বাবাকে বলেছিলাম।  না, সেই চিঠির সম্পর্কে আর জড়াইনি। মনের সমর্থন না এলে কীসের মীমাংসা? ‘মদ ও জুয়ার চেয়ে ঢের বেশি নেশা হয় মন ছুঁয়ে দিলে ’। মনটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রাধান্যে যায়, প্রাধান্য চায়। যে ছোঁয়াগুলোয় ভেতরটা শীত শীত করে, তাদের দিকে এগোয় ভালো থাকা। ‘সবাই নয়, /কেউ কেউ ভালোবেসে হাত ধরলে চোখে জল আসে। ’

          আদতে চোখের নিশপিশ জুড়ে যাচাই... যা চাইও বটে। আমাদের বাড়ির পাশে বল্টু নামের একজনের দু’বছর যাবৎ খোঁজ ছিল না। তাকে নিয়ে তার বাড়ি ও আমাদের বহুত গল্প জমত। যেই দু’সপ্তাহ আগে জানা গেল সে ছ’মাস হল মারা গেছে অমনি তার বউ বিধবা হল। সবাই ভুলে গেলাম... মাত্র দু’সপ্তাহে! কী অদ্ভুত জোকস! অমনি হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এল, ‘নিরাশার কোনও মায়া নেই ’। —‘নিরাশা’ এখানে যেন সেই নির্দিষ্ট বয়স্ক মানুষ, যার মৃত্যুতে কারও কোনও শোক থাকে না। অথচ জেগে থাকায় ইচ্ছের মৃত্যু নেই! তাই না-থাকা রঙে রেঙে উঠতে লাগল যাপন। আসতে লাগল অজস্র প্রশ্ন। কে যেন বলেছিল, একটা উত্তর যতটা প্রাসঙ্গিক, প্রশ্নটা তার হাজার গুণ বেশি প্রাসঙ্গিক। তখন থেকেই যাপনের প্রশ্নগুলো টোকা শুরু। প্রচুর চিঠি লিখতাম বন্ধুদের। তাদের হিসাবে চিঠিগুলো নাকি কবিতার আদল। কবিতা লেখা তাহলে সেই থেকে। সেই থেকেও কবিতা আমি বহুক্ষেত্রে বুঝি না, তুমি আমার সঙ্গে আছ জেনেও যেমন বুঝি না তোমাকে। পরে যাপনের আপনে মিলে গেলে আবিষ্কারের আনন্দ। অনেক সময় পাঠ সঙ্গে-সঙ্গেই মুগ্ধতা হেতু আক্রান্ত হই। অনেক সময় মুগ্ধতার ব্যাখ্যা নেই, অন্তরযাপনে জাড়িত। অন্তরযাপন কি বড্ড ছায়াকেন্দ্রিক? আমাদের সব পাঠ্যকে ছাপিয়ে যাচ্ছে আলো আর অন্ধকার। যাপনের তাহলে দোষ কই?... ‘যে আলোটার জন্য আমার ছায়া ছুঁয়ে আছে / তোমাকে,  ছায়াটা ঠিক কতখানি তার? / এই যে আমরা সূর্যের ছায়া বলি, চন্দ্রের ছায়া বলি / তা সত্ত্বেও দীর্ঘ প্ল্যাটফর্ম জুড়ে ট্রেনের ছায়াই তো বলি। '

          ছায়াটা সঙ্গ দেয় বলেই বছর বছর এত স্যাডগান হিট হয়। ছায়াটা সঙ্গ দেয় বলেই এত বিষাদ পদাবলি। নিজেকেও মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো মনে হয়। আমার সঙ্গে তখন দিনও কথা বলে না... রাতও না। পৃথিবীটা জমাটবাঁধা চোট হয়ে যায়। যদিও নিঃসঙ্গ কাজ করে যাওয়ার মধ্যে এক ধরনের মদ আছে... শক্তি আছে, একা থাকার শক্তি... একা লেখার শক্তি। ‘একটা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মানেই / আরো একবার নিজের কাছে ফেরা। ' —এই ফেরাটা কখনও বুঝে ফেরা, কখনও না বুঝে। আমারও মনে হয় সব বোঝাগুলো আসলে সময় নির্ভর। ঠিক সময়ের আগে পর্যন্ত সেগুলো ভারি বোঝা হয়ে টেকে। উদাহরণই ভাল ব্যাখ্যা হতে পারে।  সেদিন শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে হাবড়ায় ফিরছি, সঙ্গে শিমুল। দু'জনেই জানালার কাছে এবং মুখোমুখি। বিধাননগর ছাড়তেই ভিড় বাড়ল।  আমার আর শিমুলের কথার মাঝে একজন ভদ্রলোক বারবার এসে দাঁড়াচ্ছিলেন। কথা বলার সময় তার সাইড দিয়ে মুখ বের করে কথা বলতে হচ্ছিল। আচ্ছা, কথা বলার সময় মুখ দেখাটা কি খুব জরুরি? মুহূর্তে একটি কবিতাকে সত্যি হতে দেখলাম,— ‘লাইটা /জ্বেলে দাও কথাগুলো দেখতে পাচ্ছি না। '

❑ 

গত রাতে সম্বিতকে sms করেছিলাম,— ‘কবিতার ক্লাইমেক্স বলতে কী বুঝিস?’। উত্তর এল,— ‘এই বাঞ্চোত, ঘুমো’। উত্তরের এই অংশটুকু ভাস্কর চক্রবর্তীর ‘ঘটনা’ কবিতার সেই অন্তিম লাইন যখন রাত্তিরবেলা আলো জ্বালিয়ে কবি লিখছিলেন ছোট্ট ঘরে বসে। ঠিক তখন ‘রাস্তা থেকে কে যে বললো;/এই বাঞ্চোত, ঘুমো ’। এরকম চমকে যাওয়ার মতো শেয়ার যাদের কান ঝাঁজিয়ে দিল, তাদের বিশেষ ভাবে বলব, মুহূর্তের উপর চোখ রাখতে। আমরা ভীষণ মুহূর্ত নিয়ে বাঁচি। আমার এক বন্ধু বলত, সময় ও ঈশ্বর সমানুপাতিক। অমনি ভাবতে শুরু করেছিলাম, মুহূর্ত ভিন্ন অন্য কিছুতে ঈশ্বর দর্শন নেই তাহলে!!! ‘সময় বলতে সত্যি কিছু কি বোঝায় ! / মুহূর্ত দিয়ে তোমায় ধরে রাখি / জানালা আমার নিভৃত উপার্জন / তোমার তুলনায় তাই বারবার জানালা এসে যায়। '

          ‘তোমার তুলনা তুমি’র মতো জানালার তুলনায় জানালাওয়ালা সেই শোনা শর্টফিল্মের গল্প এই মুহূর্তে আমার কাছে ভাবানুবাদ হয়ে এল। একটা বেশ পুরনো বাড়ির একটি কক্ষে দেওয়ালের যে দিকটায় জানলা সেখানে আরামকেদারায় আধাশায়িত একজন ৮২, চোখে গাঢ় পর্দার চশমা, সময় তবু ঝাপসা যেখানে। কাছাকাছি বিছানায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে ২৫-এর যুবক। এইমাত্র জানালাটিতে একটি কবিতা এসে বসলো। বৃদ্ধ চেল্লালেন,— ‘কী ওটা?’। ছেলেটি পেপার থেকে চোখ তুলে বলল,— ‘চড়ুই’। এবার কবিতাটি জানলা থেকে ঘরে ঢুকেই টেবিলে এসে বসল। বৃদ্ধ ফের চেল্লালেন,— ‘কী ওটা?’। ফের নিজস্ব মনোযোগ থেকে চোখ সরিয়ে গাঢ় স্বরে ছেলেটি বললো,— ‘বললাম তো, ওটা চড়ুই, চড়ুই পাখি’। কবিতাটি টেবিল থেকে কিচিরমিচির শব্দ করতে করতে বন্ধ সিলিংফ্যানের একটি ডানায়। বৃদ্ধ হাঁ করে তাকিয়ে— ‘কী ওটা?’। ছেলেটি বিরক্তিতে— ‘কী সমস্যা! বললাম না ওটা চড়ুই, তুমি একটু চুপ করবে?’। এবার হয়ত কবিতাটি নিজে এই বিবাদের বিষয় বুঝতে পেরে বৃদ্ধের খুউব কাছে, আরামকেদারার ডালে একটু বসেই ফের উড়লো— ‘কী এটা?’...। পেপারটা রোল করে বিছানায় সজোরে কোপ বসাল ছেলেটি এবং চেল্লাল— ‘সেই থেকে বারণ করছি, বারবার একই কথা, যাও বাইরে যাও... যাও...’। কবিতাটিকে আর দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে; বৃদ্ধ কক্ষ থেকে বেরিয়ে পাশের কক্ষে ঢুকছেন। ঘরভর্তি বৃদ্ধের বিভিন্ন কালের কেনা বই ডাই দেওয়া। তাদের মধ্য থেকে লাল মলাটের একটি পুরনোকে তুলে নিলেন। ফের পূর্বের কক্ষে ফিরে এলেন। ছেলের বিরক্তি উপেক্ষা করে বৃদ্ধ পিতা একটি নির্দিষ্ট পাতা মেলে এগিয়ে দিয়ে বললেন,—  ‘পড়ো তো...। পড়ে আমাকে শোনাও...’। ছেলে দেখল, পুরনো ডাইরির সেই পাতাটাই খোলা যেটা তার জন্ম দিনের তিন বছরে পা। পড়তে আরম্ভ করল,— ‘আজ খুউউব আনন্দের দিন। নানান মাপের মজাদার কান্ড ঘটেছে। সবচাইতে মজাদার হল, আজ খোকা একটা চড়ুই পাখি দেখে বাইশ বার জিজ্ঞাসা করেছে,  আমি হাসি মুখে প্রতি উত্তরের সঙ্গে একটি কারে চুমু খেয়েছি।’—এখানেই গল্পটা শেষ। বিক্রিয়াটা শুরু। চড়ুইটি জানলায় বসার পর থেকেই কবিতা হয়েগেছে। ছেলে বুঝতে পারেনি। বাবা বুঝতে পেরেছে স্রেফ অনুঘটক হিসাবে। কবিতা কি তাহলে অনুঘটক? ...কিন্তু গতি যার কোথাও কোথাও প্রধান লক্ষ্য নয় তো! অনেকটা ম্যাজিকের সরব উপস্থিতি। যাতে করে উপলব্ধির সজাগে ধাক্কা খায় মন কেমন করা হাওয়া।

          আমার প্রাইমারি জীবনে ‘বড় হয়ে কী হতে চাই’ রচনায় লিখেছিলাম ম্যাজিসিয়ান হওয়ার ইচ্ছে। গোটা স্কুলবাড়িটাকে ভ্যানিশ করে দিয়েছিলাম। গভীর প্রচেষ্টায় টুকরোটাকরা ম্যাজিক আত্মস্থও করেছিলাম। তাক লাগাতে পারতাম বাবাকেও। সেই সব ম্যাজিকদের এখনো কাজে নামতে দেখি! বাচ্চারা খুব সহজে পটে যায়, কাঁধে চড়ে। তাদের কেউ কেউকে নতুন ডাকনাম দিই, কার্যকরও হয়। সেই সব কেউ কেউ বড় হলে সেই সব ডাকনামে ডাক শুনবে না?! আমারও ডাকনাম জুটেছে বিস্তর। কলেজে প্রথমের এক আড্ডায় বন্ধু সাইরুল (যার ডাকনাম সিন্টু) আমার ডাকনাম জানতে চাইলে তৎক্ষণাৎ নিজের একটা ডাকনাম দিয়ে বললাম, দুষ্টু। নামটা আমাদের ছোটখাটো কলেজটায় ছড়িয়ে গেল। এখন যে কেউ আমার শোনার পরিধির মধ্য থেকে দুষ্টু নামে ডাকলে আমার খেয়াল তো সেদিকে দৌড়াবেই। একটা মিথ্যে কী করে সত্যি হল!?... ভাবতে গিয়ে এক পঙতি হলাম,— ‘মিথ্যে মানতে মানতে এখন পুরোটাই সত্যি !'

          ‘আছে’ অর্থে যতটুকু সত্যি বাঁচে, ‘ছিল’ অর্থে তার অধিক বেঁচে থাকছে। পাঁচ বছর আগে বিধান নগর স্টেশনের কাছেই একটি চায়ের দোকানে তখনকার একটি টিফিন ক্যারিয়ার হারিয়েছিলাম। আজ কোনও এক কারণে মায়ের বকুনিতে উঠে এল সেই টিফিন ক্যারিয়ার! সঙ্গে মায়ের আফসোস, ‘আমি কেন এত হারাই?!’ অথচ টিফিন ক্যারিয়ারটি না হারালে বড়জোর আর এক বছর টিকত। হারিয়ে যাওয়ায় তার আয়ু যেনও বৃদ্ধি পেল। সেই হিসাবে বছর সাতেক আগে দিঘায় হারানো রিপার প্রিয় গামছাটাকে এখানও চোখের সামনে ঝুলতে দেখি। ‘হারানোর আপসোসে জীবন খানিক রুচি নির্ভর হল / হারানোর পুণ্যে কোনও কিছুই আর জরুরি থাকছে না !’

          তবুও আপসোসটাকে জরুরি ভাবছি কেউ কেউ। হাবড়া স্টেশনে সন্দীপদা চায়ের ভাঁড়টি তুলতে তুলতে সেদিন বলেছিল, ‘তোদের কবিতা বুঝি না কেন রে? রবীন্দ্রনাথকে তো বেশ বুঝতে পারি’। পরিহাসে না গিয়ে তার কাছে ‘গীতাঞ্জলি’র দুটো লাইন বুঝতে চাই,— ‘তোমায় আমার প্রভু করে রাখি / আমার আমি সেইটুকু থাক বাকি ’। তার চুপ থাকায় আমি গল্পসহ মজাদার খেলা বসাই। বলি, ‘চলো, তোমার কাছে একটা কবিতা সহজ করি। এই যে তুমি মাটির খুরিতে চা খাচ্ছো; কাচের ছোটো-ছোটো গ্লাসে চা খেয়েছো কখনও?’ সন্দীপদার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ানোতে ফের শুরু করলাম,— ‘ধরো এই মাটির খুরির উপরে সেই ছোট্ট একটি কাচের গ্লাস রাখা হল তার উপরে আবার মাটির খুরি...তার উপরে ফের কাচের গ্লাস… আবার মাটির খুরি… কাচের গ্লাস… মাটির খুরি… কাচের গ্লাস… মাটির খুরি...। এই ভাবে একটার উপর একটাকে বসিয়ে যেতে যেতে বিরক্তি সন্দীপদার মুখে খিস্তিসহ বাক্য গঠন করল—‘ধুর বাল, এটা কি কোনও কবিতা হল নাকি?!’ এবার ধরনাটাতে সেই খেলাটাই খেল্লাম যেটা আমার সাথেও অনেকে খেলেছে। বল্লাম— ‘সন্দীপদা, তুমি শুধু গ্লাস আর খুরিগুলোকে দেখলে?? এই যে এতক্ষণ ধরে একটার উপর একটা কী দারুন সুনিপুণভাবে একত্রে সাজালাম তার ব্যালান্সটুকু দেখলে না!!

          ‘তোমার সাপেক্ষে আমি ঢেউ / তোমার সাপেক্ষে আমি কেউ নই / ভায়োলিন ছাড়া ’  —আসলে বাইরের রূপের সাথে অন্তরের বুঝের মিল হওয়া খুব মুশকিল। বাইরের রূপের গায়ে বুদ্ধি খুব সহজে এসে জড়ায় আর ভেতরে থাকে আধ্যাত্মিকতা। এ বেটা এমনই যে জয় পরাজয় মানে না। কিন্তু সন্দীপদা যে পরাজয়টা মেনে নিতে পারেনি তা তার তর্কে পরিস্কার হল। তর্কে ট্রিপ পাবনা বলে হেরে গেলাম। জ্যোতিষ শাস্ত্রে বলা হয় যে, ‘মানুষের পাওনা তার উপর সময়ের প্রভাব দ্বারা সূচিত’। সেই হেতু সন্দীপদার আদলে নয়, নিজের আদলের মধ্যেও আলো পরিমাণ আধার আছে। আছে আমার পুরনোর সঙ্গে নতুনের এক অপরাধ বোধের ফারাক— ‘এসেছি খুনির মত চুপচাপ কতবার কত /পুরনো লেখার কাছে নতুন লেখার গায়ে দেখ আজ / অপরাধী অশ্রু লেগে আছে। ’

          এই চিরাচরিত আমরা পুকুরের সাথে টুকুরকে আনি। সেই হিসাবে পথের সঙ্গে ঘাট। আমরা মিলে গেলে যে কী আনন্দ পাই! আমিও লক্ষ্য করে দেখেছি, যাপনের মিলেরা বরাবর বন্ধুনির্বাচন করে আসছে। অনুপম রায়, চাঁদপাড়া আর্ট কলেজে তুষারের ক্লাসমেট ছিল, থাকত অশোকনগর। বোধহয় তুষারের পাল্লায় পড়ে কবিতা ভালবাসতে শুরু করেছিল। আমিও শোনাতাম মাঝেমাঝে। একদিন তার আঁকা পাঁচ ফুট বাই পাঁচ ফুটের একটা ছবি স্টেশনে নামাতে গিয়ে ভেঙে গেছিল। তারপর আরেকদিন একটি কবিতা শুনতে গিয়ে চমকানো আনন্দ পেয়েছিল খুব,— ‘ছবি ভাঙে না, কাচ ভেঙে যায়।’ 

          এই যে কাঁচ ভেঙে গেল; ফলত ছবিটি সুবিধেহীন হল। সংকটমূলক আপসোস এল। মূলত আমাদের সুবিধের প্রয়োজন, আমাদের সকল কিছুই সুবিধার পানে। আমাদের যারা রক্ষক তারাও এই মহান সুবিধা-কর্মে আমাদের রেখেছেন। আমাদের কাল ফুরলে সুবিধার বহুবর্ন ইউনিফর্মটি অন্যের গায়ে তাঁরাই চড়িয়ে দেবেন, দেরি করবেন না। ‘সুবিধে’ কখনও ফেলে রাখতে নেই, বিস্ফোরণের সম্ভাবনা।  সম্ভাবনা প্রসঙ্গে বরাবর দেখেছি অনুমান দায়ী,— ‘ঐ শিশুটি কি জানে, / পৃথিবীর কোনও সত্যই শেষ সত্য নয় /শব্দ লেখা হয় অনুমানে। ’

          অনুমান; তবু তা নিয়ে কত দাপট আসছে, কত দম্ভ! অথচ জীবন মানেই তো জল, তাই হয়ত লেখালেখিকে বরাবর ঐ জলে দ্রবীভূত ডাঙা ভেবে আসছি। তৃষ্ণা মিটেছে কারো শুনিনি এখনও। অথচ আয়ু থেকে বয়স বসার সাথে সাথে জীবনের নানান নাচ, গান, ভায়োলিন বাজানো, ছবি আঁকা, ভালো রাখার কিছু সম্পর্ক সব ছেড়েছে আমায়। কী অদ্ভুত, কবিতা লেখা বহুত লক্ষ্য বদলেও সঙ্গে! আসলে কষ্টটা নিজের হলে কাউকে বিশেষ বোঝাবার থাকে না। প্রত্যক্ষ করি,— ‘নিজেকে নিজের থেকে বেশি আর পাব না কাউকে ’। তাই তার ঝাঁজ কমানোর জন্য লেখাতে উগরাই। আমার নাকাল যত বাড়ে তার ঠেকনায় নামাই আমার নকলকে। আমাকে নকল করে লেখা...।  তারা আমার এমন সব সন্তান তাদের ক্ষমতাকে বাড়তে দেওয়া জারি থাকে ।

          কবিতার ক্ষমতা প্রসঙ্গে কেন জানি না সেই ঘটনাটি উঠে এল। একদিন বাড়িতে এক সন্ন্যাসী এলে বাবা জিজ্ঞাসা করলেন,— ‘আপনার  সন্ন্যাস জীবন কত দিনের?’  সন্ন্যাসী বললেন,— ‘২০ বছরের’। বাবা বললেন,— ‘এমন শক্তি কি অর্জন করতে পেরেছেন যে ওই দূরের লাঠিটা এখানে বসে থেকেই এখানে হাজির করবেন?’...সন্ন্যাসী মাথা নড়ালেন  ।  —‘আমি পেরেছি, দেখবেন?’ বলেই বাবা ডাক দিলেন আমাকে।  আমি তার একমাত্র পুত্র । কবিতার এহেন ক্ষমতার কথা শুনে প্রিয় সুকুমার খিক করে ফিসফিসালেন,— ‘ফুল ফোটে? তাই বলো ! / আমি ভাবি পটকা!’

          লেখালেখি আদতে অপেক্ষার পটকা। ফোটার পুরোটা তো ক্লাইমেক্সেই ঘেঁটে আছে। এই যেমন, আমার ফোনে কনফারেন্সে পিকা, সম্বিত পাক্কা এক ঘন্টার উপরে! কোনও মেয়ে নেই! ভাবা যায়?! পিকা বলছে, ‘কথাগুলো রেকর্ড করা দরকার ছিল’। সম্বিত বলছে, ‘চূড়ান্তটা এখানে চূড়োন্ত হবে’। কেয়া বাত।  চূড়োন্ত আসতেই মাথায় ক্যাপ্টেন তন্ময়ের মামাবাড়ি এলাকায় জীবনের প্রথম সরব বুদ্ধপূর্ণিমা যাপনে পুকুর সংলগ্ন মাঠের চুড়োয় ভ্যানগগের ছবির নিচে বসে থাকা সেই সব ক্লাইমেক্স মুহূর্তরা এল। ক্যাপ্টেন, পিকা, পার্থ, অনুপ,আমি। পরের দিন ঝাড় খাবে জেনেও পিকার বোলপুর ফেরা হল না। অথচ যাপনের এই ক্লাইমেক্সকে পাত্তা না দিয়েই ভাস্কর আমাকে পরামর্শ দিচ্ছেন,— ‘লিখুন: বন্ধু  বন্ধু  বন্ধু। আমরা হতভাগা। বন্ধুত্ব দিয়ে আমাদের সম্পর্ক শুরু হয় / শেষ হয় খিস্তিখেউরে। ’



উদাহরনের পঙক্তিতে সঙ্গে আমার এলেন যারা,— রাণা রায়চৌধুরী, দেব মাইতি, আবীর সিংহ, শমীক শণ্ণিগ্রাহী, রবি ঠাকুর,সুমিতেশ সরকার, বিভাস রায়চৌধুরী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, শায়ক মুখোপাধ্যায়, সুকুমার রায়, ভাস্কর চক্রবর্তী। 

❑ গদ্যটি পূর্ব প্রকাশিত, তাহলে ওই কথাই রইল, ২০১৪ 


Monday, July 20, 2020

রুদ্রপুর, ৭৪৩২৭৪ ❑ ঋপণ আর্য





'ছোটবেলায় ড্রয়িং খাতায় যে সব ছবি এঁকেছিলাম,
সেই সবকটাতে একটা করে ঘর আঁকতাম।
রামধনু আমি খুব কম এঁকেছি।
যতবার এঁকেছি-- বেশি স্পষ্ট হয়ে গেছে।' —ঋপণ (39/A)




এক
____

সমস্ত কুরিয়ার থেকে অনেক দূরে
শীতের মাঝামাঝি এখানে সস্তায় মাটি,
শক্তিমান লরি...বড় বড় পুকুর...আর
ক্রমশ পাড় ভাঙার শব্দ

পিওন গোবিন্দদা কখনও-সখনও
একটানা কাঠঠোকরার শব্দ রেখে যান
ঝুলবারান্দায়


দুই
___

আমার দিক দিয়ে তাকালে গ্রামটাকে ভাবা যাচ্ছে লম্বুগাছ।
অন্যান্য গাছের মাথা ছাড়িয়ে অনেকটা,
                    ঝড় এলে মাটি থেকে মাথার দূরত্ব যার
                                                                  সব থেকে কম


তিন
____

আমার ঠিকানার ডাকনাম খাসপাড়া।
হাবড়া ভ্যানস্ট্যান্ডও জানে। আমি সাইকেলেই... 
গ্যারেজের মলয়দা অসংখ্য সাইকেলের মধ্যে
    কী অদ্ভুত আমারটাকে চিনে নিচ্ছে!
            না ফিরলে ঘরে তুলে রাখছে

ফিরতেই হয়... রবিবার, মাঘমাস, জ্যামভর্তি বছর

ব্যবহৃত তারিখের মতোই ফেরনি আর...
ব্যবহৃত তারিখ হয়ে থেকে গেছে
                ভেঙে যাওয়া থার্মোমিটার


চার
___
তার কোনও প্রমাণ নেই
সুতরাং মিথ্যেটাই সত্যি হল...জোরালো।
জোড়ায় জোড়ায় একই মাপের ভালবাসা,
পার্কটা পারফিউম হয়ে উঠছে
পারফিউম এলেই নাংলার বিলের প্রসঙ্গ আসে,
        গন্ধেই ভগবান,
             গন্ধের অতীত নৃশংস সুন্দর।

হে সুন্দর, রাতে দু'ঘন্টার জন্য কারেন্ট থাকে না—
বাড়ির সামনের বটতলা থাকে।
অশ্বত্থ গাছ, তবু লোকে বটতলা বলে!
এই অবচেতন মিথ্যা কাউকে কষ্ট দেয় না
তবে গাছের ব্যাপারে মানুষ দিয়ে তুলনা চলে না


পাঁচ
____

ঝাঁপ খুললেই ছ’ফুট বাই ছ’ফুটের একটা জানলা।
কারও কোনও বিশেষ পরিস্থিতির দরজা, এই মুহূর্তে যেমন 
চালভাঙা মেশিনের একটানা ঝাঁঝাঁ। এমনিতেই ঝাঁপ খুললেই
সরাসরি চোখে ঝাঁপিয়ে পড়ে চু-কিতকিত চুমুক নিয়ে
                                             অশ্বত্থ আর পাখিদের শূন্যতা  
এয়ারগান নিষিদ্ধ হ’লেও
ভাইভাই দোকানে ঝুলতে গুলতি!
তারও অনেক আগে
      গুলতি থেকে
              বহু গান
                     লম্বু বাগান পেরিয়ে
                            পিয়ালীদের ছাদে 


ছয়
___

পিয়ালির জন্য হলুদফুলকে ভাবব না,
হলুদফুলের জন্যই পিয়ালি ।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাছটি দেখেই মনে পড়ল
২৩শে জুন । অথচ
গাছটিতে একটাও হলুদফুল নেই


সাত
____

বিগত কয়েক বছরে মায়ের অনেক চুল উঠে গেছে 
উঠে যাওয়া চুল জমিয়ে ফিরিওলার কাছ থেকে
বিনিময়ে কখনও স্টিলের বাটি কখনও বা কাচের গ্লাস।
যার একটি গ্লাসে রোজ চা খাই আর ভাবি, লেবেল ক্রসিংটাই 
                  পারস্পরিক ফারাক

নিজের আদলে নির্জনতা খুঁজতে গিয়ে দেখছি,
প্রত্যেক দাবির পেছনে থেকে যাচ্ছে একটানা গোয়ার্তুমি
আর প্রত্যেক ঘুমের পেছনে নানান মাপের মুন গ্লাস


আট
____

সুযোগ বুঝে খামখেয়ালীরা ফ্যাতাড়ু
এই যেমন ঘুড়ি পেল গাছ
            আর ডাকনাম পেল বাগান... 
বাগানে ভাললাগে রোদ...নরম দুপুর... 
পেড়ে ফেলা ঘোর আর ভাল লাগে না।
দিন কাটানোর সাপেক্ষে এই খেলা।
পিছিয়ে পড়া সম্পর্কে দাবি থাকলেও 
ইচ্ছের কমে যাওয়ায়
      ভাবনাগুলো রোগা হয়ে
                 শক্তির মুক্তি ঘটাচ্ছে

আমার এই একুশ বছরের রুদ্রপুরে 
বাবুই পাখির বাসার ধরন বদলায়নি
অথচ টিকে থাকার আমরা বিবর্তনের অগোছালো!

পাখি ভাবনার সাথে আমরা
গোছানো পিপাসা কোনও কালেই এল না


নয়
___

বিশ্বাস এখানেও পরভোজী। বনভূমি ভাসে শিরায়।
টিপতে টিপতে মধ্যরাত্রি ঘরের তুচ্ছতায় আদর হচ্ছে...
        প্রকৃত আদরে শব্দ থাকে না।
বাতাসের বিনিসুতোয় ঘটনার রটনা অনেক,
অন্যের ঘটনা সহজেই গায়ে জড়াচ্ছে এখানে।
কোনও কাঠামোই নীলকণ্ঠ ফুলগাছ হচ্ছে না!
মুখ থেকে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে সবুজ মাউথ অরগ্যান।


দশ 
___

সপ্তাহ দুয়েক আগেই স্বদেশবাবুর সঙ্গে পরিচয়,
শিয়ালদহ টিকিট কাউন্টারে । এক সঙ্গের গল্প নিয়ে হাবড়ায়।
তার নাকি রোজ আমার বাড়ির সামনে দিয়ে যাতায়াত ।
মিথ্যে মনে হল, কোনওদিনই আমি তাকে দেখিনি
অথচ পরিচয় হবার পর থেকে তাকে নিয়মিত দেখছি


এগারো
_______

রাতের পর রাত রাস্তা ডিঙিয়ে ঘর !
টেবিলভর্তি ক্লোজ শট ছড়িয়ে রেখে
একটা বোবা সফরে...আমি ঘুমিয়ে গেলে 
শেষ আত্মরক্ষা মশারি।
কী অদ্ভুত মশারির ভিতর থেমে যাওয়া
সময়টুকুই সম্পর্কের তলানি হয়ে থেকে যাচ্ছে

কাব্যগ্রন্থ: মোমবাতি ও স্বপ্নের প্রত্যাবর্তন (২০০৭) নির্বাচিত কবিতা




রচনাকাল— ২০০৬ ।


প্রকাশক ও প্রকাশকাল— অভিযান পাবলিশার্স, কলকাতা বইমেলা জানুয়ারি ২০০৭।



উৎসর্গ


হলুদ ফুল

পাশবালিশ

ধুলোবালি

ফিসফিস


বিভাব কবিতা

____________

ফুল দিতে পারিনি

হলুদ ফুল...

আসলে ফুলের আশে-পাশে

এমন সব অনুভূতি আছে,

যার এখনও শব্দ তৈরি হয়নি


ছেলেবেলায় বাবা একটা কাগজের জাহাজ তৈরি করে

দিয়েছিলেন... আজ সেটা মোমের আলোয় ভাসালাম



বোধ ও মননের মধ্যে সুপ্ত ফারাক খুঁজতে দু’চারটে অবকাশ

রবিবারের মতো পর্দা সরিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানায়।

অস্তত্ব জানালা ও দরজার উপর ভীষন আস্থাশীল।

কিন্তু আমাদের সুদক্ষ হাত ওখানেও রঙ চাপায়।

প্রতিফলিত রঙে তীব্র হয় দুটি আর্তনাদ—

                             একটা ইচ্ছের, অন্যটা ভয়ের।

প্রতিশ্রুতি মিথ্যে হ’লে ভালবাসা, ভাললাগাগুলো

বোতাম সেলাই ভুলে যায়। একথা ঠিক—

অবস্থান কখনও অতীত, ভবিষ্যত ভাবে না। শুধু ভাবে—

‘আজকে থাকাটা জরুরি’।

তবুও অস্বচ্ছ প্রচ্ছয় আঁকড়ে ধরে প্রচ্ছদে নিজেদেরকে

বন্দর ভাবি কেউ কেউ...। জোয়ারের উৎসাহে জোনাকির

জ্বলে ওঠা, অথচ ভাঁটার টানে অস্বচ্ছ অনুভব।

অস্বচ্ছ অনুভব কখনও ঋতুদের ধারক হতে পারে না।

শুধু স্পর্শের পরিসীমায় নিজের আয়তনকে তুলে ধরে।

তাই দৃশ্যরা চিরকাল সাহায্য প্রার্থী হয়ে থেকে যায়

নোঙরের কাছে... তবুও দু’একটা জাহাজ দৃশ্য খুঁজতে এসে ডুবে যায়।

বহুদিন... বহুদিন জলের নীচে। একদিন পাটাতনগুলো

আলগা হলে স্বতন্ত্র অংশেরা পুনরায় ভেসে ওঠে এবং

পেরিয়ে যায় অজস্র প্রতিশ্রুতি... অজস্র বন্দর...



দুই
___

তারপর সকলেই একদিন সিঁড়ি হয়ে গেলাম।

সিঁড়ির ভাঁজে ভাঁজে তীর্যক রেখা, ভাঙাকাচের গুঁড়োর মতো

অহংকার... সরলরেখা হয়ে খোলা দরজায় আত্মমোচনে

শিখে নেয় চুম্বনের বুনন !

আলো, খোলা দরজা দিয়ে দিনে বাইরে থেকে ভেতরে এবং

রাতে ভেতর থেকে বাইরে যাতায়াত করে। রাত গভীর হলে

সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে আলো, কেঁপে কেঁপে ওঠা সময়।

আয়ু ফুরিয়ে গেলেও

গ্রীবা থেকে

          আরেকটা জন্মদিন

           মাথার কাছে জ্বলিয়ে রাখে মোমবাতি...



তিন
____

ক্ষতই শেষ কথা নয়।

গলিত মোম দিয়ে আরও একটা মোমবাতি তৈরির

দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বুঁদ হলেই ক্ষমতার অপমৃত্যু।

আর ভোর নিশ্চিত হলেই বাবা আমাকে দেখতে চান...।

তারপর দু’টো মুখ মুখোমুখি বাকি অন্ধকার গ্রাস করে।

পূর্ণতা অনুসরণ করে নাবিকের সংযম!

এখন সেখানে রাত হলে একটা মোমবাতি

নিজের মাংসের চরিত্র বর্ণনা করে।



চার
____

কিছু সত্যের ভূমিকায়, কিছু মিথ্যের প্রশ্রয়ে

প্রতিশ্রুতিরা দেওয়াল-লিখন হয়ে যায়।

যার সাশ্রয় মূল্য নেই, তার অধিকার মূল্য

আমাদের গ্রাস করে...

সকাল বিকাল চিমনি থেকে ধোঁয়া বের হয়

ভূত শব্দের অভিধান প্রতিফলক রাখে বিস্ময়ে-

মনের বিষাদগুলো মোমের আলোয় পুড়ে যাওয়া

প্রজাপ্রতির ডানার প্রলেপ... সুস্থ হয়ে পুনোরায়

আলোয় আবর্তিত !

 

পাঁচ
____

ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বৃক্ষের প্রসারিত বাহুও

ভালোবাসার বিরুদ্ধচারণ শেখায়।

যার জন্য অস্তিত্ব, তার জন্য টিউশনি ফেরত

শিমুল বোঝে— নিজস্ব ক্ষমতা অপেক্ষিক...

চুম্বক দন্ডের বিপরীত ক্রিয়ার মতোই

আকর্ষণ আত্মহত্যা করে অথবা পাগল হয়ে যায়।

আসন ঘরের মোমবাতি নিভিয়ে মা ফিরলে

এক দৌড়ে মা’র কাছাকাছি

প্রসাদের সিংহভাগ

                 তখন ক্লাস থ্রি...

বরং অবস্থানের হিসাবেই আসি—

ধরি,

বর্তমান = মোমবাতি

আপেক্ষিক = মোমের পুড়ে যাওয়া

অতএব,

    জমে যাওয়া মোমে শিমুলের একমাত্র কাজ

    সলতের যোগান...



ছয়
____

দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই সিদ্ধান্তে ফিরে আসতে চাই প্রত্যেকে।

মাঝের সময়টুকু নির্দেশিত অর্থে ফসল চুরি করে।

ধানের-গোলায় প্রবেশ পথে এক মোম জ্বলে সারারাত...

অনেক সাহসী ইঁদুরের মতোই তোমার পরিচয় উপহার হিসাবে

গ্রহনের পর দেখেছি—দাবি এসেগেছে !

ইচ্ছার স্বাধীনতা প্রকট হওয় প্রত্যেকেরই...

ইচ্ছার অপচয়ে দেখেছি— প্রিয় মানুষেরা নিজেরাই

বেমালুম মরীচিকা!

তাই আয়নায় নিজের প্রতিকৃতি ঠিক নয় জেনেও

শুধু তার শাসনই গ্রহন করি।

ঘরমুখো প্রতিটা মানুষের হাতে সবজি তুলে দিলেই

সন্ধ্যার গায়ে আরতির শিখা হেসে ওঠে!

শুধু তুমি নও...

শ্মশান ফেরত আমিও স্বভাবিক জীবন-যাপনে নির্বাচিত হই।



সাত
____

এভাবেই সময় কাটানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করি!

সহ-অবস্থান ও শান্তি এখন অনায়াসে মানতে পারি।

শুধু ‘সিদ্ধান্ত’, যা কখনও বুঝতে পারি না।

অয়নদের বাড়িতে একসন্ধ্যায়

তুমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে

বিষদাঁত ভাঙতে ভাঙতে একদম ভুলেগেছি।

সত্যের গভীরে যেতে সকলেরই ভয়।

তাই কোনোদিন বুঝতে চাই না—

‘ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেলেই

ক্রমশ বেড়ে চলে স্টেশনের দূরত্ব...’

বরং সুক্ষ্ম এই পরিবর্তনে ভাবপ্রবন অস্বীকারকে গুঁজে দিই।

ঘরির কাটা কি জীবাশ্ম ভালবাসে?

যে তাকে পড়তে ভালবাসে, তার নির্দেশ কি অমান্য করে?

তিনি হলে বলতেন— নির্দেশ এবং বোধ, নির্দেশ এবং জীবন

কোনোদিন এক হয় না।

বুঝিনি কিছুই!

শুধু এক একদিন নিজের আঙুল পোড়াতে গিয়ে থমকে গেছি

মোমের আলোয় দেখেছি—

                 আলোর নীচে গাঢ় এক নীল বলয়!

এখনও সেই নীলরঙ

কারও কারও ফেলে যাওয়া হাতের ছাপে

আমাকে হাত মেলানোর ইঙ্গিত করে



পর্বান্তর
_______

বিছানা জুড়ে মোমের আলোরা জ্বলে

তুই খুঁজিস একাকিত্বের মান!

আমি যে তোর খোলা বইয়ের পাতা

চোখের পাতা ডুবিয়ে করিস স্নান...



আট
_____

অভ্যাসের পরিবর্তনে—

             বামচোখ ঈষৎ জ্বলে যায়

             ডানচোখ তবু তোমার চোখের গ্রন্থিতে

             একটা চেনা অভ্যাস সাজাতে ব্যস্ত...

             তুমি তাঁর অঙ্ক কষতে পারো—

হ্যাঁ! সিঁড়িভাঙা অঙ্ক কষতে কষতে ছাত্রটি

সিঁড়ি বেয়েই নামতে থাকে...

মন ভোলানোর টফি কিনতে গিয়ে

হাসি খুশি মুখে কিনে ফেলে অন্যকিছু...

বিশ্রামের ভেতর স্বস্তি খুঁজতে

তার হাসির ভেতর নিজেকে উপস্থাপন করো...

গুচ্ছ গুচ্ছ মুগ্ধতার শেকলে বন্দি হও...

যেহেতু, কিনে আনা মোমবাতির আলোয়

বিশুদ্ধ মন্ত্রের মতো রাত

এই প্রথম তোমাকে চিঠি লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে...



নয়
____

ব্যাখ্য কিন্তু থাকবে না।

ক্লান্তি ও শাস্তির সম্ভাবনা ভাঙতে যে ঝড় ভীষণ উদ্যোগী

তার থেকে এক পেয়ালা বাতাস তুমি ড্রয়িংরুমে

সজিয়ে রাখো...

মোমের আলো নেভানোর আগে শুভেচ্ছা

বিনিময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো ধুয়ে নাও,

তার পিচ্ছিল পদার্থগুলো পরীক্ষা কর

তারপর

চূড়ান্তভাবে গ্রহণের আগে ভেবে নাও নিয়ন্ত্রণ...

ওই সব সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ

আর নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখো

                               জন্ম ও আমাকে



দশ
_____

দখল নিতে নিতে বিমুগ্ধ তুমি, বোঝালে—

ব্যর্থতার দাবি মেটানো কতোটা জরুরি!

ভুল প্রেমেও মোমবাতি নিজেকে অপচয় করে,

চোরা এক জিভ চেটে নেয় যাবতীয় সন্যাস...

খড়-কুটো জড়ো করতে করতে তোমার প্রয়োজন

এখন শুশ্রুষা জমাতে শিখেছে...

আর

আমার প্রয়োজন শিখেছে— কীভাবে

ঈশ্বরের মতো কালো আকাশ মোমের আলোয়

নীল হয়ে ওঠে...



এগারো
_______

এটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়—

জানালার গ্রিলে রোদ্দুর বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

তোমার চোখের মধ্যে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের

উপস্থিতি গত রাতেও অঙ্ক কষেছিলো,

মোমবাতির একই অবস্থানে আমি বুঝেছিলাম—

রামধনুর রঙ গোনার আর দরকার নেই !

অমনি তুমিও

অনন্তের রাফখাতা মারলে ছুড়ে জানালায় !

ঘোর বিয়োগেও জানালা এমনই

           নিভৃত এক উপার্জনের পথ,

           যে পথে পৃথিবী ঘরে ঢুকছে

           আর আমাদের ঘর বড় হয়ে যাচ্ছে



কিছু কিছু মৃত্যু রূপান্তরিত জন্ম

যেমন-

     আগে কেউ হাত চেপে ধরলেই

     হাত লাল হয়ে যেত...

     বাবার অবর্তমানে

     বাজারের ব্যাগেও এখন

     হাত লাল হয় না।



আমাদের শৈশবখানা ❑ ঋপণ আর্য

Anyone who does anything to help a child is a hero to me. ”    —Fred Rogers প্রায় দুই দশক ধরে আমার অন্যতম একটি শখ হল চাইল্ডহুড ফ...